জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামি বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে তাদের গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। একই রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচ আসামির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
এর আগে একই দিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সাত আসামির সবাই পলাতক।
‘অবস্থান শনাক্ত হলে গ্রেপ্তার করে দেশে আনা হবে’
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কে কোথায় রয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাদের অবস্থান সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে আসামিরা এখন দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারলে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আমরা আশ্বস্ত করতে পারি যে, যেহেতু তারা এখন দণ্ডপ্রাপ্ত, তাদের অবস্থান যদি আমরা শনাক্ত করতে পারি, তাহলে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেব।’
কাদেরসহ ৫ জনের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত
রায়ে পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
এই পাঁচ আসামি হলেন ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, ওই পাঁচ আসামির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই বা আগস্ট ২০২৪ সময়ে নিহত ও আহত ব্যক্তি কিংবা তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, রায় বাস্তবায়ন করবে সরকার। আসামিদের কার কোথায় কী সম্পদ রয়েছে, রাষ্ট্র বা সরকার তা খুঁজে বের করবে। এরপর রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পাওয়া সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে।
৩০ দিন পর বাস্তবায়নে বাধা নেই
ফলে আপিলের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর রায়ে দেওয়া সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
‘চার অভিযোগের অধিকাংশই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’
মামলায় প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ ছিল বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আসামির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ রায়ে শুকরিয়া আদায় করছি। আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট।’
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তার দাবি, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ১৪ দলীয় বৈঠকে কারফিউ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ওবায়দুল কাদেরের শুট অ্যাট সাইট নির্দেশের পর নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে।
পলাতক আসামিদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ মামলার কয়েকজন আসামি বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে মন্তব্য করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালে তাদের বিরুদ্ধে চলা বিচারকার্য সম্পর্কে তারা জানতেন। কিন্তু তারা বিচার মোকাবিলা করেননি।
তার দাবি, ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থাকার কারণে আসামিদের বক্তব্য আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থাকলে আইনে যেভাবে বিধান রয়েছে, সেভাবেই তার বিরুদ্ধে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও মন্তব্যের কোনো অবকাশ নেই বলে তিনি মনে করেন।
যেভাবে শেষ হলো বিচার
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই দিন অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২।
এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয় ২ আগস্ট।
এরপর ৪ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৭ আগস্ট। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় মোট ১২৩ সিরিজ ডকুমেন্টস প্রদর্শন করা হয়েছে।
দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে মঙ্গলবার সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে জুলাইয়ের নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন রায়ের বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও অবস্থান বের করা।








