ফেনীতে চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতন এবং তাঁর রেস্টুরেন্ট দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসাইন অভিযোগ করেছেন, তাঁকে বিবস্ত্র করে জোরপূর্বক নাচানো এবং সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার, দখল হয়ে যাওয়া রেস্টুরেন্ট ফেরত ও নিরাপত্তার দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন করছেন তিনি। ছেলের অনশন শুরুর ২৫ ঘণ্টা পর গতকাল রোববার তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মা।

শনিবার সকালে সাত দফা দাবিতে অনশন শুরু করেন সাদ্দাম হোসাইন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাননি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ

সাদ্দাম হোসাইনের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এ সময় কর্মচারীদের জিম্মি করে তাঁকে মারধর করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। একপর্যায়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর ও চেক নিয়ে যায় হামলাকারীরা।

এ ঘটনায় ফেনীর আদালতে মামলা করেন সাদ্দাম। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন বলে জানান তিনি।

সাদ্দামের ভাষ্য, এরপর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রমজান মাসে তাঁকে অপহরণ করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এ সময় তাঁর দাড়ি ধরে টানা, মুখে জুতা ঘষা এবং বিবস্ত্র করে জোরপূর্বক নাচানোর অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনার ভিডিও ধারণ করে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তাতে রাজি না হওয়ায় ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।

সাদ্দাম জানান, পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চান তিনি। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করলেও দীর্ঘ সময় থানায় আটকে রাখা হয় এবং উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সাদ্দাম হোসাইন তাঁর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় ফেনী সদর থানা বিএনপির নেতা তপন করের ছেলে অপু কুমার কর ওরফে অর্ক, ফেনী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রহমাত উল্যাহর দুই ছেলে রেজাউল করিম ওরফে রিদয়ান ও সরোয়ার জাহান ওরফে রাজু, একই ওয়ার্ডের মিলন দাশের ছেলে তন্ময় দাশ, ফুলগাজীর গোসাইপুরের বেলায়েত হোসেনের ছেলে শামীম কাউছার ওরফে প্রভাত এবং নোয়াখালীর সেনবাগের আবুল কালামের ছেলে আমজাদের নাম উল্লেখ করেছেন।

তাঁর অভিযোগ, দ্বিতীয় দফার নির্যাতনের ঘটনায় আরও যুক্ত হন জেলা ছাত্রদলের নেতা রশিদ আহম্মদ মজুমদার ও তাঁর সহযোগী নেছার উদ্দিন বাপ্পি, ফেনী পৌর ছাত্রদল নেতা জুনায়েদ রাব্বানি রিজন এবং জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আরজুর ভাতিজা অমিত আরজু।

সাদ্দামের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে ছাত্রদলে যোগ দেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

৬৭ ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাননি

সাদ্দাম হোসাইন বলেন, তাঁর ওপর নির্যাতন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠার দখল এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিষয়ে ফেনীর পুলিশ সুপার, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ৬৭ জন ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি তাঁর।

তিনি বলেন, ‘এখন প্রয়োজনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মৃত্যুবরণ করব, তবু আমার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।’

সাদ্দামের দাবি, তাঁর রেস্টুরেন্ট আইনানুগভাবে উদ্ধার করে তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সাত দফা দাবি

অনশন থেকে সাদ্দাম হোসাইনের উত্থাপিত সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে দখল হয়ে যাওয়া রেস্টুরেন্ট উদ্ধার করে ক্ষতিপূরণসহ তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া, সংশ্লিষ্ট হামলা ও মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া হামলা, হুমকি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ফেনী শহর ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাফর আহমেদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ তদন্ত এবং সমিতির বর্তমান কমিটির বৈধতা ও কার্যক্রম যাচাইয়ের দাবিও রয়েছে।

দায়িত্বে অবহেলা বা অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিষয়ে দলীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং নিজের, ব্যবসায়িক অংশীদারদের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন সাদ্দাম।