ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্ট ও মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার জেরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অস্ত্রের মহড়া ও অবস্থানের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত চার সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফুজ্জামান কোরবান এবং আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম রয়েছেন। জাহিদুলের মাথা ফেটে গেছে। মৃদুলকেও মারধর করা হয়েছে। আহত চার সাংবাদিককে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হলেও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী হকিস্টিক, বেসবল ব্যাট, পাইপ, রড, চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই এলাকায় যান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল হল সংসদের জিএস ও শিবির নেতা আরিফুল ইসলামকে মারধর করা। সেখানে অস্ত্র হাতে তাঁদের অবস্থানের ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত হয় ফেসবুকের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে কড়া ভাষায় পোস্ট দেন। পোস্টের মন্তব্যে রাকসুর সহসম্পাদক রাকিবুল ইসলাম এর বিরোধিতা করেন। এরপর দুজনের মধ্যে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আহসান হাবিব রাকিবুলকে অবস্থান জানাতে বলেন এবং তাঁকে মারধরের হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে দুজনই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

এরপর রোববার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে অবস্থান করেন রাকিবুল। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি ক্যাম্পাসেই থাকবেন এবং কেউ চাইলে তাঁর সঙ্গে সেখানে কথা বলতে পারে। পরে বিকেল ৫টার দিকে আহসান হাবিব কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। তাঁদের কয়েকজনের হাতে বেসবল ব্যাট দেখা যায়। এ নিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামের একটি ফেসবুক পোস্টের পর। ওই পোস্টে তিনি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করেন। এর পরপরই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রড, পাইপ, চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের দিকে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটে সেখানেই।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে অস্ত্র দেখে দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে এগিয়ে যান। এ সময় সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজুর ওপর লাঠি দিয়ে হামলা করা হয়। আজকের পত্রিকার প্রতিনিধির মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান কোরবানকেও মারধর করা হয়।

ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান সেখানে যান। সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর তাঁদের হলের একটি কক্ষে নিয়ে দরজা বন্ধ করে নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এর মধ্যে সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে আরও কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে গেলে তাঁদের ওপরও হামলা চালানো হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল এবং আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদেরও মারধর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মৃদুলকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মারধর করা হয়। জাহিদুলের মাথায় আঘাত লাগে এবং তাঁর মাথা ফেটে যায়। পরে আহত চার সাংবাদিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরীফুল ইসলাম ও সহকারী দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমসহ অন্তত ১০ জন নেতাকর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, বিষয়টি তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন। দ্রুত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরও ঘটনাটি জানার পর বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তবে ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রক্টর তাঁদের একটি কক্ষে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেও ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একটি পক্ষের অবস্থান এবং পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ঠেকানো যায়নি।

ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান নিজের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আলীম জানিয়েছেন, প্রশাসন বিষয়টি জেনেছে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না বলেও তিনি জানান।

এদিকে এই হামলা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যে ক্যাম্পাসে কয়েক বছর আগেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমন-পীড়নের সময় সাংবাদিকদের অনেকেই মাঠে থেকে সেই নিপীড়নের খবর তুলে ধরেছেন, সেই ক্যাম্পাসেই এখন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধরের শিকার হতে হচ্ছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে হকিস্টিক, বেসবল ব্যাট, রড, পাইপ বা চাপাতি নিয়ে প্রতিপক্ষকে মারতে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি শুধু দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় থাকে না। সেখানে আইনশৃঙ্খলা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সক্ষমতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, অস্ত্র হাতে একটি দল যখন প্রকাশ্যে অবস্থান করছিল, তখন সেটি ধারণ করতে যাওয়া সাংবাদিকদেরই হামলার লক্ষ্য বানানো হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি কেবল রাজনৈতিক বিরোধে সংঘর্ষের নয়; ঘটনার দৃশ্য ধারণ ও সংবাদ সংগ্রহ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ওপরও হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাংবাদিকরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা ক্যাম্পাসে যা ঘটছে, সেটিই দেখবেন, প্রশ্ন করবেন এবং সংবাদ হিসেবে তুলে ধরবেন। ছাত্রদল, শিবির কিংবা অন্য কোনো সংগঠন কারও কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ পছন্দ না করলে তার জবাব হতে পারে বক্তব্য, প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা। কিন্তু সাংবাদিকের মাথা ফাটিয়ে, গলা চেপে ধরে কিংবা ক্যামেরা-মোবাইল কেড়ে নিয়ে সংবাদ বন্ধ করা যায় না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের ঘটনা তাই শুধু চার সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা নয়। এটি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরুত্থান, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি চাপের একটি গুরুতর উদাহরণ। এর বিচার না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অস্ত্রের দাপট এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা দুটিই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।