এপ্রিলের শেষার্ধ বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য এক চরম অস্থিরতার বার্তা দিচ্ছে। একদিকে ‘অর্থকষ্টে’ থাকা সরকার জনগণের ওপর জ্বালানি তেল ও এলপিজির দামের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় সংসদে পরিস্থিতি অস্বীকার করছে। মাঠের সংকট যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে, তখন সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিরোধের এক নতুন সমীকরণ দৃশ্যমান হচ্ছে।
গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে কয়েকটি সংবাদকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা যায়।
সংরক্ষিত নারী আসন: অভিজ্ঞতা বনাম রাজনৈতিক ‘পুরস্কার’
বিএনপি ৩৬টি এবং জামায়াত জোট ১৩টি সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিএনপির তালিকায় সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা বা নিলুফার চৌধুরী মনির মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি নিপুণ রায় চৌধুরী বা ফাহমিদা হকের মতো আলোচিত নাম রয়েছে। অপরদিকে জামায়াত ১২টি আসনে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আর শরিকদের জন্য নিজেদের ৪টি আসন ছেড়ে দিয়েছে।
অপরদিকে বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় উঠে এসেছে অনেক নতুন মুখ। আফরোজা আব্বাস ও আসিফা আশরাফি পাপিয়ার মতো নেত্রী বাদ পরলেও প্রশংসিত হয়েছে সানজিদা ইসলাম তুলি ও ছাত্রদল নেত্রী মানসুরা আক্তারের মনোনয়ন। তবে সমালোচিত হয়েছে আওয়ামী লীগ নেত্রী সুবর্ণা ঠাকুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দা নাখলু আক্তারের মেয়ে নাদিয়া পাঠান পাপনের মনোয়ন।
ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘তৃতীয় মাত্রা’-র জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হকের মনোনয়ন পাওয়াটি রাজনৈতিক মহলে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার একটি কৌশল হতে পারে।
জামায়াত কর্তৃক জুলাই আন্দোলনের শহীদ জাবিরের মাকে মনোনয়ন দেওয়াটি একটি ‘আবেগীয় ও কৌশলগত’ মাস্টারস্ট্রোক দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এটি একদিকে দলের মানবিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, অন্যদিকে শহীদ পরিবারের পাশে থাকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে। এনসিপি ও জাগপাকে আসন ছেড়ে দেওয়া জোটবদ্ধ রাজনীতির সমঝোতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের ‘ধাক্কা’ ও সরকারের আর্থিক দেউলিয়াত্ব
ইরান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সরকার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এলপিজির দাম। আইএমএফের শর্ত পূরণ ও রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে সরকার মূলত সাধারণ মানুষের পকেটে হাত দিচ্ছে।
দেশ রূপান্তর ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, তেলের দাম বৃদ্ধি কেবল যাতায়াত নয়, বরং কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সেচ খরচ বাড়ায় বোরো উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বিকেএমইএ-র মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শিল্পমালিকরাও এখন ‘খাদের কিনারায়’।
সরকারের দাবি ‘তেলের সংকট নেই’, অথচ পাম্পে দীর্ঘ লাইন আর অঘোষিত লোডশেডিং প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র ভয়াবহ অর্থকষ্টে রয়েছে।
আইএমএফ-এর শর্ত ও ‘মধ্যবিত্ত’ সরকার
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ সংস্কারের অভাবে ঋণের কিস্তি আটকে দিয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যাংক থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সরকার তার ব্যয় নির্বাহ করছে।
সিপিডির ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সরকার এখন ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকিতে। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার আইএমএফকে তুষ্ট করতে চাইলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি অনেকটা ‘ছেঁড়া কাঁথায় তালি দেওয়ার’ মতো অবস্থা; একদিকের ফুটো ঢাকতে গিয়ে অন্যদিক বেরিয়ে পড়ছে।
সংসদে বিতর্ক: ‘সংকট বনাম পরিসংখ্যান’
জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিতর্কটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করছেন ‘কোনো সংকট নেই’, তখন বিরোধীদলীয় নেতার তীক্ষ্ণ খোঁচা, “সংকটটা সংসদের ভেতরে নেই, সংকটটা সংসদের বাইরে।”
বিশেষ করে হাইকোর্টের ভার্চুয়াল শুনানি আর পল্লী বিদ্যুতের ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিসংখ্যানকে মিথ্যে প্রমাণ করছে। সংসদের ভেতরে সরকারি দলের এই ‘ডিনায়াল মোড’ বা অস্বীকার করার প্রবণতা জনগণের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে সরকার আর্থিক ঘাটতি মেটাতে জনগণের ওপর ট্যাক্স ও দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে, সংরক্ষিত আসনে শহীদ পরিবারের সদস্য বা মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন দিয়ে সরকার তার নৈতিক ও প্রচারণামূলক অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। কিন্তু সত্য এটাই যে, সংখ্যাতাত্ত্বিক জয় বা সংসদীয় বিতর্ক দিয়ে সাধারণ মানুষের ‘খালি পেট’ এবং ‘অন্ধকার ঘর’কে বেশিক্ষণ শান্ত রাখা সম্ভব নয়।
প্রশাসনের ‘অর্থকষ্ট’ যদি আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে দ্রুত লাঘব না হয়, তবে এই মূল্যস্ফীতির জনরোষ সামাল দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তির পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব এবং বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক ছিল সোমবারের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সময়ে সরকার সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগের কথা বললেও বিরোধীদল জামায়াত রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।