ছয় মাসে নতুন সরকারের হিসাব: জুলাইয়ের স্বপ্ন, সাফল্য ও পুরোনো রাজনীতির ছায়া
রাষ্ট্রের চরিত্র কি বদলাচ্ছে, নাকি শুধু ক্ষমতার মালিক বদলেছে?

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সরকারের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। তবে এই সরকারের ক্ষেত্রে সময়টা সাধারণ হিসাবের মধ্যে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ, দলীয়করণ, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের আন্দোলনে বিস্ফোরিত হয়েছিল।
তাই নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অন্য রকম। মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনেও পরিবর্তন চেয়েছিল।
প্রত্যাশা ছিল, চাঁদাবাজি কমবে, প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা গুরুত্ব পাবে, সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হবে না, আইনশৃঙ্খলা সবার জন্য সমান থাকবে, দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি আসবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট কমবে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হবে। ছয় মাস পর সেই প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়েছে?
উত্তর একেবারে নেতিবাচক নয়। সরকারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। আবার এমন কিছু বিষয়ও আছে, যেগুলো নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগ কমেনি। ফলে এই মুহূর্তে সরকারের ছয় মাসকে পুরোপুরি সাফল্য বা ব্যর্থতার খাতায় ফেলা কঠিন।
কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও আছে
সরকারের প্রথম ছয় মাসে কয়েকটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা গেছে। সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নাগরিক সেবায় নেওয়া কিছু কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগে অনেক কৃষক উপকৃত হয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের পাওনা পরিশোধের মতো কিছু পদক্ষেপও সরকারের অর্জনের তালিকায় রাখা যায়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন জেলায় খাল পুনঃখনন হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নতুন পরিবার যুক্ত হয়েছে। কৃষকদের সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের সুফল কতটা টেকসই হবে, সেটি অবশ্য সময়ই বলে দেবে। তবে শুরু হিসেবে এগুলোকে ইতিবাচক উদ্যোগ বলার সুযোগ আছে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণেও কিছু পরিবর্তনের বার্তা দেখা গেছে। সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়া, সরকারি ব্যয় কমানোর চেষ্টা, ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকা এবং প্রটোকল সীমিত রাখার উদ্যোগ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
তবে একটি সরকারের মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সংযম গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ কথা নয়। কারণ প্রধানমন্ত্রী কীভাবে জীবনযাপন করছেন, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আর সেখানেই সরকারের ছয় মাসের হিসাব কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র সংস্কার
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বড় শিক্ষা ছিল, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই হবে না, রাষ্ট্রের পরিচালন কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
আগের সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগের বড় অংশ ছিল প্রশাসনে দলীয়করণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহির ঘাটতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা।
ফলে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, এসব সমস্যার কাঠামোগত সমাধান হবে।
কিন্তু ছয় মাসে রাষ্ট্র সংস্কারের গতি এখনো মানুষের প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির ক্ষেত্রে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল।
সংস্কার মানে শুধু কমিটি করা কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন নয়। এর মূল বিষয় হলো, ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, রাষ্ট্র যেন একই নিয়মে চলে।
এই জায়গাটিই সরকারের জন্য এখন বড় পরীক্ষা।
দল বদলেছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা বদলেছে?
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ।
আগের সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অন্যতম অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা। ফলে নতুন সরকার যদি একই সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে চালু রাখে, তাহলে জুলাইয়ের পরিবর্তনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
একজন রাজনৈতিক কর্মী দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন—এটি তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততা।
দলের জন্য ত্যাগ রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দলীয় পুনর্বাসনের জায়গায় পরিণত হয়, তাহলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হয়তো বাড়বে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়বে না।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল আগের সুবিধাভোগীদের সরিয়ে নতুন সুবিধাভোগী তৈরি করা নয়। বরং সুবিধাভোগী তৈরির সংস্কৃতিই বন্ধ করা।
বিরোধী এমপিদের এলাকায় বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন
এই জায়গায় সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় তুলনামূলক কম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোথাও বরাদ্দ নেই—এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ কোনো এলাকার মানুষ যে দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে তাদের নাগরিক অধিকার নির্ধারিত হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। সরকারি উন্নয়ন কোনো সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। কোনো এলাকার মানুষকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল, সেতু বা পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রয়োজন নির্ধারিত হওয়া উচিত মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে। ভোটের ফলের ভিত্তিতে নয়।
সরকারদলীয় এমপির এলাকায় প্রয়োজন না থাকলেও প্রকল্প হবে, আর বিরোধী এমপির এলাকায় প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প হবে না—এমন ব্যবস্থা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যায় না। এখানে সরকারের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার হওয়া দরকার।
সরকার বিএনপির হতে পারে, কিন্তু সরকারি সম্পদ বাংলাদেশের।
রংপুর: রাজনৈতিক বক্তব্য বনাম রাষ্ট্রের দায়িত্ব
রংপুরের বিষয়টিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। একই সঙ্গে তাঁকে সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও আলোচনায় আনা হচ্ছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণ স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাবে।
রাষ্ট্রপতির পদ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা। তাই রংপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় একটি অঞ্চলের মানুষের প্রতি রাজনৈতিক আচরণও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।
রংপুর একসময় বিএনপির আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। তবে এখন সেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি বহুমাত্রিক। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৫টি, এনসিপি দুটি এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনের ফলই বলে দেয়, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পছন্দ একরৈখিক নয়। এ অবস্থায় কোনো এলাকার মানুষকে তাদের ভোটের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা রাজনৈতিকভাবে অদূরদর্শী এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও বেশি সমস্যার।
ফখরুল নিজেই অতীতে রংপুরের মানুষের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। আজ তাঁর দল ক্ষমতায়। ফলে পরীক্ষাটিও এখন কঠিন।
যে ভোটের অধিকারের জন্য বিএনপি আন্দোলন করেছে, সেই ভোটের ফল কি রাষ্ট্রীয় আচরণেও সমান মর্যাদা পাবে?
রংপুর বিএনপিকে ভোট দিয়েছে কি না, কোনো এলাকায় সরকারদলীয় প্রার্থী জিতেছে কি না—এসব রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু সরকারি উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার বণ্টনের ভিত্তি হতে পারে না।
একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শুধু দলীয় ভোটারদের নয়, পুরো প্রজাতন্ত্রের নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করা।
চাঁদাবাজি: সুশাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে চাঁদাবাজির বিষয়টি কঠোরভাবে দেখা দরকার। কারণ, চাঁদাবাজি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি সরাসরি সুশাসনের সূচক।
একজন দোকানদার যদি ব্যবসা চালাতে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কাউকে টাকা দিতে বাধ্য হন, একজন পরিবহন মালিক যদি পথে পথে টাকা দেন, একজন নির্মাণ ব্যবসায়ী যদি কাজ পেতে রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করেন কিংবা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিন নতুন নতুন ‘খরচের’ মুখোমুখি হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্রের আইন কোথায়?
জুলাইয়ের পর মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল এই সংস্কৃতির অবসান। কিন্তু ছয় মাস পরও চাঁদাবাজি, দখল, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
এখানে সরকারের কাজ শুধু একজন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা নয়। প্রশ্ন হলো, তার পেছনে কে আছে? কার রাজনৈতিক আশ্রয়ে সে কাজ করছে? প্রকাশ্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার একটি কাজ হয়। কিন্তু তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষককে নিষ্ক্রিয় করা না গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
আজ একজনের বিরুদ্ধে মামলা হলো, কাল অন্য একজন একই জায়গা দখল করল—তাহলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হলো না।
জুলাইয়ের অন্যতম শিক্ষা ছিল, ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ চলবে না। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা: ভয় কমেছে, কিন্তু পুরো স্বস্তি ফেরেনি
নতুন সরকারের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। মানুষের প্রত্যাশাও ছিল পরিষ্কার।
কিছু আলোচিত মামলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারও হয়েছে। এসব অবশ্যই ইতিবাচক।
তবে আইনশৃঙ্খলার সাফল্য শুধু কয়েকটি আলোচিত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে মাপা যায় না। মানুষ জানতে চায়, চাঁদাবাজি কি কমেছে? দখল কি বন্ধ হয়েছে? ছিনতাইয়ের ভয় কতটা কমেছে? রাজনৈতিক পরিচয় কি এখনো অপরাধীর ঢাল হিসেবে কাজ করছে? থানায় সাধারণ মানুষ কি প্রভাবশালী ব্যক্তির মতোই গুরুত্ব পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নগুলোর সবগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ সরকারের জন্য সতর্কসংকেত।
নতুন সরকারের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ মানুষ পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।
জ্বালানি সংকট: সরকারের সবচেয়ে বড় বাস্তব পরীক্ষা
ছয় মাসের অর্জনকে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে ফেলেছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন হয়েছে। বাসাবাড়িতেও ভোগান্তি বেড়েছে।
সরকারের সামনে অবশ্যই কিছু বাস্তব সংকট আছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং আগের সরকারের রেখে যাওয়া দুর্বল জ্বালানি ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে কঠিন করেছে।
এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে সরকারের সক্ষমতার প্রশ্নও থাকবে।
একটি দক্ষ সরকার শুধু সংকট মোকাবিলা করবে না, সংকটের আগাম পূর্বাভাসও দেবে। কারণ জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সংকট নয়। এর সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব এবং দ্রব্যমূল্য সরাসরি জড়িত।
গ্যাসের সংকট হলে কারখানা কম উৎপাদন করবে। উৎপাদন কমলে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বাজারেও পড়বে।
সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের তাৎক্ষণিক ভোগান্তি কমানোও জরুরি।
দ্রব্যমূল্য: মানুষের পকেটের হিসাব
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিছু পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।
অর্থনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত মানুষের বাজারের ঝুড়িতে ধরা পড়ে। সরকার যদি বলে মূল্যস্ফীতি কমছে, কিন্তু একজন শ্রমিক একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারেন, তাহলে তাঁর কাছে অর্থনীতির পরিসংখ্যানের চেয়ে বাজারের বাস্তবতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার চেষ্টা আছে, কিন্তু বিনিয়োগের গতি কোথায়? ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য বড় উত্তরাধিকার। সরকার আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু ব্যাংক সংস্কার করলেই হবে না। ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং নীতির স্থিরতা দরকার।
চাঁদাবাজির ভয় থাকলে ব্যবসায়ী বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকলে শিল্পপতি নতুন কারখানা করবেন না। আর নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে।
তাই অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ছয় মাসের চিত্র অনেকটা একই—সংস্কারের চেষ্টা আছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো আসেনি।
প্রশাসন: পুরোনো সুবিধাভোগী বদলে নতুন সুবিধাভোগী হলে লাভ কী?
প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা ছিল জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।
কিন্তু আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের সরিয়ে নতুন সরকারের দলীয় সুবিধাভোগীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে সেটিকে সংস্কার বলা কঠিন। সেটি হবে ক্ষমতার হাতবদল।
একটি পেশাদার প্রশাসনে কর্মকর্তা তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে পদ পাবেন না। তাঁর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের দক্ষতা হবে পদায়নের প্রধান ভিত্তি। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সরকার যত উন্নয়ন প্রকল্পই গ্রহণ করুক, জুলাইয়ের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
সুবিধাভোগীর বলয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে
প্রতিটি সরকারের চারপাশেই একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাদের কাজ অনেক সময় নেতৃত্বের কাছে বাস্তবতার চেয়ে সুবিধাজনক একটি ছবি তুলে ধরা। তারা বলে, সব ভালো চলছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সব সময় একই কথা বলে না।কৃষক কী বলছেন, ব্যবসায়ী কী বলছেন, শ্রমিকের আয় বাড়ছে কি না, তরুণেরা চাকরি পাচ্ছেন কি না, বাজারে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী, বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে কি না, থানায় সাধারণ মানুষ কেমন আচরণ পাচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর সরাসরি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছানো জরুরি।
শেখ হাসিনার সরকারের শেষ পর্যায় বাংলাদেশের জন্য এ বিষয়ে বড় শিক্ষা রেখে গেছে। নেতাকে জনপ্রিয় দেখানোর চেয়ে নেতাকে বাস্তবতা জানানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের চারপাশে এমন কোনো বলয় তৈরি হওয়া উচিত নয়, যারা শুধু প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাবে আর সমালোচনা আটকে দেবে।
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বও বড় পরীক্ষা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান, তাহলে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ও জাতীয় ভূমিকা পালন করা। রংপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে ফখরুল দীর্ঘদিন ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি হলে তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে, তিনি শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির পদে বসে যদি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হবে।
আর যদি দলীয় আনুগত্য রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে জুলাইয়ের পর যে নতুন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি আবারও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ছয় মাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: পরিবর্তন কতটা গভীর?
তারেক রহমান সরকারের ছয় মাসকে এক কথায় ব্যর্থ বলা যাবে না। কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, কিছু নাগরিক সেবা, ব্যয়সংযম এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণে ইতিবাচক কিছু দৃষ্টান্ত আছে।
আবার বড় কিছু সমস্যাও রয়ে গেছে। জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলায় পুরোপুরি স্বস্তি না আসা, চাঁদাবাজির অভিযোগ, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, রাষ্ট্র সংস্কারে ধীরগতি এবং সরকারি সম্পদ বণ্টনে দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ—এসব বিষয়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এর প্রত্যেকটির সঙ্গেই জুলাইয়ের প্রত্যাশার সম্পর্ক রয়েছে।
জুলাই দেখিয়েছে, রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জুলাই দেখিয়েছে, ক্ষমতার উৎস জনগণ। জুলাই দেখিয়েছে, প্রশাসন কোনো দলের কর্মীদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হতে পারে না।
জুলাই দেখিয়েছে, আইনের সামনে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হতে পারে না। আর জুলাই দেখিয়েছে, ভোটের অধিকার শুধু নির্বাচনের দিনের বিষয় নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করাও ভোটাধিকারের অংশ।
মানুষ আসলে কী চায়?
ছয় মাস পর সাধারণ মানুষের চাওয়াগুলো খুব জটিল নয়। তারা বাজারে স্বস্তি চায়। চাঁদাবাজমুক্ত ব্যবসা করতে চায়। নিরাপদ জনজীবন চায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস চায়।
কর্মসংস্থান চায়। মেধার ভিত্তিতে সরকারি নিয়োগ ও পদায়ন চায়।
বিরোধী মতের মানুষও সমান নাগরিক অধিকার পাক, সেটি চায়। তাদের এলাকার উন্নয়ন ভোটের রঙ দেখে নয়, প্রয়োজনের ভিত্তিতে হোক, সেটি চায়। সবশেষে তারা দেখতে চায়, জুলাইয়ের পর সত্যিই বাংলাদেশ বদলেছে কি না।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
সামনে আরও ছয় মাস
সরকারের সামনে তাই আগামী ছয় মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ছয় মাসে যে ভুল হয়েছে, সেগুলো অস্বীকার না করে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, এর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিরোধী এমপিদের এলাকা ও সরকারদলীয় এমপিদের এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দে কোনো বৈষম্য থাকলে তা দূর করতে হবে।
প্রশাসনকে দলীয় আনুগত্য থেকে বের করে পেশাদার করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরও স্পষ্ট করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর দলের চেয়ে রাষ্ট্রকে বড় করে দেখতে হবে। কারণ একটি নির্বাচিত সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে ওঠে, যখন সে শুধু নিজের ভোটারদের নয়, যারা তাকে ভোট দেয়নি তাদের অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করে।
ছয় মাসে সরকারের কিছু সাফল্য আছে। একই সঙ্গে জনগণের অপূর্ণ প্রত্যাশার তালিকাও ছোট নয়। এই হিসাবকে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
কারণ নতুন সরকারকে মানুষ আরেকটি পুরোনো সরকারের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখতে চায় না।
মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদল নয়, ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতির পরিবর্তনও চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি সরকারকে শুধু কতগুলো খাল পুনঃখনন হয়েছে, কতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে কিংবা কতটি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে—এসব দিয়ে বিচার করবে না। ইতিহাসের বড় প্রশ্ন হবে, জুলাইয়ের পর ক্ষমতায় এসে সরকার কি রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থ থেকে আলাদা করতে পেরেছিল?
চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও সুবিধাভোগীর রাজনীতি কি সত্যিই কমেছিল? বিরোধী মত ও ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ কি সমান নাগরিক মর্যাদা পেয়েছিল? ভোটের ফল কি সরকারি উন্নয়ন ও নাগরিক সেবায় কোনো প্রভাব ফেলেছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার বদলের সঙ্গে রাষ্ট্রের চরিত্রও কি বদলেছিল?
ছয় মাসের হিসাব বলছে, উত্তর এখনো পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়। তবে সরকারের হাতে সময় আছে। আগামী ছয় মাসে সেই উত্তর বদলে দেওয়ার সুযোগও আছে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব রূপ পাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









