সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্যের নীল প্যানেল। সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১৪টি পদের মধ্যে ১৩টিতেই জয় পেয়েছেন বিএনপিপন্থি প্রার্থীরা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত সবুজ প্যানেল থেকে কেবল একটি সদস্য পদে জয় এসেছে।

তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটার উপস্থিতির নিম্ন হার, বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী।

ফলাফল অনুযায়ী, সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন বিএনপিপন্থি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন একই প্যানেলের মোহাম্মদ আলী। এছাড়া দুই সহ-সভাপতি পদে জয় পেয়েছেন মো. মাগফুর রহমান শেখ ও মো. শাহজাহান। কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন মো. জিয়াউর রহমান। সহ-সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন মাকসুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল।

সাতটি সদস্য পদের মধ্যে ছয়টিতে জয় পেয়েছেন নীল প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা হলেন—এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, এ কে এম আজাদ হোসেন, মো. কবির হোসেন, মো. টিপু সুলতান, মো. জিয়া উদ্দিন মিয়া ও ওয়াহিদ আফরোজ চৌধুরী। সদস্য পদের বাকি একটিতে জয় পেয়েছেন জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেলের প্রার্থী মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির অডিটোরিয়ামে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট দেন আইনজীবীরা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৪ হাজার ৪৮ জন, যা মোট ভোটারের মাত্র ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২০২১ মেয়াদে ৭ হাজার ৭৮১ ভোটারের মধ্যে ৫ হাজার ৯৪০টি ভোট পড়েছিল। ২০২৩-২০২৪ মেয়াদে ভোটার সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৬০২ জন, তখন ভোট পড়ে ৪ হাজার ১৩৭টি। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়ালেও ভোট পড়েছে অর্ধেকেরও কম।

ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়ে নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “আগে পরিবেশটা ভিন্ন ছিল। এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। তবে এবার বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।”

তবে নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ৪০ জনের বেশি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল নিয়ে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আইনজীবী অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বাতিল হওয়া কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ বা উন্মুক্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘পেশাজীবী সংগঠনের গঠনতন্ত্রবিরোধী’ বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রার্থীদের স্ক্রুটিনি বা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব ছিল সমিতির বর্তমান সম্পাদকের ওপর। “কে বাদ পড়েছেন বা কেন বাদ পড়েছেন, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না,” বলেন তিনি।

বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, জুলাই আন্দোলনের ‘যোদ্ধা’ ও সাধারণ আইনজীবীদের দাবির প্রেক্ষিতে বিশেষ সাধারণ সভার (ইজিএম) মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সীমিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

এবারের নির্বাচন দুই দফায় তফসিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে গত ফেব্রুয়ারিতে ১১ ও ১২ মার্চ ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হলেও পরে বিশেষ সাধারণ সভায় তা পরিবর্তন করে ১৩ ও ১৪ মে নির্ধারণ করা হয়।