শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে ফের গতি এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে আবারও আলোচনা শুরু করেছেন। নভেম্বরের সুবিধাজনক সময়ে সফরটি আয়োজনের চেষ্টা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু।

সফরটি হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বাভাবিক করা এবং গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি এখন দুই দেশের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হওয়ার পর কিছুটা বিরতি এলেও দুই দেশের কর্মকর্তারা আবার নিয়মিত বৈঠক করছেন। সফরকে সামনে রেখে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিও প্রস্তুত করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাবেন। এরপর অক্টোবর ও নভেম্বরজুড়ে তাঁর একাধিক কূটনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে একটি সুবিধাজনক সময় বের করে নভেম্বরেই নয়াদিল্লি সফর আয়োজনের চেষ্টা চলছে।

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের একাধিক বৈঠক

সফর ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা হয়।

এর আগে ভারতের হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে প্রকাশ্যে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। গত ১৬ আগস্ট তিনি বলেন, দুই দেশের যেকোনো সমস্যা বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দ্রুত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

পরে ২ সেপ্টেম্বর সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাঁর নিজের বিষয়। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

হাসিনার বক্তব্যে নতুন করে অস্বস্তি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর অবস্থানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে দুই দেশের সম্পর্কের সেই অস্বস্তি আবারও প্রকাশ্যে আসে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে ওই ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের সাময়িক অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে। ফলে শেখ হাসিনার অবস্থান ও প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে কিছুটা সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে একাধিকবার ইতিবাচক বার্তা এসেছে।

ব্রিকস সম্মেলনে না গেলেও দিল্লিকে এড়িয়ে যাওয়ার বার্তা নয়

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি ওই সম্মেলনে পাঠানো হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের সঙ্গে এক নয়।

এর আগে দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্র বলেছিল, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশ না নেওয়াকে ভারতকে এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় দিল্লি সফরের আগে সফর থেকে দৃশ্যমান কী অর্জন নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ওই সূত্র আরও জানিয়েছিল, গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় ভারত সফর প্রয়োজন হতে পারে। চুক্তিটি চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে।

আলোচনায় বাণিজ্য ও পানি

দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য, ভিসা, সীমান্ত ও পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সম্ভাব্য তারেক-নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে এসব ইস্যুর কিছু অংশ আলোচনায় আসতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বাভাবিক করা এবং গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নকে সম্ভাব্য সফরের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ভারতের হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠক এবং দুই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, সম্পর্কের অস্বস্তি কাটিয়ে আলোচনার পথটি আবার সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।

সফরটি শেষ পর্যন্ত হলে সেটি হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ। আর সেই বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যু কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই নজরে থাকবে।