বাংলাদেশিদের জন্য ভারত কতটা নিরাপদ?

সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত স্ত্রী আফসানা শারমিনের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের তিন বছরের সন্তান স্বর্ণাশিস এবং দেবাশিসের শ্বশুর মো. আকরাম আলী। চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু ১৯ আগস্ট ভোরে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন তাঁদের চারজনকেই কেড়ে নিল। একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও একজন বাংলাদেশি, আহমেদ বাবু। মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে ওই অগ্নিকাণ্ডে।
বাংলাদেশ থেকে একটি পরিবার চিকিৎসার আশায় ভারতে গিয়েছিল। ফিরল চারটি লাশ হয়ে। তাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে নয়। কোনো সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও নয়। তাঁরা গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। একজন অসুস্থ স্বজনকে সুস্থ করে দেশে ফেরার আশায়। কিন্তু যে শহরে চিকিৎসা পাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই একটি হোটেলের আগুন তাঁদের জীবন কেড়ে নিল।
এমন ঘটনায় শোকের পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই কিছু বাস্তবতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন আসে। প্রথমত আগুনটি কীভাবে লাগল? হোটেলটি কি অগ্নিনিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করেছিল? জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা ছিল কি? ভবনটি নিয়মিত পরিদর্শন করা হতো কি? আগুন লাগার পর মানুষ বের হওয়ার মতো বিকল্প পথ ছিল কি? কোনো অনিয়ম আগে ধরা পড়েছিল কি? ধরা পড়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তে আসবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, যার উত্তর শুধু ওই হোটেল কর্তৃপক্ষ বা পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের কাছ থেকে চাইলেই হবে না। তা হলো- বাংলাদেশিরা যখন চিকিৎসার জন্য ভারতে যান, তখন তাঁরা কি সেখানে শুধু একজন রোগী, একজন পর্যটক কিংবা একজন ‘পেইং কাস্টমার’? নাকি তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তারও সমান মূল্য আছে?
একটি আগুন, কিন্তু প্রশ্ন অনেক
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলে আগুন লাগার পর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পাঁচতলা পুরোনো ভবনের ভেতরে একাধিক ছোট হোটেল ছিল। সরু সিঁড়ি ছিল চলাচলের প্রধান পথ। পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন, অগ্নিসংকেত বা আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কক্ষে জানালা না থাকার কথাও এসেছে প্রতিবেদনে। অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা যান। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নয়জনকে বাঁচানো যায়নি।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—আগুনের কারণ এবং মৃত্যুর কারণ এক জিনিস নয়।
আগুন হয়তো কোনো দুর্ঘটনা থেকে শুরু হতে পারে। কিন্তু আগুন লাগার পর একটি ভবন কতটা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে, সেটি অনেকাংশে নির্ভর করে তার নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর। ধরা যাক, শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে যে, ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছিল কি না। সর্বশেষ কবে পরিদর্শন হয়েছিল। কোনো ত্রুটি ধরা পড়েছিল কি না। জরুরি বের হওয়ার পথ ছিল কি না। হোটেলের কর্মীরা আগুন লাগলে কী করতে হয়, সে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না।
আর যদি এসবের কোনোটি না থাকে, তাহলে আরও বড় প্রশ্ন—একটি এমন ভবন কীভাবে হোটেল হিসেবে চলতে পারল?
এখানেই দুর্ঘটনা আর অব্যবস্থাপনার পার্থক্য।
আগুন দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি সব সময় দুর্ঘটনা নয়। সেখানে ব্যবস্থাপনা, মালিকপক্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বের প্রশ্ন থাকে।
একই জায়গায় আগেও বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো, ২০২২ সালের মার্চে মির্জা গালিব স্ট্রিটেরই একটি গেস্টহাউসে আগুনে ৬০ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নারী, শামিমাতুল আরস, মারা গিয়েছিলেন। তখন ওই গেস্টহাউসে ২৮ জন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন বলে কলকাতা পুলিশের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। আরও কয়েকজন আহত হন। দমকল কর্মকর্তারাও তখন গেস্টহাউটিতে মৌলিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কথা জানিয়েছিলেন।
চার বছর পর আবার একই এলাকার একটি হোটেলে আগুন। আবার বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু। এবার সংখ্যাটা পাঁচ।
এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে বেশি ভাবায়।
একবার আগুন লাগতে পারে। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু একই ধরনের ঝুঁকি যদি একই এলাকায় বছরের পর বছর থেকে যায়, তখন প্রশ্নটা আর শুধু দুর্ঘটনার থাকে না। প্রশ্ন হয়—শিক্ষা নেওয়া হয়েছিল কি?
২০২২ সালের ঘটনার পর কি ওই এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর নিরাপত্তা নতুন করে পরীক্ষা করা হয়েছিল? যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে আবার এমন ঘটনা ঘটল কেন? আর যদি না করা হয়ে থাকে, তাহলে কেন করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। কারণ মানুষের জীবন কোনো ভবনের ট্রেড লাইসেন্সের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
বাংলাদেশিদের জন্য কলকাতার এই হোটেলগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এর একটা বাস্তব কারণ আছে। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজন বড় হাসপাতালের কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত কম খরচের হোটেল বা গেস্টহাউসে থাকেন। মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিটসহ নিউ মার্কেট এলাকার বিভিন্ন আবাসিক স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের কাছে পরিচিত।
কারণও সহজ। হাসপাতালের কাছে থাকা যায়। যাতায়াতের খরচ কম। খাবার পাওয়া যায়। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ পাওয়া যায়। আর তুলনামূলক কম খরচে থাকা সম্ভব। অর্থাৎ এসব হোটেল বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থীদের কাছে নিছক থাকার জায়গা নয়। চিকিৎসা-ভ্রমণের পুরো ব্যবস্থার একটি অংশ।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা কি সেই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে?একজন রোগী যখন হাসপাতালের চিকিৎসার জন্য টাকা দেন, তখন তিনি শুধু চিকিৎসার দাম দেন না। তাঁর সঙ্গে থাকা স্বজন হোটেলে টাকা দেন, রেস্টুরেন্টে টাকা দেন, ট্যাক্সি ব্যবহার করেন, ওষুধ কেনেন, পরীক্ষা করান, কেনাকাটা করেন।
একজন বাংলাদেশি রোগী তাই ভারতের অর্থনীতিতে এক জায়গায় নয়, বহু জায়গায় অর্থ ব্যয় করেন। ভারতের পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের কাছে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার—এটি বহু বছর ধরেই স্পষ্ট। ২০২৪ সালে ভারতের পর্যটনমন্ত্রী দেশটির সংসদে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসা ভিসায় ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৬ বাংলাদেশি ভারত সফর করেছেন।
এখন প্রশ্নটা তাই আরও সরাসরি করা যায়। যে মানুষটি আপনার দেশে এসে আপনার হাসপাতাল, হোটেল, পরিবহন, ফার্মেসি ও বাজারে অর্থ খরচ করছেন, তাঁর নিরাপত্তা কি আপনার সেবার অংশ নয়?
টাকা নেওয়ার সময় বাংলাদেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিপদের সময়?
এই প্রশ্নটি কঠিন। কিন্তু প্রশ্নটি করা দরকার।
বাংলাদেশি রোগীরা ভারতের হাসপাতালের জন্য বড় বাজার। তাঁদের সঙ্গে থাকা স্বজনেরা হোটেল ও অন্যান্য সেবা ব্যবহার করেন। তাঁদের ঘিরে তৈরি হয়েছে চিকিৎসা-ভ্রমণের একটি বড় অর্থনৈতিক পরিসর।
হাসপাতালগুলো বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আলাদা সহায়তা ডেস্ক রাখে। মেডিকেল এজেন্টরা বাংলাদেশে অফিস খুলে রোগী সংগ্রহ করেন। চিকিৎসার সঙ্গে হোটেল, যাতায়াত, ভিসা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সবকিছুর প্যাকেজ তৈরি হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশি রোগী সেখানে একটি ‘বাজার’ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। একই প্রতিবেদনে বছরে প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে একজন বাংলাদেশি রোগীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা যদি এতটা সুসংগঠিত হতে পারে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাটিও কি ততটা সুসংগঠিত হওয়া উচিত নয়?
এখানে কোনো বিশেষ সুবিধা চাওয়া হচ্ছে না। একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে যে মৌলিক নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেটুকুই চাওয়া হচ্ছে।
ভারত কি বাংলাদেশিদের জন্য অনিরাপদ?
একটি হোটেলের আগুন দিয়ে পুরো ভারতকে অনিরাপদ বলা যাবে না।
ভারতে অসংখ্য ভালো হাসপাতাল আছে। বহু বাংলাদেশি সেখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন। জটিল রোগের চিকিৎসা, বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার কিংবা উন্নত প্রযুক্তির জন্য ভারত এখনো অনেক বাংলাদেশির গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তাই এই কলামের উদ্দেশ্য ভারতবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়।
কিন্তু একটি ঘটনাকে ছোট করাও যাবে না।
কারণ নিরাপত্তা শুধু হাসপাতালের মান দিয়ে বিচার করা যায় না।
একজন রোগী হাসপাতালে নিরাপদ হতে পারেন, কিন্তু যে হোটেলে থাকছেন সেখানে যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে তাঁর চিকিৎসা-ভ্রমণ নিরাপদ নয়। তিনি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পেতে পারেন, কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলে পুরো যাত্রা নিরাপদ নয়।
তিনি ভালো সেবা পেতে পারেন, কিন্তু বিপদের সময় বিদেশি নাগরিক হিসেবে কোথায় সাহায্য চাইবেন তা না জানলে তাঁর নিরাপত্তা অসম্পূর্ণ।
নিরাপত্তা একটি পুরো ব্যবস্থার বিষয়। আর সেই ব্যবস্থার কোথাও বড় ফাঁক থাকলে তার মূল্য দিতে হয় মানুষকে।
রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, তবে প্রমাণ ছাড়া নয়
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন আগের মতো স্বাভাবিক জায়গায় নেই। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভিসা, সীমান্ত, বাণিজ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য—বিভিন্ন জায়গায় তার প্রভাব পড়েছে। এই বাস্তবতায় ভারতে যাওয়া সাধারণ বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা কেমন হচ্ছে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত নেই। সুতরাং এমন অভিযোগ করা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু প্রশ্ন তোলা যাবে।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে সাধারণ মানুষের চলাচল, চিকিৎসা ও সেবাপ্রাপ্তিতে তার কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি বিদেশে বিপদে পড়েন, তখন তাঁর জাতীয়তা নয়, তাঁর নাগরিক অধিকার ও মানবিক নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এখানে ভারতের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি দরকার স্বচ্ছতা। কারণ সন্দেহের সবচেয়ে ভালো জবাব বক্তব্য নয়, তদন্ত। কিন্তু শুধু ভারতকে প্রশ্ন করলে চলবে? চলবে না। এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতার আগুনের পর আমরা ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করছি। করা উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার।
বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য এত বেশি বিদেশে যায় কেন? শুধু কি ভারতীয় হাসপাতাল খুব ভালো বলে? শুধু কি উন্নত প্রযুক্তির জন্য/ নাকি আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটও এর পেছনে বড় কারণ?
উত্তরটা অস্বস্তিকর। কারণ বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রবণতা শুধু ধনী মানুষের বিলাসিতা নয়। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা হারানো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও অনেক সময় শেষ সঞ্চয় নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেন। কেউ মনে করেন দেশে সঠিক রোগ নির্ণয় হবে না। কেউ মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া কঠিন। কেউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় আস্থা পান না। কেউ খরচের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দিহান। কেউ চিকিৎসকের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় পান না। আবার কেউ হয়তো দেশে চিকিৎসা করিয়েই পরে বিদেশে যেতে বাধ্য হন, কারণ প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা এখানে পাওয়া যায়নি।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শুধু ‘দেশে চিকিৎসা নিন’ বলা যাবে না।
মানুষকে বিদেশে যাওয়া থেকে আটকানো নয়, বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমানো
সরকার চাইলে বিদেশে চিকিৎসার ভিসা কঠিন করতে পারে। ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধ দিতে পারে। কিন্তু রোগীর অসুস্থতা তো সীমান্তের নিয়ম মানে না। একজন ক্যানসার রোগীকে বলা যাবে না, আপনার ভিসা কঠিন করেছি, তাই এখন আপনার রোগও দেশে থাকবে। তাই সমাধান বিদেশযাত্রা বন্ধ করা নয়।
সমাধান হলো এমন চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসে।
যে চিকিৎসা বাংলাদেশে ভালোভাবে সম্ভব, তার জন্য মানুষকে বিদেশে যেতে হবে কেন? যে চিকিৎসা এখনো সম্ভব নয়, সেটির সক্ষমতা কেন তৈরি হবে না?
ক্যানসার, হৃদরোগ, নিউরোসার্জারি, কিডনি, লিভার, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, শিশু চিকিৎসা—এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু দামি যন্ত্রপাতি কিনলেই হবে না। দক্ষ জনবল, নার্স, টেকনিশিয়ান, গবেষণা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। আর সবচেয়ে কঠিন কাজটি হলো রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ মানুষ শুধু চিকিৎসা কিনতে বিদেশে যায় না। সে আস্থা কিনতে যায়।
যেখানে সে মনে করে তার কথা শোনা হবে, তার রোগটি ঠিকভাবে বোঝা হবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই দেওয়া হবে এবং তার সঙ্গে প্রতারণা হবে না—সেখানেই সে যেতে চায়।
চিকিৎসকদেরও এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলেও হবে না। চিকিৎসকদেরও নিজেদের কিছু প্রশ্ন করতে হবে। কেন একজন রোগী মনে করেন, বিদেশের চিকিৎসক তাঁকে বেশি সময় দেবেন? কেন তিনি মনে করেন, বিদেশে রোগ নির্ণয় বেশি নির্ভরযোগ্য? কেন তিনি মনে করেন, দেশে একাধিক পরীক্ষা করিয়েও পরিষ্কার ধারণা পান না? কেন তিনি মনে করেন, বিদেশে খরচ বেশি হলেও অন্তত প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ?
অবশ্যই দেশের অসংখ্য চিকিৎসক সীমিত সুযোগের মধ্যেও অসাধারণ কাজ করছেন। এই বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ভালো চিকিৎসক থাকা আর ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকা এক কথা নয়। একজন রোগীকে ভালো চিকিৎসা দিতে হলে ভালো চিকিৎসকের পাশাপাশি ভালো ব্যবস্থাপনাও দরকার। দরকার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং রোগীর প্রতি সম্মান।
রোগীকে শুধু একটি রিপোর্ট বা একটি বেড নম্বর হিসেবে দেখলে হবে না। তিনি একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে একটি পরিবার আছে। তাঁর ভয় আছে। তাঁর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আছে।
এই মানুষটির আস্থা হারালে শুধু একজন রোগী হারায় না, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থার একটি অংশ হারায়।
বিদেশে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য দরকার
বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের ঘাটতি। অনেক রোগী জানেন না কোন হাসপাতালে যাবেন। কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন। চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ কত। কোন চিকিৎসা দেশে করা সম্ভব। কোনটি বিদেশে করানো সত্যিই জরুরি।
এই জায়গায় মেডিকেল এজেন্ট ও দালালদের প্রভাব তৈরি হয়। কারও সঙ্গে হাসপাতালের ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকতে পারে। কেউ রোগীকে নির্দিষ্ট হাসপাতালে পাঠিয়ে কমিশন পেতে পারেন। ফলে রোগীর জন্য সবচেয়ে ভালো হাসপাতাল কোনটি, সেই প্রশ্নের জায়গায় কখনো কখনো অন্য হিসাব চলে আসে। তাই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা থাকা দরকার।
কোন হাসপাতাল স্বীকৃত, চিকিৎসকের যোগ্যতা কী, চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ কত, জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব তথ্য সহজে পাওয়া উচিত। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু অন্ধভাবে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া কেন হবে?
বিপদে পড়লে বাংলাদেশি রোগী কোথায় যাবেন?
কলকাতার আগুন এই প্রশ্নটিও সামনে এনেছে।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন বাংলাদেশি যদি হোটেলে আগুনে আটকা পড়েন, হাসপাতালে ভর্তি হন, প্রতারণার শিকার হন কিংবা কোনো আইনি সমস্যায় পড়েন- তখন তাঁর পাশে কে দাঁড়াবে? বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সহায়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু সাধারণ রোগী সেই সহায়তা সম্পর্কে কতটা জানেন?
বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। একটি সহজ যোগাযোগ নম্বর থাকতে পারে। একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থাকতে পারে। বিদেশে যাওয়ার আগে রোগীকে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে—জরুরি অবস্থায় কোথায় যোগাযোগ করবেন, কীভাবে সহায়তা পাবেন।
এটি কোনো বিলাসিতা নয়। নিজের নাগরিক বিদেশে থাকলে রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্বের অংশ।
চিকিৎসার নিরাপত্তা হাসপাতালের গেটের বাইরে শেষ হয় না
কলকাতার এই ঘটনা আমাদের সবচেয়ে নির্মমভাবে এই কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছে।
একজন বাংলাদেশি রোগীর চিকিৎসা শুরু হয় না হাসপাতালের দরজা দিয়ে ঢোকার পর। তাঁর চিকিৎসা-ভ্রমণ শুরু হয় দেশ ছাড়ার মুহূর্ত থেকে। বিমানবন্দর, সীমান্ত, ট্যাক্সি, হোটেল, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি আবার হোটেল। এই পুরো যাত্রার নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিদেশে চিকিৎসার নীতি শুধু হাসপাতালের তালিকা দিয়ে তৈরি করা যাবে না। আবাসন, যাতায়াত, জরুরি সহায়তা এবং নাগরিক সুরক্ষাকেও এর অংশ করতে হবে।
২০২২ সালে একই মির্জা গালিব স্ট্রিটে এক বাংলাদেশি নারী হোটেলের আগুনে মারা যাওয়ার পরও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির কথা উঠেছিল। চার বছর পর আবার একই এলাকায় বাংলাদেশিদের মৃত্যু—এই ধারাবাহিকতা অন্তত আমাদের এতটুকু প্রশ্ন করার অধিকার দেয় যে, আগের ঘটনার পর কী পরিবর্তন হয়েছিল।
চিকিৎসার টাকা দেশেই থাকুক, কিন্তু তার আগে আস্থা ফিরুক
বিদেশে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে যায়। ডেইলি স্টারের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয়ের একটি হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থের পুরোটা দেশে রাখা সম্ভব নয়। রাখা উচিতও নয়, যদি কোনো চিকিৎসা দেশে না থাকে।
কিন্তু যে চিকিৎসা দেশে সম্ভব, তার জন্যও যদি মানুষ বিদেশে যায়, তাহলে সেটা অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। এই অর্থের একটি অংশ যদি দেশের হাসপাতাল, গবেষণা, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও জনবলে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু নিজের রোগীদের ধরে রাখতে পারবে না, অন্য দেশের রোগীকেও আকৃষ্ট করতে পারবে। কিন্তু তার জন্য আগে রোগীকে বিশ্বাস করাতে হবে।
দামি ভবন দিয়ে আস্থা তৈরি হয় না। আস্থা তৈরি হয় চিকিৎসার মানে। আস্থা তৈরি হয় রোগীর সঙ্গে আচরণে। আস্থা তৈরি হয় খরচের স্বচ্ছতায়। আস্থা তৈরি হয় ভুল হলে জবাবদিহিতে। আর আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন একজন রোগী মনে করেন—এই জায়গায় আমার জীবন অন্য যেকোনো জায়গার মতোই মূল্যবান।
ভারতের কাছে প্রশ্ন আছে, বাংলাদেশের কাছেও
কলকাতার আগুনের পর ভারতের কাছে প্রশ্ন করা জরুরি। হোটেলটি কীভাবে চলছিল?নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কী ছিল? আগের অগ্নিকাণ্ড থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছিল? ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাইতে হবে। কারণ পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন সেখানে শেষ হয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের কাছেও প্রশ্ন আছে। আমরা কেন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করতে পারলাম না, যেখানে একজন মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়াকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখবেন? কেন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার আগে তাকে এতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়? কেন দেশের হাসপাতাল, চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা ফেরানোর কাজ এত কঠিন হয়ে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নয়, চিকিৎসাব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সবাইকে দিতে হবে। কারণ রোগীকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যায়। কিন্তু আস্থা না ফিরিয়ে তাকে দেশে রাখা যায় না।
পাঁচটি লাশের সামনে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটি থেকেই যায়
কলকাতার ওই হোটেলে আগুন লাগার পর হয়তো কয়েকদিন আলোচনা হবে। তদন্ত হবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হবে। কিছু হোটেল পরিদর্শন হবে। কোথাও হয়তো অগ্নিনিরাপত্তা বাড়ানো হবে। তারপর সময় চলে যাবে। কিন্তু পাঁচটি পরিবারে সময় আর আগের জায়গায় ফিরবে না।
সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন, তাঁদের ছোট্ট সন্তান স্বর্ণাশিস এবং দেবাশিসের শ্বশুর আকরাম আলী—তাঁরা আর দেশে ফিরবেন না। আহমেদ বাবুও ফিরবেন না। তাঁদের পরিবারের কাছে এই মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি জীবনের সমাপ্তি, একটি পরিবারের ভেঙে পড়া, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
ভারতের কাছে প্রশ্নটি খুব সাধারণ- বাংলাদেশিরা যখন আপনার দেশে এসে আপনার হাসপাতাল, হোটেল, পরিবহন, ফার্মেসি ও বাজারে অর্থ খরচ করেন, তখন তাঁরা কি শুধু ‘পেইং কাস্টমার’? তাঁদের জীবন কি সেই অর্থের মতোই মূল্যবান?
আর বাংলাদেশের কাছে প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর।আমরা কেন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি, যেখানে ভালো চিকিৎসার জন্য একজন বাংলাদেশিকে বারবার সীমান্ত পেরোতে হয় না?
কলকাতার আগুনকে কেন্দ্র করে তাই কোনো আবেগী বয়কটের ডাক সমাধান নয়। ভারতকে শত্রু বানানোও নয়। আবার ঘটনাটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’ বলে ভুলে যাওয়াও নয়।
প্রয়োজন জবাবদিহি। ভারতের কাছে নিরাপত্তার জবাবদিহি। বাংলাদেশের কাছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহি।
আর আমাদের সবার কাছে একটি কঠিন সত্যের স্বীকৃতি—বিদেশে চিকিৎসার জন্য মানুষ শুধু উন্নত হাসপাতালের খোঁজে যায় না, তারা আস্থার খোঁজেও যায়। কলকাতার আগুনে পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু আমাদের ভারতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু শুধু অন্যের দিকে আঙুল তুললে এই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হারিয়ে যাবে। আমাদের আয়নার দিকেও তাকাতে হবে। ভারতের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে—বাংলাদেশির টাকা যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, বাংলাদেশির জীবনও কি সমান গুরুত্বপূর্ণ? আর নিজেদের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে—আমাদের নাগরিককে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয় কেন? এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হয়তো কলকাতার আগুনে প্রাণ হারানো মানুষগুলোর প্রতি সবচেয়ে বাস্তব শ্রদ্ধা। কারণ শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারত থেকে বাংলাদেশিদের দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়।
লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়াকে শেষ ভরসা হিসেবে দেখবেন, প্রথম পছন্দ হিসেবে নয়।
আর যদি কখনো চিকিৎসার জন্য তাঁকে সীমান্ত পেরোতেই হয়, তাহলে তিনি যেন জানেন- তিনি শুধু একজন বিদেশি রোগী নন, তাঁর জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদারও মূল্য আছে।









