নয়াদিল্লি: ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক যে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছিল, তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে দুই দেশ। এর অংশ হিসেবে উভয় দেশই আবার নিয়মিতভাবে ভিসা কার্যক্রম চালুর দিকে এগোচ্ছে। ভারতীয় সূত্র দ্যপ্রিন্টকে জানিয়েছে, গত দুই বছরে বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনগুলো কখনো পুরোপুরি ভিসা দেওয়া বন্ধ করেনি। যদিও কিছু সময় সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছিল, তবে চিকিৎসা ও জরুরি ভিসা সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারত ভিসা দেওয়া অব্যাহত রাখবে বলেও জানানো হয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারতে বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম বড় উৎস ছিল বাংলাদেশ। তবে ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অনেক কমে যায়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার বাংলাদেশি ভারতে গেছেন। অথচ ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে যাত্রী সংখ্যা প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ভিসা ইস্যু হচ্ছিল। ২০২৪ সালে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ভিসা দেওয়া হতো। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে বাংলাদেশজুড়ে ভারতের ১১টি ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসি) চালু ছিল। তবে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে ২০২৫ সালে মাত্র পাঁচটি কেন্দ্র চালু ছিল। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় ৬৪ শতাংশ ভ্রমণ করেছেন অবকাশ যাপনের জন্য এবং ২৭ শতাংশ গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশিদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজম খাতেও প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, ভারতে থাকা বাংলাদেশের পাঁচটি মিশনও আবার ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া শুরু করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের সময় নয়াদিল্লি ও আগরতলার বাংলাদেশি ভিসা কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং আগরতলার সহকারী হাইকমিশন আবার কনস্যুলার সেবা চালু করে। এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এখন বাধাহীনভাবে ভিসা দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নয়াদিল্লি, কলকাতা ও আগরতলার বাংলাদেশি মিশনগুলো থেকে ভারতীয় নাগরিকদের প্রায় ১৭ হাজার ভিসা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ যাতায়াত সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ছাত্র আন্দোলনের পর বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলো ভাঙচুরের শিকার হয়। ঢাকায় ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশের মধ্যে ধারণা ছিল, শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিচ্ছে নয়াদিল্লি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারও ভারতের প্রতি কঠোর অবস্থান নেয়। ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফরের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে মন্তব্য করে ঢাকা, যা নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। তবে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নানা আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। পরে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার চৌধুরী ভারত সফর করেন। সেখানে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও নয়াদিল্লি সফর করেন। সফরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঢাকার পক্ষ থেকে এখন বার্তা দেওয়া হচ্ছে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করার পথেই এগোতে চায় বাংলাদেশ। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আবার ভিসা কার্যক্রম চালু করাও সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। নয়াদিল্লিতেও পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। ভারত সম্প্রতি বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মে মাসের শেষ দিকে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা চাপে পড়ায় গত দুই মাসে ভারত অতিরিক্ত ৪০ হাজার টন জ্বালানি বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা ইস্যু হয়তো খুব দ্রুত ২০২৪ সালের আগের পর্যায়ে ফিরবে না। তারপরও দুই দেশ ধাপে ধাপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য প্রিন্ট-এ ২ মে ২০২৬। এটি লিখেছেন কেশব পদ্মনাভন ।