রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। ঘটনার পর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন এ ঘটনায় জড়িত নন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। র্যাব যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছিল, সেটিও রনজিলার ওপর ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়নি বলে দাবি করেছে ডিবি। সংস্থাটির ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রঙের মিল নেই। পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নতুন করে মো. খোকন ও রাজীব মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনই জিজ্ঞাসাবাদে রনজিলা পারভীনকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীর ছিনতাই হওয়া ব্যাগ ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ৩০ আগস্ট র্যাব-২ রাকিব, পনি ও সেড্রিক নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। র্যাব তখন জানিয়েছিল, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ডিবির তদন্তে বলা হচ্ছে, র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি এ ঘটনায় ব্যবহৃত হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের রং এবং র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রং ভিন্ন।

ব্যাগ টান দিয়েছিল খোকন

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সময় খোকন মোটরসাইকেলের পেছনে বসেছিল। সে রনজিলা পারভীনের ব্যাগে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে যায়। এতে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন রনজিলা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

খোকনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলা পারভীনের ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগের ভেতরে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল।

ভুক্তভোগীর কাছে থাকা ছিনতাই হওয়া মুঠোফোনও পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

পরে সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে রাজীব মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির ভাষ্য, ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।

রাজীবের হেফাজত থেকে ৬২২টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। ডিবির ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ মোট আটটি মামলা রয়েছে। আর খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে। তাঁদের ঢাকা মহানগর এলাকায় অন্য কোনো ঘটনায় সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

র্যাবের ধরা তিনজন জড়িত নন

র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, তাঁদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, রনজিলা পারভীন হত্যার ঘটনায় তাঁরা জড়িত নন।

শফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমে তাঁরা বিবেচনা করেন, কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে এবং তাদের অপরাধের ধরন কী। র্যাব যাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল, তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু রনজিলা হত্যার ঘটনায় তাঁদের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শুরু করা হয়।

সেই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই নতুন দুজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা দুজনই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছেন। আগে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁরা স্বীকার করেননি। বিভিন্ন সংস্থা একই ঘটনা তদন্ত করেছে, যা তদন্তের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।

স্বামীর চোখে শনাক্ত খোকন

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ঘটনার সময় রনজিলার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন এক দৃষ্টিতে ছিনতাইকারীকে দেখেছিলেন। ছিনতাইকারী ব্যাগ টান দেওয়ার সময় একবার তাঁদের দিকে মাথা ঘুরিয়েছিল। তখন তিনি তাঁকে স্পষ্ট দেখেন।

পরে পেছনে থাকা খোকনকেও তিনি শনাক্ত করেছেন বলে জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।

ডিবির ভাষ্য, ভুক্তভোগীর স্বামীর দেওয়া বর্ণনাও নতুন করে তদন্তে সন্দেহভাজন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল নিয়ে প্রশ্ন

রনজিলা পারভীনকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের কাছ থেকে যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। র্যাব তখন জানিয়েছিল, ওই মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছিল।

তবে ডিবি এখন বলছে, সেটি ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের রং এবং র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রং ভিন্ন। পরে নতুন করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করা হয়।

ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া রাজীবের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ওই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

র্যাব বলছে, সন্দেহভাজন হিসেবেই গ্রেপ্তার

ডিবির নতুন বক্তব্যের বিষয়ে এসআরবি-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, র্যাব প্রথম দিন থেকেই গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছিল। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঘটনায় জড়িত কি না, সে বিষয়ে অপেক্ষা করার কথাও বলা হয়েছিল।

নয়মুল হাসানের ভাষ্য, আগে গ্রেপ্তার হওয়া পনির সঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া একজনের চেহারায়ও মিল রয়েছে। তাঁর দাবি, সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করায় পরবর্তী সময়ে নতুন অপরাধীদের শনাক্ত করতেও সহায়তা হয়েছে।

যেভাবে নিহত হন রনজিলা

গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুরবাগানের মুখে রিকশায় ছিনতাইয়ের শিকার হন শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন।

ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় তাঁর স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

ঘটনার পর র্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। তবে ডিবির তদন্তে এখন বলা হচ্ছে, ওই তিনজন ও উদ্ধার করা মোটরসাইকেল রনজিলা হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া খোকন ও রাজীবই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করছে ডিবি।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার জানিয়েছেন, র্যাবের হাতে আগে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের সঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের কোনো যোগাযোগ বা পরিচয় আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আগের তিনজনের বিরুদ্ধে এ মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না গেলে তাঁদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলায় তাঁরা আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবেন।