বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে শুক্রবার দুপুরে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মাথায় ছিল গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। একদিনের মধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে ওই জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ফোন নিতে বাধা দিলে তাকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে তিনজন।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

এ ঘটনায় দুই কিশোরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), সালমানপুর এলাকার ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর এবং কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোর। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড বা পিসিপিআর নেই। এ ছাড়া ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণকে আটক করে তাঁর সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান তাঁর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান, পঙ্কজ বড়ুয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় অপ্রতিমকে

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকা, কোটবাড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।

ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, শুক্রবার বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছেন। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ওই ফুটেজের সূত্র ধরে সাইফুলকে হেফাজতে নেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল অপ্রতিমকে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

এর আগে শনিবার রাতে সালমানপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সাইফুলের দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গার ভিত্তিতে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়েও ফোনটি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

বাধা দেওয়ায় মাথায় লাঠির আঘাত

পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে অপ্রতিমের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাঁর সঙ্গে তিনজনের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পুলিশের ভাষ্য, প্রথমে সাইফুল এবং পরে সঙ্গে থাকা দুই কিশোর লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তাঁর মায়ের আইফোনটি নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

তবে পুলিশ স্পষ্ট করেছে, এসব তথ্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলছে। ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য তদন্তের ফল এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার বিস্তারিত আরও পরিষ্কার হবে।

সিসিটিভিতে মেলে প্রথম সূত্র

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাকে উদ্ধারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়। বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকা ও কোটবাড়ির বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।

একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। পরে আশপাশের আরও একটি সিসিটিভি ফুটেজে ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই কিশোরের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।

পুলিশের তদন্তে পরে ওই কিশোরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধারের তথ্য সামনে আসে।

জঙ্গলে যেভাবে মিলেছিল অপ্রতিমের মরদেহ

শনিবার বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় কয়েকজন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে অপ্রতিমকে পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর মাথার কাছে রক্তের চিহ্ন ছিল। পরে বিষয়টি স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে জানানো হলে বেলা একটার দিকে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের আগে প্রায় ২২ ঘণ্টা ধরে তাকে খুঁজছিল পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাকে উদ্ধারে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি প্রথম দিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্তের সূত্র ধরে সেই ফোনই উদ্ধার করা হয়।

কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ

অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজন কিশোর হওয়ায় তাঁদের কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় এর আগে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয়দের আধিপত্যের অভিযোগ নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনা এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পুলিশ সুপার এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রাখার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি এবং অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে।

অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

অপ্রতিম হত্যার প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সুপার বলেন, সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কখন বাড়িতে ফিরছে, এসব বিষয়ে মা-বাবাকে খোঁজ রাখতে হবে। বিশেষ করে অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে মুঠোফোন ও বিভিন্ন ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

শুক্রবার কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরিবারের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিল। এরপর আর বাসায় ফেরেনি।

পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর শুরু হয় হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের তদন্ত। সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধার হওয়া আইফোনের সূত্র ধরে পুলিশ এখন বলছে, অপ্রতিমের শেষ যাত্রা ছিল পরিকল্পিত একটি ছিনতাইয়ের ফাঁদে। তবে মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় ঘটনার সব তথ্য ও দায়ের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।