যেই ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল হাসিনার

মাত্র দুটি ইংরেজি শব্দ—‘ব্রট ডেথ’। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা এই দুটি শব্দই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সরকারি নথিতে পরিণত হয়। চিকিৎসকের কাছে এটি ছিল একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই কাগজ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক দলিলগুলোর একটি।
ডেথ সার্টিফিকেটটি ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের। বিকেলে পুলিশের গুলিতে আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক লিখেছিলেন, ‘ব্রট ডেথ’—অর্থাৎ হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই দুটি শব্দ শুধু একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর তথ্যই বহন করেনি; বরং সেদিনের ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় নথিতে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করে দেয়। পরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করে, আবু সাঈদের মৃত্যুর সনদে একই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও, তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এই তিনটি বিষয়ই মিলিয়ে বদলে গিয়েছিল আন্দোলনের চরিত্র। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানে।
১৬ জুলাইয়ের আগে যে উত্তেজনা জমে উঠেছিল
২০২৪ সালের জুনের শুরু থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের প্রায় সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। 'বাংলা ব্লকেড' কর্মসূচি, সড়ক অবরোধ এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভের মধ্যেও আন্দোলন মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায় ১৫ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। আহত হন শত শত শিক্ষার্থী। সেই ঘটনার ছবি ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন, ১৬ জুলাই, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল সেই কর্মসূচির অন্যতম কেন্দ্র।
কয়েক সেকেন্ড, যা বদলে দিয়েছিল সবকিছু
১৬ জুলাই দুপুর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সামনে ছিল পুলিশ। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ ও শটগানের গুলির মধ্যে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করেন।
ঠিক তখনই সামনে এগিয়ে আসেন আবু সাঈদ।
মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি দুই হাত দুই পাশে প্রসারিত করে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। কয়েক সেকেন্ড পর কাছাকাছি দূরত্ব থেকে শটগান তাক করে গুলি ছোড়া হয়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্রাইসিস এভিডেন্স ল্যাব ভিডিও, স্থিরচিত্র ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ করে জানায়, অন্তত দুই পুলিশ সদস্য প্রায় ১৫ মিটার দূর থেকে তাঁর দিকে ১২ গেজ শটগান তাক করে গুলি করেছিলেন। সংস্থাটির মূল্যায়নে, ওই মুহূর্তে আবু সাঈদ পুলিশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক হুমকি ছিলেন না।
এই ভিডিওটি কয়েক মিনিটের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার আগেই দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। রাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ঘটনাটি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় জীবন
গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের সামনে পৌঁছানোর আগেই তাঁর জীবন থেমে যায়।
এরপরই আন্দোলনের ভাষা বদলে যেতে শুরু করে। ১৬ জুলাই বিকেলের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা আগের কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন ছিল।
এর আগে আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল কোটা সংস্কার। কিন্তু আবু সাঈদের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের মুখে উঠে আসে নতুন প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি নিরস্ত্র নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করতে পারে?
রংপুর থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, সিলেট, খুলনাসহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রতীকে পরিণত হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বলেছে, আবু সাঈদের হত্যার ভিডিও দ্রুত ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয় এবং তা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।
বিশ্বমাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন প্রতীক
১৬ জুলাই বিকেলে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। কিন্তু ঘটনার অভিঘাত শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করতে শুরু করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। কারণ, দেশের ভেতরে যে ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছিল, সেটি এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় চলে আসে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল দুটি বিষয়—আবু সাঈদের শেষ মুহূর্তের ভিডিও এবং তাঁর মৃত্যুর সরকারি প্রমাণপত্র।
বাংলাদেশে আন্দোলনের অনেক ছবি আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আবু সাঈদের ছবি ও ভিডিও যে মাত্রায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার নজির সাম্প্রতিক সময়ে খুব কম।
রয়টার্স প্রথম থেকেই ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। আন্তর্জাতিক এই সংবাদ সংস্থার ছবি ও ভিডিও বিশ্বের অসংখ্য সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থী মুহূর্তেই বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। বিবিসি বাংলা পরে তাদের বিশ্লেষণে লিখেছিল, আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। এর পর থেকেই আন্দোলন নতুন গতি পায়।
আল জাজিরা ধারাবাহিকভাবে ঘটনাটিকে অনুসরণ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশের গুলি চালানোর ভিডিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে আবু সাঈদের ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ভিডিওর পর আসে নথি
আধুনিক বিশ্বে একটি ভিডিও অনেক সময় জনমত তৈরি করে। কিন্তু একটি সরকারি নথি সেই জনমতকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়। আবু সাঈদের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল। ভিডিওতে মানুষ যা দেখেছিল, হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট যেন সেটিরই প্রশাসনিক স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ভিডিওটি মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, আর ডেথ সার্টিফিকেট সেই আবেগকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করিয়েছিল। রাষ্ট্রের একটি হাসপাতাল লিখে দিয়েছে—তিনি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন।
এই তথ্যটি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে পরিণত হয়। ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্রাইসিস এভিডেন্স ল্যাব ভিডিও, স্থিরচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, আবু সাঈদ পুলিশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো প্রাণঘাতী হুমকি ছিলেন না। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খুব কাছ থেকে তাঁর ওপর ১২ বোর শটগান ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বাংলাদেশে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলে। সংস্থাটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানায়।
এরপর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। পরবর্তী তদন্তে জুলাই-আগস্টে ব্যাপক প্রাণহানি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয় উঠে আসে।
দেশের ভেতরে আন্দোলন তখন প্রতিদিন বিস্তৃত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক চাপ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানায়। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিদিন নতুন নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে।
একসময় বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতেও পরিণত হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের জন্য এটি ছিল দ্বিমুখী চাপ। একদিকে রাজপথে আন্দোলন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাবমূর্তি সংকট।
কোটা আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান
১৬ জুলাইয়ের আগে আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল কোটা। ১৬ জুলাইয়ের পর কেন্দ্র হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জেলা শহরগুলোতে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন।
আবু সাঈদের ছবি মিছিলের ব্যানারে উঠে আসে। তাঁর নাম উচ্চারিত হতে থাকে সমাবেশে। অনেকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদের প্রতীক। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যু সেই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি।
যে রায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে
সরকার পরিবর্তনের পর আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। পরবর্তীতে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ঘটনাস্থলে গুলি চালানো দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
পরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। বর্তমানে মামলার কিছু অংশ আপিল পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামি এখনও পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছে আবু সাঈদের পরিবার।
প্রায় দুই বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনাল এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ৩০ জনের বিরুদ্ধে রায় দেন।
ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের বেঞ্চের নেতৃত্ব দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। রায়ে ঘটনাস্থলে গুলি চালানো সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম এবং পুলিশ কর্মকর্তা বিভূতিভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বাকি ২৫ জনকে তাঁদের ভূমিকার মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, প্রক্টর, কয়েকজন কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, আবু সাঈদ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ। তাঁর হত্যাকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের দমন করার পরিকল্পিত ধারাবাহিকতার অংশ।
বিচারক যা বলেছিলেন
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণের একটি অংশ দেশজুড়ে আলোচিত হয়। বিচারক বলেন, আবু সাঈদ বিশ্বাস করেছিলেন, যাঁরা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা মানুষ; তাই তাঁরা গুলি করবেন না। কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটেনি। ট্রাইব্যুনালের ভাষায়, সেই মুহূর্তটি শুধু একজন তরুণের মৃত্যুই নয়, রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতারও প্রতীক হয়ে আছে।
এই পর্যবেক্ষণ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম, আইনি বিশ্লেষণ এবং আলোচনায় উদ্ধৃত হয়।
রায় ঘোষণার প্রায় দুই মাস পর, ১৪ জুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। সেখানে তদন্তে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ, আলোকচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, চিকিৎসা নথি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, ঘটনাটি ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের বৃহত্তর ঘটনার অংশ। আদালত ভিডিও ফুটেজ, হাসপাতালের নথি এবং অন্যান্য আলামতকে পরস্পর-সমর্থনকারী প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
এখন মামলার অবস্থা কোথায়?
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মামলাটি নতুন আইনি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষও পূর্ণাঙ্গ রায় বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। রায় ঘোষণার সময়ই প্রধান প্রসিকিউটর বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সেটি পর্যালোচনা করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে দণ্ডপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ এখনও পলাতক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আদালতের রায়কে স্বাগত জানালেও আবু সাঈদের পরিবার বলছে, বিচার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সব দণ্ডপ্রাপ্তকে আইনের আওতায় এনে রায় কার্যকর করা হবে।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলেছেন, তাঁদের ছেলে আর ফিরে আসবে না। তবে তাঁরা চান, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কেউ যেন বিচার এড়িয়ে যেতে না পারে।









