শেখ হাসিনা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। একসময় যে ভারত তাঁর সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই ভারতেই এখন তিনি অবস্থান করছেন বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধের মুখে। বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত চেয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা নয়াদিল্লির।
দিল্লির জন্য গণহত্যায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি নিছক কোন ব্যাপার নয়। কারণ শেখ হাসানাকে ঘিরে যে সিদ্ধান্তই ভারত নিক, তার রাজনৈতিক অভিঘাত পড়বে দুই দেশের সম্পর্কে। তাঁকে ফেরত দিলে পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটবে। আর তাঁকে ভারতে রেখে দিলে জুলাইয়ের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ আরও কঠিন হতে পারে। সেখানেই ভারতের উভয়সংকট। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও সরল। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাটিতে থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলবেন এবং কেন তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না?
২৩ আগস্ট ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান–এর সম্পাদকীয়তে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে নয়াদিল্লির সামনে আইন ও কূটনীতির দ্বন্দ্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকাটি সতর্ক করেছে, ভারত যেন তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়; আবার অনির্দিষ্টকাল শেখ হাসিনাকে ভারতে রাখাও সমাধান নয়। বাংলাদেশের কাছ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই যুক্তির মধ্যে আইনি প্রশ্ন অবশ্যই আছে। কিন্তু এর বাইরে আরও বড় একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আছে—দিল্লি কি এখনো সেই বাংলাদেশকেই দেখতে চায়, যে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে ছিল? নাকি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া নতুন বাংলাদেশকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে যাবে।
হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় —এমন কোনো বার্তা নেই। বরং নতুন সরকার দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অর্থ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে ছাড় দেওয়া নয়। ১০ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যাশা জানানো হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ ঢাকার অবস্থান একেবারে পরিষ্কার—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চাই, কিন্তু শেখ হাসিনাকে নিয়ে কোনো আপস নয়।
এই অবস্থানকে শুধু কূটনৈতিক দর-কষাকষি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরে যাননি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তাই তাঁর প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি বাংলাদেশের কাছে জুলাইয়ের পর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভারত চাইলে বিষয়টিকে কেবল একটি আইনি ফাইল হিসেবে দেখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের কাছে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আশ্রয়ে থেকে যান, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিণতি কী হবে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
যে সম্পর্ক ছিল, সেটিই কি এখন ভারতের বোঝা?
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। সীমান্ত, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক সংযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ কাজ করেছে। ভারতের দৃষ্টিতে এই সম্পর্ক ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আর একটি দেশের জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক—এক জিনিস নয়।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ভারত যে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, সেটি হয়তো দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর পতনের পর। এখন প্রশ্ন উঠছে—ভারতের বাংলাদেশ নীতি কি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল, নাকি সরকারকেন্দ্রিক?
যদি সেটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের পতনের পরও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কথা। কিন্তু যদি সেটি অতিরিক্তভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নির্ভরশীল হয়ে থাকে, তাহলে জুলাইয়ের পর দিল্লির অস্বস্তি ব্যাখ্যা করা সহজ। এখানে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—কোনো নেতা স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্থায়ী।
ভারত এখন কোন বাংলাদেশকে সামলাবে?
জুলাইয়ের পর বাংলাদেশ বদলেছে। শুধু সরকার বদলায়নি; রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। জনগণের প্রত্যাশা বদলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বদলেছে। পররাষ্ট্রনীতির ভাষা বদলেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পুরোনো ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নতুন বাংলাদেশ চাইছে নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে। এটি ভারতের জন্য হয়তো অস্বস্তিকর। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় আকাঙ্ক্ষা।
কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে মানেই তার নীতির সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। বরং সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক স্বার্থের জায়গায় সহযোগিতা করা। বাংলাদেশ যদি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চায়, ভারতও বাংলাদেশে বাজার চায়। বাংলাদেশ যদি যোগাযোগ সুবিধা দেয়, ভারতও আঞ্চলিক যোগাযোগে সুবিধা পায়। বাংলাদেশ যদি নিরাপত্তা সহযোগিতা চায়, ভারতও সীমান্ত নিরাপত্তার সুবিধা পায়। অর্থাৎ সম্পর্কটি একতরফা দয়া বা রাজনৈতিক অনুগ্রহের নয়। এটি দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক। জুলাইয়ের পর বাংলাদেশ সম্ভবত সেই সমীকরণটাই সামনে আনতে চাইছে।
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি—দিল্লির সামনে আইনি পথ
২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের আইনি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। চুক্তিতে গুরুতর অপরাধ, রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম এবং প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের বিভিন্ন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। সুতরাং চুক্তি থাকা মানেই শেখ হাসিনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দিতে হবে—এমন নয়। কিন্তু উল্টো কথাটিও সত্য। চুক্তি আছে বলে রাজনৈতিক সুবিধামতো একটি অনুরোধ অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখাও সহজ নয়।
ভারতের সামনে তাই এখন আইনি পরীক্ষা। বাংলাদেশের অনুরোধের ভিত্তি কী, অভিযোগগুলো চুক্তির আওতায় পড়ে কি না, বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ভারতের কোনো নির্দিষ্ট আপত্তি আছে কি না, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গেলে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন কি না, আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকবে কি না এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে কী হবে—এসব প্রশ্ন সামনে আসবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া ভারতের জন্য বৈধ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের কাছ থেকে এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে তার বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত বিচার করবে বাংলাদেশের আদালত, ভারতের সরকার নয়।
অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড, সবচেয়ে বড় আইনি জটিলতা
দিল্লির সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা সম্ভবত এখানেই। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে এবং আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ফলে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নটি এখন আর কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে গেছে বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রশ্ন। ভারত যদি অনুপস্থিতিতে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আপত্তি তোলে, সেটিকে আইনি উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও পাল্টা প্রশ্নটি খুবই স্পষ্ট—একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বিচার এড়াতে দেশ ছেড়ে অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয় নেন, তাহলে তাঁর অনুপস্থিতিকে কি বিচারপ্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে? তাহলে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বিদেশে আশ্রয় নিলেই কি বিচার অনির্দিষ্টকাল আটকে থাকবে?
এখানে অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের বিচার নিশ্চিত করার অধিকারও। কোনো বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার প্রতিকারও আইনের পথেই খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হলে পুনর্বিচার, আপিল বা অন্য কোনো আইনি সুযোগের বিষয় আলোচনা হতে পারে। কিন্তু একজন অভিযুক্তকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আড়ালে রেখে বিচারপ্রক্রিয়াকেই অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য তাই অবস্থানটি হওয়া উচিত একেবারে পরিষ্কার—বিচারের পদ্ধতি নিয়ে ভারতের আপত্তি থাকলে ঢাকা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই তার জবাব দেবে; কিন্তু সেই আপত্তিকে শেখ হাসিনাকে অনির্দিষ্টকাল ভারতে রাখার অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। কারণ এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিষয় নয়; জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত দিল্লিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতার আশ্রয়দাতা হিসেবে পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ আঁকড়ে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এই প্রশ্নকে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের জায়গা থেকে দেখবে।
‘আইন’ কি কূটনীতির আড়াল হবে?
২৩ আগস্টের দ্য স্টেটসম্যান সম্পাদকীয়র মূল প্রশ্ন এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে একটি আইনি বিষয় হিসেবে দেখবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের হিসাবও সেখানে কাজ করবে? দিল্লি যদি সত্যিই মনে করে এটি একটি আইনি বিষয়, তাহলে সেই আইনি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। কী কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, কোন ধারায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, কী ধরনের নিশ্চয়তা চাওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে একটি স্পষ্ট কাঠামো থাকা দরকার।
কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখলে বাংলাদেশের কাছে সেটি আর শুধু আইনি প্রক্রিয়া বলে মনে হবে না। সন্দেহ তৈরি হবে—দিল্লি কি সময় নিচ্ছে, নাকি সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাচ্ছে? আর সেই সন্দেহই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো সিদ্ধান্তই এখন শুধু দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ভারতের আঞ্চলিক নীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তার আচরণ এবং বাংলাদেশের জনগণের চোখে ভারতের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাবে।
দিল্লির সামনে তিন পথ, ঝুঁকিও তিন রকম
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের সামনে মোটামুটি তিনটি পথ। প্রথমত, ভারত বাংলাদেশের অনুরোধ মেনে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে পারে। এতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা দূর হবে। জুলাইয়ের পর নতুন বাস্তবতাকে ভারত মেনে নিয়েছে—এমন একটি শক্তিশালী বার্তাও যাবে। তবে এর সঙ্গে ভারতের আইনি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় থাকবে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত বিচারপ্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ড বা অন্য কোনো আইনি কারণ দেখিয়ে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এতে ভারত নিজের আইনি অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর ব্যাখ্যা খুব কঠিন হবে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন উঠবে—একজন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ও আদালতের রায় রয়েছে, তাঁকে ভারত কেন ফেরত দিচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর যতই আইনি হোক, তার রাজনৈতিক অভিঘাত থাকবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়বে এবং পুরোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগও আরও জোরালো হতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনি প্রতিকারের নিশ্চয়তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে এরপর প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। দিল্লির জন্য এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পথ হতে পারে। কিন্তু এখানেও শর্ত আছে—এই প্রক্রিয়া যেন অনন্তকাল ধরে না চলে এবং আইনি যাচাই যেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এড়ানোর কৌশল হয়ে না দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায়ও নিতে হবে।
ভারত কি শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে নতুন বাংলাদেশকে বিচার করবে?
বাংলাদেশের নতুন সরকার আওয়ামী লীগ নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় নেই। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছে এবং সেই সঙ্গে বদলে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও। কিন্তু দিল্লি যদি এখনো শেখ হাসিনাকে ঘিরেই বাংলাদেশকে বোঝার চেষ্টা করে, তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান বিবেচনা হিসেবে দেখে, তাহলে সেটি হবে পরিবর্তিত বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তাকে পাশ কাটিয়ে পুরোনো সমীকরণ আঁকড়ে থাকার অর্থ হলো বাংলাদেশের জনগণের পরিবর্তিত আকাঙ্ক্ষাকেও উপেক্ষা করা। ভারতের জন্য প্রশ্ন তাই শুধু শেখ হাসিনা কীভাবে, কোথায় থাকবেন—তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, দিল্লি কি ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত?
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের নিজস্ব অবস্থান থাকতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থানকে বাংলাদেশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মাপকাঠি বানানো হলে দুই দেশের সম্পর্কই সংকীর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণে আটকে যাবে। কারণ বাংলাদেশ কোনো একজন নেতা, কোনো একটি দল কিংবা কোনো একটি সরকারের নাম নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্যিক স্বার্থ, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত বাস্তবতা এবং দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। এসব সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে অনেক বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী। ফলে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারতের নীতি যদি নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি বাংলাদেশের নয়, ভারতেরই হতে পারে।
আর এখানেই দিল্লির জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি অপেক্ষা করছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের দায় ধরে রাখা, নাকি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দেওয়া—ভারতকে শেষ পর্যন্ত এই দুটির একটি বেছে নিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জনগণ যদি মনে করে, ভারত এখনো তাদের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার বদলে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রকে আঁকড়ে আছে, তাহলে সেই অবিশ্বাস সহজে দূর হবে না। বিপরীতে, দিল্লি যদি বুঝতে পারে যে সরকার বদলেছে মানেই শত্রু বদলায়নি, বরং সম্পর্কের ভিত্তি নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টেকসই করতে হলে তাই শেখ হাসিনাকে নয়, বাংলাদেশকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
‘ভারতবিরোধিতা’ বলে সবকিছু উড়িয়ে দিলে ভুল হবে
দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য আরেকটি বিষয় বোঝা জরুরি। বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে শুধু ‘ভারতবিরোধী প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দিলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে থাকবে। সীমান্তে প্রাণহানি নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষোভ আছে। পানির হিস্যা নিয়ে ক্ষোভ আছে। বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পায়—এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। আর শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এসব পুরোনো ক্ষোভের সঙ্গে নতুন একটি রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
ভারতের উচিত এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার ভাষায় খোঁজা। শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি দিয়ে নয়। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মানুষের মনে যদি দীর্ঘদিন ধরে ধারণা তৈরি হয় যে ভারত শুধু নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সেই ধারণা একসময় রাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই প্রভাবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
চীনের ছায়া আছে, কিন্তু সেটিই সব নয়
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আলোচনায় চীনের প্রসঙ্গ এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের উপস্থিতি গত এক দশকে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। ফলে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও বহুমুখিতা দেখা দিলে দিল্লির উদ্বেগ বাড়তে পারে—এটিও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এখানেই ভারতের সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে, যদি তারা বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাধীন সিদ্ধান্তকে চীনের প্রভাবের ফল হিসেবে দেখতে শুরু করে।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে কি না, কতটা রাখবে কিংবা কোন ক্ষেত্রে অন্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াবে—এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। ঢাকা যদি চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্যে কাজ করে, জাপানের সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করে কিংবা তুরস্কসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে, তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে কোনো জোট তৈরি করছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক কৌশলই হলো একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা। বরং বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করলে ভারতের সঙ্গে দূরত্বই বাড়তে পারে।
দিল্লির জন্য তাই চীনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে দেখার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি জরুরি, যেখানে ভারতকে আলাদা কোনো সুবিধা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কমাতে হবে না। বাংলাদেশ যদি দেখে ভারত তার সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান করছে, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে ন্যায্য সমাধানে আগ্রহী এবং সম্পর্ককে কোনো রাজনৈতিক দলের আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল করছে না, তাহলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তাও বাংলাদেশের কাছে আলাদা করে বোঝাতে হবে না। কারণ প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব তৈরি হয় চাপ দিয়ে নয়, আস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে চীনের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে ভারতের জন্য বেশি জরুরি হলো—বাংলাদেশ যেন ভারতকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব না করে।
দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্র
শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা যতই পুরোনো হোক, সেটি এখন ভারতের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে কোনো সমীকরণ চিরস্থায়ী নয়। আজকের ক্ষমতাসীন দল আগামীকাল বিরোধী দলে যেতে পারে। আজকের ঘনিষ্ঠ নেতা আগামীকাল রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে যায়।
তাই ভারতের বাংলাদেশ নীতিকে যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি করতে হয়, তাহলে তাকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বদলাবে, সরকার বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলাবে না। এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া ভারতের জন্যই বেশি লাভজনক।
জুলাইকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোনোর সুযোগ নেই
ভারত চাইলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখতে পারে। কিন্তু এর রক্তাক্ত বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জুলাইয়ে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। রিয়া গোপের মতো শিশুসহ শত শত শিশু নিহত হয়েছে। অসংখ্য মানুষ গুলিতে পঙ্গু হয়েছেন, অনেকে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। শেখ হাসিনা তাঁর ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতেই রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন—এমন অভিযোগ ও তার ভয়াবহ পরিণতি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তাই জুলাইকে শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন।
এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। দিল্লি এই পরিবর্তন পছন্দ করুক বা না করুক, তাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গেই সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে জুলাইয়ে নিহত, আহত, পঙ্গু ও দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের পরিবারের কাছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিছক কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ফলে ভারত যদি পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ আঁকড়ে ধরে নতুন বাংলাদেশকে বিচার করে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার গভীরতা বোঝা তার পক্ষে কঠিন হবে।
নতুন বাংলাদেশ ভারতের শত্রু হতে চায়—এমন কোনো অবধারিত বাস্তবতা নেই। কিন্তু ভারতনির্ভরও থাকতে চায় না। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে—এটাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতি। দিল্লির উচিত সেটিকে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে না দেখে বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা। জুলাইয়ের রক্তাক্ত অধ্যায়কে পাশ কাটিয়ে পুরোনো বাংলাদেশ খুঁজলে ভারত শুধু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই ভুল বুঝবে না, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল করবে।
বাংলাদেশেরও কিছু দায়িত্ব আছে
এখানে বাংলাদেশের দায়িত্বও কম নয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পর্কের প্রতিটি বিষয়কে শুধু হাসিনা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করলে চলবে না। সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে পারস্পরিক সুবিধা—এসব বিষয়েও একই ধরনের দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার—বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু অসম সম্পর্ক নয়; সহযোগিতা চাই, কিন্তু সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়; বাণিজ্য চাই, কিন্তু একতরফা সুবিধার ভিত্তিতে নয়; নিরাপত্তা সহযোগিতা চাই, কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে নয়। এই অবস্থান কোনো ভারতবিরোধিতা নয়। বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক আত্মমর্যাদার অবস্থান।
মোদি বদলাবেন, নাকি বাস্তবতাই তাঁকে বদলাবে?
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো—দিল্লি কি পুরোনো রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে বের হতে পারবে? নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য এটি সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কারণ শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কের উত্তরাধিকার বহন করতে গিয়ে যদি নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়, তাহলে তার মূল্য ভারতকেই দিতে হবে।
দিল্লির জন্য আরও বড় সমস্যা হলো—বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো একক কোনো রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। নতুন সরকার নিজস্ব রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের প্রত্যাশাও বদলেছে। দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখিতা ও কৌশলগত ভারসাম্যের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ভারত যদি পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবের জায়গা থেকে বাংলাদেশকে দেখতে থাকে, তাহলে সেটি শুধু কূটনৈতিক ভুল হবে না; বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে।
পুরোনো মিত্রতা নয়, নতুন বাস্তবতা
শেখ হাসিনা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত চেয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত ভারতের। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারত যদি তাঁকে ফেরত দেয়, তাহলে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী বার্তা যাবে—দিল্লি নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে এবং বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করছে। আর যদি তাঁকে ফেরত না দেয়, তাহলে ঢাকায় প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি এখনো পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের দায় থেকে বের হতে পারেনি?
দুই ক্ষেত্রেই ভারতের জন্য রাজনৈতিক মূল্য আছে। তাই দিল্লির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেয় এবং কোন নীতির ভিত্তিতে নেয়। আইন নাকি কূটনীতি, পুরোনো মিত্রতা নাকি নতুন বাংলাদেশ, একজন সাবেক নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নাকি একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন ভারতের সামনে। তবে বাংলাদেশের দিক থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সেটিকে পাশ কাটিয়ে কোনো পুরোনো সমীকরণে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তাই আপসহীন হওয়া স্বাভাবিক। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভাগ্যের ওপর নির্ভর করবে না। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য হবে, কিন্তু বাণিজ্যের নামে একতরফা সুবিধা মেনে নেওয়া হবে না। সীমান্তে সহযোগিতা হবে, কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষের জীবন নিয়ে আপস করা হবে না। পানি নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নে ছাড় দেওয়া হবে না। আঞ্চলিক সহযোগিতা হবে, কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।
ভারতের জন্যও এখন বাস্তবতা বোঝার সময় এসেছে। শেখ হাসিনা একজন ব্যক্তি। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র। একজন ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করার নীতি দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জন্যই নিরাপদ নয়। জুলাইয়ের পর বাংলাদেশ সেই পুরোনো জায়গায় নেই। এখন ভারত যদি পুরোনো বাংলাদেশকে খুঁজতে থাকে, তাহলে সমস্যাটা বাংলাদেশের নয়—ভারতেরই। কারণ প্রতিবেশী বদলায়নি; বদলেছে তার রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আর সেই বাস্তবতা মেনে নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুরোনো রাজনৈতিক নির্ভরতার ছায়ায় থাকবে, নাকি সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। শেখ হাসিনা ইস্যু তাই শুধু প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ নীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সম্ভবত শেখ হাসিনাকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—জুলাইয়ের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে দিল্লি শেষ পর্যন্ত মেনে নেবে কি না।