ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী সুবর্ণা ঠাকুর। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। এদিকে আওয়ামী লীগের একজন ‘পোস্টেড’ নেত্রী হয়েও বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা দলটির তৃণমূল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত বিস্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সোমবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংরক্ষিত নারী আসনের ৩৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। তালিকার ২০ নম্বরে রয়েছে সুবর্ণা শিকদারের (ঠাকুর) নাম। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরপরই প্রশ্ন উঠতে থাকে একজন আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেত্রী কীভাবে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন?
স্থানীয় সূত্র বলছে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে সুবর্ণা ঠাকুরের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের পর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তার নাম ২৭ নম্বরে রয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জি এম সাহাবুদ্দিন আজম স্বাক্ষরিত ওই তালিকাই এখন নতুন করে আলোচনায়।
তবে নিজের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন সুবর্ণা ঠাকুর। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের কমিটিতে আমার স্বইচ্ছায় নাম ছিল না। অনুমতি ছাড়াই আমাকে পদ দেওয়া হয়েছিল। আমি কখনও আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম না।”
এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে তাকে। এসব ছবি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি সত্যিই কি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, নাকি এখন অবস্থান বদল করছেন?
গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের এক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সুবর্ণা ঠাকুর উপজেলা আওয়ামী লীগের পদে ছিলেন—এটা স্পষ্ট। এখন সেটি অস্বীকার করা ঠিক হচ্ছে না। নতুন সুবিধা পাওয়ার জন্য দলকে অস্বীকার করা হলে সেটি প্রতারণার সামিল।”
এদিকে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও এ মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে অন্য দল থেকে আসা কাউকে সরাসরি সংসদের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হলে তা হতাশা তৈরি করবেই।
কাশিয়ানী উপজেলার এক বিএনপি নেতা বলেন, “আমরা বছরের পর বছর মাঠে ছিলাম। মামলা-হামলা সহ্য করেছি। অথচ শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন এমন একজন, যিনি অন্য দলের পরিচয় নিয়েই পরিচিত ছিলেন—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।”
আরেকজন নেতা বলেন, “নতুন কেউ আসতে পারেন, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু অন্তত দলের ভেতরে কিছুটা সময় দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ তো থাকা উচিত ছিল।”
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি হয়তো সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে সুবর্ণা ঠাকুরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, সুবর্ণা ঠাকুর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি হরিচাঁদ ঠাকুর পরিবারের সদস্য এবং পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
বিএনপির ঘোষিত ৩৬ জনের তালিকায় আরও রয়েছেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেত্রী ও পরিচিত মুখরা। তবে সুবর্ণা ঠাকুরকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ইতোমধ্যে পুরো তালিকাকেই আলোচনার কেন্দ্রে এনে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং বিতর্ক কতদূর গড়ায়।
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তির পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব এবং বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক ছিল সোমবারের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সময়ে সরকার সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগের কথা বললেও বিরোধীদল জামায়াত রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।