বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. রওনক জাহান আওয়ামী লীগের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রথম কিছু দিনের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে সেই পুরোনো বন্দোবস্তেরই অনুসরণ চলছে। এটি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, বিএনপিও কি আগের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথে হাঁটছে কিনা? এভাবে চললে কত দিন তারা থাকতে পারবে, সবাই তা এখন ভাবছে। রাজনৈতিক খেসারতের জন্য হয়তো মানুষ এখন আর ১৭ বছর অপেক্ষা নাও করতে পারে–ইতোমধ্যে এটা বেশ চাউর করে দেওয়া হয়েছে।
‘অস্থিরতা থেকে অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশের উদীয়মান রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি’– শিরোনামের এক কর্মঅধিবেশনে গতকাল শনিবার এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন তিনি। গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং–সানেমের বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় কর্ম অধিবেশন পরিচালনায় এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এসব কথা বলেন। তিন দিনের এই সম্মেলন গত শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীর হোটেল ব্র্যাক ইনে শুরু হয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ডান্ডা মেরে স্থিতিশীলতা আনা যায় না। শেখ হাসিনাও তাঁর শাসনকালে সব দলকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলেছিলেন। তবে পরিস্থিতি যাই হোক মানুষের জীবন-জীবিকায় আঘাত না আসা পর্যন্ত এ দেশের জনগণ যে কোনো মূল্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। বারবার আশা ভঙ্গের পরও সেটি বারবার প্রমাণ করেছে জনতা। অবশ্য, যখন তাদের ধৈর্য সীমার বাইরে চলে যায় তখন তারা রাস্তায়ও নেমে আসে।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক একটি মৌলিক কাঠামোর প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবার আশা ছিল সরকার ও বিরোধী দলের জন্য একটা গঠনমূলক কাঠামো হবে; যা দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ওকালতির মতো কাজ করবে। তবে গত ৫৪ বছরে সে রকমটি দেখা যায়নি। জাতীয় মৌলিক এই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। বরং তারা পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করেছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী সমাজের রাজনীতিকরণ হয়েছে। এ রকম বাস্তবতায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আশা করা যায় না।
আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, নতুন বন্দোবস্তের মাধ্যমে আরেক ধরনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন শুরু হয়েছে। গত ৫৪ বছরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শাস্তি হয়নি। এজন্য জবাবদিহিতা নেই। এ কারণে মানুষ মনে করে যে কয়দিন জেলে রাখা হলো–এই কয়দিনই অন্তত শাস্তি হোক।
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন, স্বাধীন বিচার বিভাগসহ অনেক অধ্যাদেশ সরকার টিকিয়ে রাখেনি, যা হতাশাজনক। সরকার বলছে, এগুলো তারা পরে করবে, কবে কতদিনের মধ্যে করবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলছে না। গত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসসহ বিগত ৫৪ বছরে বিচার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে চলেছে সব সরকার। সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও এক সপ্তাহের মধ্যে মুক্তি–পুরো বিষয়টিই রহস্যঘেরা। তিনি ছাড় পেলেন অথচ অনেক রাজনীতিক বিনা অপরাধে জেলে রয়েছেন। জুলাই হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত তাদের সবাইকে চিহ্নিত করা হয়নি। অথচ এক দিন আওয়ামী লীগের মিছিলে গেছে–এমন অনেককে দায়ী করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার ও জুলাইযোদ্ধাদের উদ্যোগ নিতে হবে। এরকম কোনো উদ্যোগ নিলে হয়তো কিছুটা জবাবদিহিতা আসতে পারে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট–বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এম মির্জা এম হাসান বলেন, রাজনৈতিক খেসারতের সর্বশেষ উদহারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের অর্থ ছাড় পিছিয়ে দিয়েছে। তারা সুস্পষ্ট করে বলেছে, ব্যাংক রেজুলেশন আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ক্ষমতার কাছের মানুষের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর তীব্র সমালোচনা করেছে তারা।
অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর সংসদ প্রয়োজন। বিরোধী দলের রাস্তায় যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে–এটা সরকারকে বুঝতে হবে। আসলে এ ব্যাপারে সব পক্ষের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। মব সন্ত্রাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আসলে একটি সংগঠিত অপরাধ। তবে আইনের সঠিক ব্যবহার না হলে রাস্তায় এ ধরনের অপরাধ হয়ে থাকে। দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থীরা এই অধিবেশনসহ সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে অংশ নেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব। এরা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে।’
‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় স্বৈরাচারী কায়দায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, এ ধরনের গ্রেপ্তার মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুরগির দোকান, সবজির দোকান, চায়ের দোকান এমনকি মোড়ের রিকশাচালকদের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।