কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে লালন শাহের আখড়াবাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ছাত্রদল নেতা সংগ্রাম ও পাপনের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং ডিম নিক্ষেপ করে। পরে আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের সামনে রাখা তাঁর গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ গিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সোয়া ৭টার মধ্যে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন শাহের আখড়াবাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। হামলার সময় সেখানে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিরাপদে আখড়াবাড়ি এলাকা থেকে বের করে দেয়।

এনসিপি ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিগত সফরে রোববার কুষ্টিয়ায় যান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রথমে তিনি কুমারখালীর শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যায় ছেঁউড়িয়ার লালন শাহের আখড়াবাড়িতে যান। সেখানে মাজার পরিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় বাউল শিল্পীদের পরিবেশনায় গান শোনেন এবং ফেসবুকে লাইভ করেন।

আখড়াবাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুজন নারী তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চান। এ সময় তাঁকে লক্ষ্য করে একজন ডিম ছোড়েন বলে তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা দাবি করেন। এরপর ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সেখানে জড়ো হয়ে তাঁকে গালাগাল করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে মারধরের জন্য তেড়ে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়। তাঁদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে রক্ষায় তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তাঁদের কয়েকজন আহত হন বলে এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের সামনে থাকা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। পুরো ঘটনা দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, ছাত্রদল নেতা সংগ্রাম ও পাপনের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা করেন। এনসিপির কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্যসচিব আবু তালহাও অভিযোগ করেছেন, ছাত্রদল নেতা সংগ্রাম ও পাপনের নেতৃত্বে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।

এনসিপির কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্যসচিব সুলতান মারুফ তালহা বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।

তবে হামলায় ছাত্রদলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী। তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা হয়ে থাকলে তা নিন্দনীয়। ছাত্রদল মব কালচারের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদল কোনোভাবেই জড়িত নয়। তবে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত থাকলে এর দায় তাঁকেই নিতে হবে।

ঘটনার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে এনসিপির কুষ্টিয়া জেলা শাখার আহ্বায়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনিসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা ছিলেন। হামলার পর কিছু সময় তিনি আখড়াবাড়ির ভেতরে অবস্থান করেন। পরে খবর পেয়ে কুমারখালী থানা পুলিশ সেখানে যায় এবং তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লালন শাহের মাজারে এসেছিলেন। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তাঁকে নিরাপদে এলাকা থেকে বের করে দেয়। তবে তাঁর সফরের বিষয়ে পুলিশকে আগে থেকে জানানো হয়নি বলে জানান তিনি। পুলিশকে জানানো হলে প্রটোকলের ব্যবস্থা করা যেত বলেও মন্তব্য করেন ওসি।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি। ঘটনার পর তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে আরও পুলিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে হামলার ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ধাওয়া করতে দেখা গেছে। আরেকটি ভিডিওতে তাঁর গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা এবং তাতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার পর এনসিপির নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার জন্য বিএনপি ও ছাত্রদলকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিএনপি বা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলায় দলীয়ভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে থানায় মামলা হয়েছে কি না এবং অভিযোগে উল্লিখিত সংগ্রাম ও পাপনের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ তদন্তের পর হামলাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।