রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ৫৪৫ জনের তালিকা করে তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্দেশনার পর অভিযান চালিয়ে এক সপ্তাহে তালিকাভুক্ত ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও মামলা না থাকায় তাদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা হবে, তা নিয়ে সংশয়ে পড়েছে পুলিশ। এ অবস্থায় মামলা না থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী আটকাদেশ বা ডিটেনশনের চিন্তা করছে পুলিশ। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
ডিএমপি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন শাখাকে দেওয়া হয়েছে। তালিকা ধরে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। তবে তালিকাভুক্ত হলেই কারও বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভুক্তভোগীদের অনীহা এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এক সপ্তাহে গ্রেপ্তার ৪৭
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তালিকা পেয়েছি। নির্দেশিত হয়েছি। সেই তালিকা অনুযায়ী এক সপ্তাহ ধরে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। গত সোমবার পর্যন্ত ডিএমপি থেকে মোট ৪৭ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা রয়েছে, তাদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। আবার অভিযানে যাদের কাছে অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। আর যাদের নামে কোনো মামলা নেই, তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী ডিটেনশনের চিন্তা করা হচ্ছে। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে।’
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহিনুর আলম মারফত (৬০) রয়েছেন। গত ৪ অক্টোবর খিলক্ষেত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। তবে পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল থেকে লিটন চোকদার (৩৯) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে তেজগাঁও থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিএমপির করা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে।
তালিকায় তেজগাঁও বিভাগের ১৫৬ জন
ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর ৫৪৫ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীর তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে তেজগাঁও বিভাগের। এ বিভাগের ১৫৬ জনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের অনেকে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁদের কিশোর গ্যাং ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
ডিএমপির ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করেছে। ওই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা তালিকা পেয়েছি। তালিকাভুক্তদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কে? ভুক্তভোগী নাকি পুলিশ? তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাবান। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে ভুক্তভোগীরা ঝামেলায় পড়তে পারেন। ফলে ভুক্তভোগী পাওয়া মুশকিল। আবার মামলার এজাহারে চাঁদাবাজদের সম্পর্কে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ না থাকলে আইনের ফাঁকফোকরে তারা জামিনে বেরিয়ে যায়।’
ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অপরাধের বিপরীতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা কী কী অপরাধে জড়িত, তা যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএমপির তেজগাঁও থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মনে করুন আমি আজ একজন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি যদি জামিন পেয়ে যান, তাহলে আর আইন মানতে চাইবেন? সবকিছু ভেবে আমাদের ঊর্ধ্বতনরা যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে আমরা কাজ এগিয়ে নেব।’
মামলা ছাড়াই আটক নিয়ে প্রশ্ন
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা না থাকলে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগের চিন্তা করছে পুলিশ। তবে এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ আইনটিকে কালো আইন বলেও অভিহিত করছেন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘বর্তমান সরকার চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। সেটা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। অতীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কাজ না করে বেআইনি কাজ, বেআইনি আটক, নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি করার মতো অভিযোগ আমরা শুনতাম। বাংলাদেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে আগের মতো কোনো অভিযোগ আমরা আর শুনতে প্রস্তুত নই। সুতরাং যে আইনই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে।’
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। শুধু তালিকায় নাম থাকার ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া আটক রাখার প্রশ্নে সতর্কতা জরুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষা
ডিএমপি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের পর কী প্রক্রিয়ায় এগোনো হবে, সম্প্রতি এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে তা জানতে চান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আপাতত পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে সরকার কীভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে কাজ চলছে। দ্রুতই এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
ডিএমপির বিভিন্ন শাখার অন্তত আটজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তাঁদের প্রত্যেকেই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ডিএমপির ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘ওয়ারী বিভাগে ২০ থেকে ২৫ জনের নাম রয়েছে তালিকায়। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছি। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। তারা চিহ্নিত রাঘববোয়াল। এটার একটি বড় পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে। মানুষও তাদের থেকে সতর্ক হবে।’
এসআরবির মুখপাত্র ও বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তালিকা পাওয়ার পর থেকে আমরা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। রাজধানীসহ সারা দেশেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
এদিকে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম থাকা প্রসঙ্গে শাহিনুর আলম মারফত বলেন, ‘আমার মনে হয়, কেউ চক্রান্ত করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়েছে। আমি রাজনৈতিকভাবে গ্রুপিংয়ের শিকার।’
তবে রাজধানীর বাইরে সারা দেশে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








