দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর অবিশ্বাসের আবহের মধ্যেই জাতীয় সংসদে দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংসদ সচিবালয়ের কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। প্রায় ২০ মিনিটের এই বৈঠককে উভয় পক্ষই ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ ও নানা বিশ্লেষণ। সোমবার দুপুরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যতা, বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাৎ’ শিরোনামে ছবি ও বিবরণ প্রকাশ করা হয়, যা দ্রুতই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। প্রকাশিত ছবিতে দুই নেতার সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও দেখা যায়। তার উপস্থিতি বৈঠকটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে আরও কৌতূহল তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনপির মিডিয়া সেলের পোস্টে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ কার্যালয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। বৈঠক শেষে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে তার কার্যালয়ের দিকে খানিকটা পথ এগিয়ে দেন। এই দৃশ্যকে উপস্থিত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মানের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন। ঘটনার সূচনা হয় একই দিন দুপুর ১২টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এক জানাজার নামাজে। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা। জানাজাটি ছিল সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সহধর্মিণী দিলারা হাফিজের, যিনি গত শনিবার সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি শিক্ষা প্রশাসনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং একসময় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন। জানাজা শেষে সংসদ ভবনের দিকে একসঙ্গে হেঁটে যাওয়ার সময় শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিজের সংসদ সচিবালয়ের কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। পরে সেখানেই প্রায় ২০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান (রুমন) গণমাধ্যমকে জানান, এটি ছিল একটি সংক্ষিপ্ত ও সৌজন্যমূলক আলাপ। বৈঠক শেষে শফিকুর রহমান কার্যালয় ত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রী তাকে কিছুদূর এগিয়ে দেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সবার প্রতি যথাযথ সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শন করেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং সরকার গঠনের পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাঁর এই সৌজন্যতা দেখা গেছে। আজকের ঘটনাও তারই ধারাবাহিকতা।” অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এটিকে বিরোধীদলীয় নেতার উদ্যোগে হওয়া একটি স্বাভাবিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দলটির মিডিয়া সেল জানায়, জানাজা শেষে হঠাৎ করেই এই বৈঠকের সূচনা হয় এবং তা পূর্বনির্ধারিত ছিল না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের বর্তমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত না দিলেও, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নরম বার্তা বহন করে। বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ের রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যোগাযোগের এই ধরণ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।