ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে হঠাৎ একটি ঘোষণা এল—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার কারণে শনিবারের নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হবে না। ঘোষণাটি প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা শুরু হয়, তবে কি ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সফরসূচি চূড়ান্ত হয়ে গেছে? কিন্তু কিছু সময় পরই সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করা হলো। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাল, এ মুহূর্তে বলার মতো কিছু নেই। ঢাকার অবস্থানও সতর্ক—প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঘটনাটি প্রশাসনিক সমন্বয়ের ভুল হতে পারে। আবার এর মধ্যে কূটনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে। কারণ, তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে। ভারতীয় পক্ষ থেকে দ্রুত সফরের আগ্রহের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু ঢাকা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সফরের আগে একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে কার্যকর প্রতিক্রিয়া চায় তারা।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভারত কেন এত দ্রুত বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে নিতে চাইছে? এটি কি কেবল দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কূটনৈতিক সৌজন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভারতের বৃহত্তর নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক কৌশলের হিসাব? আরও বড় প্রশ্ন—দিল্লি কি বুঝতে পারছে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ আগের জায়গায় নেই?
নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক ঠিক করতে চায় ভারত
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, সেটি নয়াদিল্লির জন্য আর উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানান। এরপর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও বাড়ে। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বিভিন্ন বক্তব্যেও তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করলে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। সম্প্রতি তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্যে বারবার দ্রুত সফরের প্রত্যাশা উঠে আসছে।
কূটনীতিতে রাষ্ট্রদূতেরা সাধারণত পরিমিত ও সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেন। সেখানে যদি বারবার ‘দ্রুত’, ‘শিগগির’ কিংবা সরাসরি দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা সামনে আসে, তাহলে বোঝা যায়—দিল্লি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কিন্তু কেন? এর উত্তর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি এবং সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান।
ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক একটি প্রয়োজন। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের সময় যে রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর সেই সম্পর্ক দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি এখন আর নেই। দিল্লিকে তাই নতুন বাস্তবতায় নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে হচ্ছে।
দিল্লির সামনে এখন ‘পুরনো বাংলাদেশ’ নেই
ভারতের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি সম্ভবত এটাই—পুরনো বাংলাদেশ আর নেই। আগের সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক যোগাযোগ। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো ও বাণিজ্যে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ভারতের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল একটি কার্যকর কৌশলগত অংশীদারত্ব। কিন্তু সেই রাজনৈতিক কাঠামো বদলে গেছে। নতুন সরকার বলছে, বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, তবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। অর্থাৎ ভারত প্রথম, চীন প্রথম কিংবা পাকিস্তান প্রথম নয়—বাংলাদেশ প্রথম। এই অবস্থান শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি পরিবর্তিত দর্শনও রয়েছে।
ভারতের জন্য এটি নতুন বাস্তবতা। কারণ বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রতিবেশী নয়; দেশটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত, অসংখ্য আন্তঃসীমান্ত নদী, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বন্দর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা—সবকিছুর মাঝখানে বাংলাদেশ।
ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি দীর্ঘদিনের ঘোষিত অগ্রাধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দিল্লিকে সেই নীতির প্রয়োগ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ, প্রভাব বিস্তার আর অংশীদারত্ব এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা ও বাস্তব ফলাফল। তাই নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ভারতের কাছে সাধারণ কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের অংশ।
চীনের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা দিল্লির উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে—এটি এখন দিল্লির অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী। শিল্প, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে চীনের উপস্থিতি রয়েছে। তিস্তা নদী অববাহিকাকে ঘিরেও চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা আছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের উদ্বেগ তখনই বাড়ে, যখন অর্থনৈতিক সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, তিস্তা অববাহিকা, বঙ্গোপসাগর ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাছাকাছি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি হলে তা ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভারত চাইবে—বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক থাকুক, কিন্তু বাংলাদেশের কৌশলগত সমীকরণ থেকে ভারত যেন বাদ না পড়ে। এখানেই তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সম্পর্ক দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত সম্ভবত বুঝতে পারছে, বাংলাদেশের ওপর একচেটিয়া প্রভাব ধরে রাখার সময় শেষ। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত—চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ঠেকানো নয়; বরং বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তে ভারতের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় ভারতকে নিজের জায়গা ধরে রাখতে হবে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা: পুরনো কাঠামো টিকবে কি?
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। সীমান্ত, মাদক ও অস্ত্র পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, জঙ্গিবাদ, গোয়েন্দা তথ্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতীয় নিরাপত্তা মহল বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখেছে। এখন নতুন সরকার সেই সহযোগিতা কতটা অব্যাহত রাখবে, কোন শর্তে রাখবে এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা অগ্রাধিকার কী হবে—এগুলো দিল্লির জন্য বড় প্রশ্ন।
আগস্টে ভারতের পররাষ্ট্র গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর এবং বাংলাদেশের শীর্ষ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠকও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় ও বাংলাদেশি সূত্রের আলোচনায় নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি এসেছে। ভারত নিশ্চিত হতে চাইবে, নতুন বাংলাদেশ সরকার নিরাপত্তা সহযোগিতার আগের কাঠামো কতটা বজায় রাখবে।
আর এই প্রশ্নের সবচেয়ে কার্যকর উত্তর পাওয়া যায় সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায়। এ কারণেই তারেক রহমানের সফর ভারতের কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়; নিরাপত্তাগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
পানি: গঙ্গা চুক্তি, তিস্তা ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি পানি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি সামনে। নতুন চুক্তি বা পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে রয়েছে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন—যে প্রশ্নটি বাংলাদেশের জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ন্যায্য পানির হিস্যা চায়। ভারতও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। কিন্তু এখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা বড় বাধা। পশ্চিমবঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর অবস্থান বিবেচনা না করে কেন্দ্রীয় সরকার একতরফাভাবে পানি চুক্তি এগিয়ে নিতে পারে না। ফলে পানি প্রশ্নটি শুধু ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও বিষয়।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। ঢাকা চাইবে, দীর্ঘদিনের আলোচনাগুলো যেন আবার শুধু আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে না থাকে। কারণ পানি প্রশ্নে বাংলাদেশের কাছে সময়ের মূল্যও আছে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সঙ্গে গঙ্গা পানি চুক্তি, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৃহত্তর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চলছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। অর্থাৎ দিল্লির কাছে সফরটি একটি দরজা—যে দরজা দিয়ে একই সঙ্গে পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আস্থার সংকট নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ঢাকার প্রশ্ন আরও সরাসরি—সফরের আগে কি ভারত পানি প্রশ্নে কোনো বাস্তব অগ্রগতির ইঙ্গিত দেবে, নাকি আবারও বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার মধ্যে আটকে থাকবে?
অর্থনীতি ও জ্বালানি: পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা
ভারতের জন্য বাংলাদেশ একটি বড় বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নেয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল, বিদ্যুৎ, পণ্য পরিবহন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। সম্পর্ক খারাপ হলে শুধু বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ভারতের ব্যবসা, সীমান্তবর্তী রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিও প্রভাবিত হয়। তাই দিল্লি চায় রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক, যাতে অর্থনৈতিক সম্পর্কও দ্রুত স্বাভাবিক করা যায়।
তবে এখানেও ঢাকার অবস্থান বদলেছে। বাংলাদেশ এখন বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ককে একতরফা নির্ভরতার বদলে বহুমুখী অংশীদারত্বের কাঠামোয় দেখতে চাইছে। চীন, উপসাগরীয় দেশ, তুরস্ক এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর লক্ষ্য সেই কৌশলেরই অংশ। এর অর্থ ভারতকে বাদ দেওয়া নয়। বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে এমন একটি কাঠামোয় নেওয়া, যেখানে বাংলাদেশ অন্য অংশীদারদের সঙ্গেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বাধা: শেখ হাসিনা
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্নটি হলো শেখ হাসিনাকে ঘিরে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার চাওয়া ছিল আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য ঢাকার ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যদি ভারতের মাটিতে থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আগস্টের শুরুতে দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ঢাকা জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে একটি অনুকূল বা উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে তারা। এই শব্দবন্ধটি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা সরাসরি বলছে না যে সফর বাতিল। বরং বলছে—সফরের আগে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ সফরের আগে রাজনৈতিক অস্বস্তির জায়গাগুলোতে অন্তত কিছুটা অগ্রগতি দেখতে চায় ঢাকা।
ভারতের জন্য এটিই সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক হিসাব বদলাতে পারে। আবার তাকে ভারতে রেখে দিলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বাধা থেকেই যাবে। দিল্লি তাই সময় নিতে চাইতে পারে। কিন্তু ঢাকা সেই সময়কে অনির্দিষ্ট করতে রাজি নয়—এমন বার্তাই সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
ঢাকার কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ছে
আগে প্রশ্ন ছিল, ভারত কি বাংলাদেশকে দরকার মনে করে? এখন প্রশ্নটি অনেকটাই পাল্টেছে। বাংলাদেশও কি ভারতকে ছাড়া চলতে পারে? উত্তর হলো, বাংলাদেশের জন্য ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের বিকল্পও যে আগের চেয়ে বেড়েছে, সেটিও সত্য। ঢাকা বলছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চাই। কিন্তু একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে। এটি কোনো একক জোটে যোগ দেওয়ার নীতি নয়। বরং এটি বহুমুখী কূটনীতির চেষ্টা—যেখানে বাংলাদেশ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকবে না।
এই নীতির রাজনৈতিক ভাষা—বাংলাদেশ প্রথম। দিল্লির জন্য এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। কারণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্প যত বাড়বে, ভারতের প্রভাবের একচেটিয়াতা তত কমবে। তবে প্রভাব কমা মানেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ—সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সত্যিকার অর্থে দীর্ঘমেয়াদি করতে চায়, তাহলে তাকে বুঝতে হবে যে ঢাকা এখন আর কোনো একটি দেশের ছায়ায় থাকতে চায় না।
মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই, তবু দিল্লির নজরে
৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মূল ধারণা হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিন দেশই এটিকে প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা হিসেবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ এখনো এই চুক্তির অংশ নয়। তাই মক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে দিল্লির জন্য বিষয়টি নজরে রাখার মতো।
কারণ সৌদি আরব বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। চুক্তিটি ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। এমনকি সাম্প্রতিক কিছু ভারতীয় প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ইতিবাচক মনোভাবের কথাও এসেছে, যদিও বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই এটিকে সম্ভাবনার পর্যায়েই দেখা উচিত।
তবু বৃহত্তর প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি দেখছে—বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু ভারত ও চীনের বিকল্প নেই। কূটনৈতিক পরিসর আরও বড় হচ্ছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সঙ্গে দ্রুত একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি করা ভারতের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারত কি ভয় পাচ্ছে?
‘ভয়’ শব্দটি কূটনৈতিকভাবে কঠিন। তবে উদ্বেগ—সেটি স্পষ্ট। ভারত চায় না বাংলাদেশ তার কৌশলগত পরিসর থেকে দূরে সরে যাক। চীন যেন অতিরিক্ত প্রভাবশালী না হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে না দেয়। সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন সমীকরণের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন এমন পর্যায়ে না যায়, যেখানে দিল্লির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে ভারত চায় বাংলাদেশে তার পুরনো অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের স্বার্থগুলো অক্ষুণ্ন থাকুক।
তাই তারেক রহমানের সফর দিল্লির কাছে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি একটি কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ। ভারতের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশকে কি আগের মতো প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হবে, নাকি সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা হবে? দ্বিতীয় পথটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সম্ভবত বেশি কার্যকর। কারণ কোনো প্রতিবেশীকে দীর্ঘদিন প্রভাবের বলয়ে রাখা যায় না, যদি সেই প্রতিবেশীর হাতে বিকল্প কূটনৈতিক পথ তৈরি হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণার তাৎপর্য
রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণা এবং পরে সেটি প্রত্যাহারের ঘটনাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভারতের হাইকমিশনার বলছেন, সফর দ্রুত হওয়া উচিত। তিনি বলছেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি বৈঠক হলে সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি ভবনের ওয়েবসাইটে এমন একটি ঘোষণা প্রকাশিত হলো, যাতে মনে হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার প্রস্তুতি চলছে। পরে সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করা হলো।
এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিলের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটি কেন বাতিল হয়েছিল—তা সরকারি সূত্রে সফরের অভ্যর্থনার সঙ্গে চূড়ান্তভাবে যুক্ত করা হয়নি। ফলে এটিকে সরাসরি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে ঘটনাটি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে প্রত্যাশা ও বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যে এখনো ব্যবধান রয়েছে।
দিল্লি সফরটি চায়, ঢাকা সফরের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সম্ভবত সফরের তারিখ, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো পূর্ণ সমঝোতা হয়নি। দিল্লি দ্রুততা চাইছে; ঢাকা চাইছে—শর্ত ও ফলাফল স্পষ্ট হোক।
ঢাকার হাতে এখন তিনটি বড় শক্তি
বাংলাদেশের হাতে অন্তত তিনটি বড় কূটনৈতিক শক্তি রয়েছে। প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই ভূগোলকে পাশ কাটিয়ে ভারতের আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়ন কঠিন। দ্বিতীয়ত, বিকল্প কূটনৈতিক অংশীদার। চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাড়ছে। ফলে ঢাকার দর-কষাকষির ক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি। তৃতীয়ত, ভারতেরও বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি ও বঙ্গোপসাগর—সব ক্ষেত্রেই ভারতের স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
এই তিন বাস্তবতা ঢাকার অবস্থানকে আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে। তবে এর অর্থ ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বরং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই অন্য অংশীদারদের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানো।
ভারতকে যেমন বাংলাদেশকে হারানোর ভয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, তেমনি বাংলাদেশকেও কোনো নতুন শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কূটনীতির মূল শক্তি হলো নিজের বিকল্প খোলা রাখা।
নতুন বাংলাদেশ কি ভারসাম্যের কূটনীতি করতে পারবে?
এখানে বাংলাদেশের জন্যও বড় পরীক্ষা আছে। বহুমুখী কূটনীতি মানে সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা নয়। বরং নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রত্যেক অংশীদারের সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক পরিচালনা করা। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে গিয়ে ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলা যেমন বাংলাদেশের স্বার্থ নয়, তেমনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগ নষ্ট করাও বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই ভারতবিরোধী অবস্থান নয়। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মানেই কোনো সামরিক জোটে যাওয়া নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ব্লকে যুক্ত হওয়া নয়।
বাংলাদেশের কূটনীতির আসল শক্তি এখানেই—একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রাখা। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা সহজ নয়। প্রতিটি বড় শক্তির নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশকে তাই আবেগ নয়, হিসাব দিয়ে এগোতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা যেন অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের শত্রুতায় পরিণত না হয়—এই ভারসাম্যই হবে নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে কী নিয়ে আলোচনা হতে পারে?
সফর শেষ পর্যন্ত হলে আলোচনার টেবিলে কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও প্রাণহানি। তৃতীয়ত, গঙ্গা ও তিস্তা পানি প্রশ্ন। চতুর্থত, বাণিজ্যিক বাধা ও বাজারসুবিধা। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা। ষষ্ঠত, রেল, সড়ক ও নৌ যোগাযোগ। সপ্তমত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা। অষ্টমত, বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এবং সবশেষে—দুই দেশের সম্পর্কের নতুন রাজনৈতিক কাঠামো।
এই শেষ বিষয়টিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো একটি চুক্তি কিংবা একটি সফর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সব সংকট সমাধান হবে না। প্রয়োজন সম্পর্কের ভিত্তি বদলানো। শেখ হাসিনা সরকারের সময় যে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর সম্পর্কের বড় অংশ নির্ভর করেছিল, সেটি এখন আর নেই। নতুন সম্পর্ককে তাই জনগণের স্বার্থ, অর্থনৈতিক পারস্পরিকতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্তে মানবিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সমতার ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে।
শেষ কথা: সফর নয়, সম্পর্কের নতুন কাঠামোই আসল
ভারত তারেক রহমানকে এত দ্রুত দিল্লিতে নিতে চাইছে কেন? কারণ দিল্লি বুঝতে পারছে—বাংলাদেশ বদলে গেছে। নতুন সরকার এসেছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। মক্কা চুক্তি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য দিক দেখাচ্ছে। গঙ্গা চুক্তির প্রশ্ন সামনে, তিস্তা অমীমাংসিত, জ্বালানি ও বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ, সীমান্ত নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। আর সবকিছুর ওপরে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন।
এই সবকিছুর মাঝখানে দিল্লি চাইছে তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে। কিন্তু ঢাকা এবার শুধু আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে চাইছে না। ঢাকা জানতে চাইছে—ভারত কী দিতে প্রস্তুত? শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী? সীমান্তে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? পানি বণ্টনে দিল্লির অবস্থান কী? বাণিজ্য ও জ্বালানিতে সমতার জায়গা কোথায়? নিরাপত্তা সহযোগিতা কোন ভিত্তিতে হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা—বাংলাদেশকে কি ভারত সত্যিই সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখতে প্রস্তুত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিছক সৌজন্য সফর হবে, নাকি তা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তারেক রহমানের সফর হলে এটি শুধু তার প্রথম দিল্লি সফর হবে না। এটি হবে শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারত তার পুরনো সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারে—তার পরীক্ষা।
দিল্লির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশকে কি আগের মতো প্রভাবিত করা যাবে? নাকি নতুন বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থে দিল্লি, বেইজিং, রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে নিজের জন্য একটি নতুন কৌশলগত জায়গা তৈরি করবে? সম্ভবত এ কারণেই দিল্লি অপেক্ষা করছে তারেক রহমানের জন্য। কিন্তু এবার সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি শুধু দিল্লির হাতে নেই। চাবিকাঠি ঢাকার হাতেও।