নতুন চেয়ারম্যান, নতুন কমিশনার; 'আকাঙ্ক্ষিত' নতুন দুদক কোথায়?
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কি ভুলে গেল সরকার?

সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের ছয় মাসের মাথায় দুদকের শীর্ষ নেতৃত্বে এই পরিবর্তন হলো। নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।
নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ এখনো নেই। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর কীভাবে কাজ করেন, সেটিই হবে আসল বিচার। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন আছে। নতুন মানুষ নিয়োগ দেওয়া হলো, কিন্তু দুদকের নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার হলো না কেন?
এই প্রশ্নটি শুধু আজকের নিয়োগকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, জুলাই জাতীয় সনদ এবং বিএনপির নিজের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ এটি নিছক একটি নিয়োগের প্রশ্ন নয়। এটি সংস্কার বনাম ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো—এই প্রশ্ন।
বর্তমান আইনে দুদক একটি চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নিয়ে গঠিত। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৭ ধারায় কমিশনার নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটির কথা বলা হয়েছে। সেই কমিটি ছয়জনের নাম সুপারিশ করে। এরপর রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে তিনজন কমিশনার নিয়োগ করেন এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান করা হয়। অর্থাৎ বর্তমান আইনি কাঠামোতে নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকলেও প্রক্রিয়াটি শুরু হয় সরকারের বিদ্যমান আইনগত কাঠামোর মধ্যেই।
এই ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল দীর্ঘদিন ধরে। কারণ দুদককে শেষ পর্যন্ত তদন্ত করতে হয় সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও। অথচ কমিশনের নেতৃত্ব নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাবের প্রশ্ন থাকলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। কমিশনে ছিলেন সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মাসুদ আহমেদ, অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, অধ্যাপক মোস্তাক খান, ব্যারিস্টার মাহদীন চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা শারমিন এবং একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।
কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনা ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে ৪৭টি সুপারিশ দেয়। এই ৪৭টি সুপারিশের সবকটির বিস্তারিত আলোচনা এখানে প্রয়োজন নেই। কিন্তু নিয়োগ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের কয়েকটি সুপারিশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাছাই কমিটিকে শুধু নাম বাছাইয়ের জায়গায় না রেখে বাছাই ও পর্যবেক্ষণ কমিটি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ ঠেকাতে সাত সদস্যের একটি বহুপক্ষীয় কমিটির প্রস্তাব দেওয়া হয়। চতুর্থত, এই কমিটির দায়িত্ব শুধু নিয়োগে সীমাবদ্ধ না রেখে দুদকের কাজ পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়। ছয় মাস পরপর কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
অর্থাৎ সংস্কার কমিশনের বক্তব্য ছিল খুব পরিষ্কার। শুধু ভালো মানুষ দিয়ে দুদক ভালো হবে না। ভালো মানুষ বাছাই করার পদ্ধতিটাও ভালো করতে হবে। কারণ একজন চেয়ারম্যান বা কমিশনার ব্যক্তিগতভাবে যতই সৎ হন, তিনি যদি এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়োগ পান যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব প্রধান হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনগণের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না।
আর এখানেই সংস্কারের মূল যুক্তি।
ধরা যাক, আজকের সরকার অত্যন্ত সৎ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর। কিন্তু আগামী সরকার কেমন হবে, আমরা জানি না। আজকের চেয়ারম্যান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু আগামী চেয়ারম্যান যদি একই কাঠামোয় নিয়োগ পান এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়েন, তাহলে আবার পুরোনো সমস্যাই ফিরে আসবে।
তাই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভালো সরকারকে বিশ্বাস করে ভালো প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়; বরং সরকার ভালো না হলেও প্রতিষ্ঠান যাতে ভালোভাবে কাজ করতে পারে, সেই কাঠামো তৈরি করা। এই জায়গাটিই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মানুষ শুধু একটি সরকারকে সরিয়ে আরেকটি সরকার চায়নি। মানুষ চেয়েছে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে না। দুদক সেই পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
কারণ যে সরকার দুদকের নেতৃত্ব নিয়োগ করবে, সেই সরকার বা তার মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধেই একদিন দুদককে তদন্ত করতে হতে পারে। এই স্বার্থের সংঘাত কমানোর জন্যই তো নিয়োগব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।
এখানেই বিএনপির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি দুদক সংস্কারের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং ৪৭টি সুপারিশের ৪৬টির সঙ্গে একমত ছিল বলে সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। তবে দুদকের নিয়োগ কাঠামোসহ কিছু প্রস্তাবে তাদের ভিন্নমত ছিল।
জুলাই সনদের আলোচনাতেও বিএনপি দুদক, পিএসসি, মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কাঠামো নিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। বিএনপির যুক্তি ছিল, এ ধরনের ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অযথা সীমিত হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সংসদের মাধ্যমে করা উচিত। অর্থাৎ বিএনপি সাত সদস্যের ওই কাঠামো গ্রহণ করেনি। এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু যে কাঠামো আপনারা গ্রহণ করেননি, তার বিকল্প কাঠামো কোথায়?
কারণ বিএনপি বলেছিল, প্রয়োজনীয় আইন পরে প্রণয়ন করা হবে। এখন বিএনপি সরকারে। এখন আইন করার ক্ষমতাও তাদের হাতে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি শুধু পুরোনো কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমনে পদ্ধতিগত ও আইনি সংস্কার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। ইশতেহারে এমনকি বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত দুদক সংস্কার যথেষ্ট নয়।
তাহলে প্রশ্নটি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। যদি আগের সংস্কার যথেষ্ট না হয়, তাহলে নতুন সরকারের সংস্কার কোথায়?
নতুন কমিশন নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু নতুন নিয়োগব্যবস্থা হয়নি। বিএনপি সরকার চাইলে বলতে পারে, দুদকের শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। একটি সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্বহীন রাখা সম্ভব নয়। তাই আগে কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, পরে বৃহত্তর সংস্কার করা হবে। এই যুক্তির একটি বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটিও খুব সহজ: তাহলে সংস্কারটি কবে হবে?
কারণ বর্তমান সরকার শুধু সময়ের অভাবে পুরোনো কাঠামোয় নিয়োগ দিয়েছে—এটি যদি যুক্তি হয়, তাহলে সংস্কারের একটি সময়সীমা দেওয়া উচিত। তিন মাস? ছয় মাস? এক বছর? কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা অন্তত জনগণকে জানানো উচিত।
কারণ আইনগতভাবে বর্তমান পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়া বৈধ হতে পারে। কিন্তু বৈধতা আর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এক বিষয় নয়। এখানে এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যা করেছে, তা বিদ্যমান আইনের আওতায় করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সরকার কি সেই আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল?
উত্তর হলো, হ্যাঁ। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেই দুদক ও দুদক আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাহলে সরকারকে প্রশ্ন করা অন্যায় হবে কেন? বরং এটাই তো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক জবাবদিহি।
একটি দল নির্বাচনের আগে বলে, আমরা দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার করব। জনগণ সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ভোট দেয়। তারপর সরকার ক্ষমতায় এসে পুরোনো আইনের কাঠামোয় নতুন কমিশন নিয়োগ করে। তখন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করতেই হবে: সংস্কারের প্রতিশ্রুতিটা কোথায় গেল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার যদি মনে করে দুদক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সাত সদস্যের বাছাই ও পর্যবেক্ষণ কমিটি কার্যকর নয়, তাহলে নিজেদের বিকল্প কাঠামো কী? যদি মনে করে দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করা প্রয়োজন নেই, তাহলে কেন প্রয়োজন নেই?
যদি মনে করে বর্তমান পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটিই যথেষ্ট, তাহলে তার স্বাধীনতা ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা কী? এগুলো সরকারের কাছে অযৌক্তিক দাবি নয়। বরং সরকারের নিজের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই এই প্রশ্ন।
এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের শেষ দিকে দুদক সংস্কারের জন্য যে সংশোধনী অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল, সেটি নিয়েও টিআইবি অভিযোগ করেছিল যে সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটির বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়টি তারা সমালোচনা করেছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু বর্তমান সরকারের সামনে আসেনি। আগের সরকারও পুরো সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি।
তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদলের বড় অর্থটি কোথায়? যদি আগের সরকার সংস্কার আটকে রাখে, নতুন সরকার এসে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে জনগণের জন্য পরিবর্তনটা কোথায়? এখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জুলাইয়ের মানুষ কি শুধু ক্ষমতাসীন ব্যক্তির পরিবর্তন চেয়েছিল? নাকি তারা ক্ষমতা ব্যবহারের নিয়মও বদলাতে চেয়েছিল? আমার মনে হয়, উত্তরটি পরিষ্কার। মানুষ চেয়েছিল রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিবর্তন। চেয়েছিল এমন প্রতিষ্ঠান, যা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।
মানুষ চেয়েছিল এমন প্রশাসন, যেখানে দলীয় পরিচয় চাকরি বা পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড হবে না। চেয়েছিল এমন বিচারব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য আইনের মান আলাদা হবে না। চেয়েছিল এমন দুদক, যে বিরোধী দলের দুর্নীতি যেমন দেখবে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিও দেখবে। এই শেষ জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সরকারের আসল দুর্নীতিবিরোধী পরীক্ষা হলো সে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কতটি মামলা করল, তা নয়।
তার নিজের দলের বিরুদ্ধে দুদক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারল, সেটিই আসল পরীক্ষা। আজ যদি নতুন দুদক আগের সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে মামলা করে, সেটি ভালো। কিন্তু কাল যদি বর্তমান সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আসে, তখনও যদি দুদক একইভাবে তদন্ত করতে পারে, তখন বলা যাবে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন।
আর এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্যই তো নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। এ কারণেই প্রশ্নটি নতুন চেয়ারম্যান বা দুই কমিশনারকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, সরকার কি এমন একটি দুদক তৈরি করতে প্রস্তুত, যে প্রয়োজনে এই সরকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারবে? যদি প্রস্তুত থাকে, তাহলে সংস্কার করতে ভয় পাওয়ার কারণ কী?
যদি সরকার বিশ্বাস করে তার মন্ত্রী-এমপিরা দুর্নীতি করবেন না, তাহলে স্বাধীন দুদক তৈরিতে সরকারের আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং স্বাধীন দুদক সরকারের জন্যই সুরক্ষা। কারণ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সরকারের ভালো কাজকে যেমন প্রমাণ করবে, তেমনি সরকারের ভেতরের দুর্নীতিও চিহ্নিত করবে।
তাতে সরকার ও রাষ্ট্রের পার্থক্য স্পষ্ট হবে। আর এটাই তো জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই না, যেখানে সরকার বদলালে শুধু দুর্নীতির মামলার আসামির তালিকা বদলায়। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান বদলায় না।
আমরা এমন দুদক চাই না, যে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে যাওয়ার আগে সরকারের অনুমতির অপেক্ষা করবে। আমরা এমন দুদক চাই, যে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
তাই বিএনপি সরকারের কাছে প্রশ্ন, আপনারা জুলাই সনদের প্রস্তাবিত নিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে একমত নন, ঠিক আছে। আপনারা নিজেদের বিকল্প মডেল দিন। আপনারা মনে করেন সাত সদস্যের বাছাই কমিটি প্রয়োজন নেই, ঠিক আছে। তাহলে এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা দিন, যেটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
আপনারা মনে করেন দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজন নেই, সেটিও ব্যাখ্যা করুন। কিন্তু সংস্কার করবেন না—এমন সিদ্ধান্তের যুক্তি কী? কারণ মানুষ তো সংস্কারের জন্যই রাজপথে নেমেছিল।
জুলাই তো শুধু সরকার পরিবর্তনের ডাক ছিল না। জুলাই ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের দাবি। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকেও কতটা নিয়মের মধ্যে আনতে রাজি। দুদক সেই পরীক্ষার একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সুতরাং নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের কাজ শুরু করতে দেওয়া হোক। তাদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার বিচার হোক।
কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের কাছেও প্রশ্ন থাকুক, দুদক সংস্কারের আইন কোথায়? নতুন নিয়োগ কাঠামো কোথায়? স্বাধীনতা ও জবাবদিহির নতুন নিশ্চয়তা কোথায়? সংস্কারের সময়সীমা কোথায়? কারণ একটি সরকারকে শুধু তার করা কাজ দিয়ে বিচার করা হয় না। অনেক সময় সে যে কাজটি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু করেনি, সেটিও হিসাবের অংশ।
বিএনপি বলেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কার করবে। জুলাইয়ের রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া দুদকের নিয়োগ ও স্বাধীনতার কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত প্রস্তাব দিয়েছে। মানুষ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে দেখতে চেয়েছে।
তারপরও যদি আমরা পুরোনো আইনেই নতুন নিয়োগ করি এবং সংস্কারকে ভবিষ্যতের কোনো অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে দিই, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতি কি বদলেছে? আর দুদকের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও সরাসরি, দুদক বদলেছে, নাকি শুধু দুদকের মানুষ বদলেছে?
আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, এই পুরোনো নিয়োগ কাঠামোর মধ্য দিয়েই বিএনপি সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। এবং এই সরকারের নিয়োগ দেওয়া দুদকই একদিন সরকারি এমপি-মন্ত্রীদের দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করবে। বিশ্বাস রাখতেই হবে। কারণ সরকার এখনো তো বলেনি—সংস্কার হবে না। তাই এখন আমাদের অপেক্ষা করার কথা একটাই, সংস্কারটা কবে হবে?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









