কেন এই বৈপরীত্য? কোলকাতার রেড রোডে নামাজে না, যোগ ব্যায়ামে হ্যাঁ

ভারতের রাজপথে ধর্ম আর রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জায়গা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এবার ঈদুল আজহার নামাজে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আর আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখার ধরন পাশাপাশি রাখতেই প্রশ্নটা জোরালো হয়েছে—জনশৃঙ্খলার নামে রাষ্ট্র কি সবার জন্য সমান নিয়ম মানছে, নাকি অজান্তেই এক চোখা হয়ে পড়ছে।
২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার ট্রাফিক ব্যবস্থা আর জননিরাপত্তার কথা বলে রাস্তা বা খোলা জায়গায় ঈদের নামাজের ওপর কড়াকড়ি বসায়। ফলে কলকাতার ঐতিহ্য রেড রোডের বড় জামাত সরে যায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। বছরের পর বছর ধরে রেড রোডে লাখো মানুষের নামাজ পড়ার যে ছবি কলকাতার ঈদের চেহারা ঠিক করত, সেই ছবিটাই হঠাৎ বদলে যায়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল সহজ—রাস্তা আটকালে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে, জরুরি সেবা ব্যাহত হয়।
কিন্তু একই শহরে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এলে চিত্রটা বদলায়। প্রতি বছর ২১ জুনের আগেই কলকাতার রেড রোড, ধর্মতলা, পার্ক স্ট্রিটের মতো প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশের ব্যারিকেড, ডাইভারশন, নিরাপত্তার বেষ্টনী—সবই আগাম পরিকল্পনায় হয়। যোগ দিবস রাষ্ট্রের আয়োজন, তাই রাস্তা বন্ধ করাটা যেন নিয়মের মধ্যেই পড়ে। সরকারি ব্যাখ্যায় এটাও জনস্বার্থ।
এই দুই ছবি পাশাপাশি রাখতেই সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিরোধী রাজনীতিক এবং মুসলিম সংগঠনগুলোর একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—জনশৃঙ্খলার যুক্তি কি সব ধরনের জনসমাবেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি বাস্তবে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড কার্যকর হচ্ছে?
আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশ্লেষকদের মতে, জনভোগান্তির যুক্তি যদি শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় জমায়েতের বেলায় খাটে, তবে সেটা নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ হয় না। ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান, রাষ্ট্র সবাইকে সমান সুরক্ষা দিতে বাধ্য। ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক মানুষকে নিজ ধর্ম পালন, আচার ও প্রচারের স্বাধীনতা দিয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদ একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মকে মুছে দেওয়া নয়, বরং সব ধর্মকে সমান জায়গা দেওয়া।
নিখিল ভারত মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসিও এই যুক্তি তুলেছেন। তার প্রশ্ন—রাস্তায় নামাজ পড়লে যদি যানজট হয়, তবে রাস্তায় হওয়া যেকোনো বড় জমায়েতের জন্যও একই নিয়ম কেন খাটবে না। রাষ্ট্রের মদতে হওয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাবেশ বা ক্রীড়া আয়োজনের সময় রাস্তা বন্ধ হলে সেটা জনস্বার্থ হয়, আর একটি ধর্মীয় জামাতের সময় হলেই সেটা জনদুর্ভোগ—এই দ্বিচারিতা ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে দুর্বল করে।
বিতর্কটা শুধু দেশের সীমানায় আটকে নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা আর নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি, সংক্ষেপে আইসিসিপিআর-এর ১৮ নম্বর ধারা স্পষ্ট বলছে, প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা আছে। সেই স্বাধীনতার মধ্যে আছে একা বা দলবদ্ধভাবে, প্রকাশ্যে বা গোপনে ধর্ম পালনের অধিকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ধর্মীয় প্রার্থনার স্থানকে হঠাৎ সংকুচিত করা, সংখ্যালঘুদের দৃশ্যমানতাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দাবিয়ে রাখা—এগুলো ওই বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রশাসনেরও দায় আছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের কাজ। রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, বিকল্প রুট ঠিক করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবই প্রশাসনের এখতিয়ারে পড়ে। কিন্তু একটি বহুত্ববাদী সমাজে সেই এখতিয়ার প্রয়োগের সময় নিরপেক্ষতার পরীক্ষাটা সবচেয়ে কঠিন। যদি যোগ দিবসের জন্য মাসখানেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাস্তা বন্ধ করা যায়, তবে ঈদের জামাতের জন্যও আগে থেকে আলোচনা করে সমাধানে যাওয়া সম্ভব। বিকল্প ময়দান ঠিক করা, শাটল বাসের ব্যবস্থা, সময় ভাগ করে দেওয়া—এসব প্রশাসনিক উদ্ভাবন দিয়েই ভারসাম্য তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা পদ্ধতির। রাষ্ট্র যখন নিয়ম বানায়, তখন সেই নিয়ম সবার জন্য এক রকম হতে হবে। আজ রেড রোডের নামাজ যদি সরিয়ে দেওয়া হয় শৃঙ্খলার কথা বলে, কাল অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক জমায়েতের বেলায়ও যেন একই কড়াকড়ি থাকে। আবার উল্টোটাও সত্যি—যদি যোগ দিবসের মতো রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জন্য রাস্তা বন্ধ করাকে জনস্বার্থ বলা হয়, তবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি ধর্মীয় প্রার্থনার ঐতিহ্যকেও একই মর্যাদায় দেখতে হবে।
কলকাতার রাস্তা শুধু পিচ আর কংক্রিট নয়। এখানে মিছিল হয়, মেলা বসে, উৎসব হয়, প্রার্থনা হয়। এই শহরের চরিত্রই হলো নানা রঙের মানুষ একসঙ্গে হাঁটা। সেই হাঁটার ছন্দটা টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে—আইন নিরপেক্ষ না হলে শৃঙ্খলাও টেকে না, সমতাও বাঁচে না।







