গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সাথে আস্থার সংকট, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কারের নামে দলীয়করণের পুরাতন সংস্কৃতি ফিরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষার সংস্কারের যে আশা জেগেছিল তা এখন বাস্তবতার কঠিন আঘাতে ম্রিয়মাণ।
গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা যায়।
আইএমএফের ‘না’, সংস্কারের ফানুস ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
আইএমএফ বাংলাদেশের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশ রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিল’-এ ১৮ক ধারা যুক্ত করে ঋণখেলাপি মালিকদের পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ করে দেওয়াকে আইএমএফ একটি বড় প্রতারণা হিসেবে দেখছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এই প্রতিবেদনটি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। সরকার মুখে সংস্কারের কথা বললেও তলে তলে ব্যাংক মালিকদের (যাঁদের বড় অংশই রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট) সুরক্ষা দিচ্ছে। আইএমএফের এই কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও আলোড়ন তৈরি করেছে। জ্বালানি সংকটের কঠিক মূহুর্তে আইএমএফের ‘না’ নতুন সরকারকে বড় শঙ্কায় ফেলেছে।
গরমে পুড়ছে গ্রাম, পকেট কাটার প্রস্তুতি শহরে
যুক্তরাষ্ট-ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বর্তমান জ্বালানি সংকটে দেশে লোডশেডিং ১৯০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে। ফলে শহরে কিছুটা প্রশান্তি থাকলেও গ্রামীণ মানুষ দিনে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। লোডশেডিংয়ের এই পরিস্থিতি সমাল দিতে না পারলেও বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যুদ্ধের দোহাই দেওয়া হলেও প্রকৃত উৎপাদন খরচ ১২.৩৬ টাকা বনাম বিক্রয়মূল্য ৭.০৪ টাকার ব্যবধানটি প্রশাসনিক অদক্ষতারই প্রমাণ বলে উল্লেক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত পূরণ করতে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর এই বোঝা চাপাচ্ছে। কিন্তু আইএমএফ যেখানে বড় বড় রাঘববোয়ালদের কর অব্যাহতি কমানোর কথা বলেছিল, সরকার সেখানে সহজ পথ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকের ওপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপাচ্ছে। এটি চরম ‘জনবিরোধী’ একটি পদক্ষেপ বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
৩. পুলিশে এসআই নিয়োগ কী দলীয় ক্যাডার তৈরির ছক?
পুলিশ প্রবিধান সংশোধন করে সরাসরি ৪০০০ এসআই নিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার। সংশোধিত পদ্ধতিতে প্রচলিত ৫০-৫০ কোটা (পদোন্নতি ও সরাসরি) বদলে সরাসরি নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে ‘আধুনিক পুলিশ বাহিনী’ গড়ার বয়ান তৈরি করলেও এর অন্তরালে থাকা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ৪০০০ তরুণকে পুলিশে ঢোকানো মানে হলো, মাঠ পর্যায়ে একটি অনুগত ‘বাহিনী’ গড়ে তোলা, যারা আগামী নির্বাচনে লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেড় লক্ষাধিক কনস্টেবল ও এএসআইয়ের পদোন্নতি আটকে দিয়ে এই নিয়োগ পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ও নৈতিকতা ধ্বংস করে দেবে। এটি মূলত প্রশাসনকে ‘ব্লু-প্রিন্ট’ অনুযায়ী সাজানোর একটি অংশ।
এর আগে ডিসিদের ফিটলিস্ট তৈরিতেও কোনো নিয়ম মানা হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত মন্ত্রী পলকের পিএসও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সরকার এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি গোপন ‘সমঝোতা’ কাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ‘ব্যুরোক্রেটিক ডাইনামিক্স’ একই রয়ে গেছে। যেখানে যোগ্যতা নয় বরং তদবির এবং গোপন সাক্ষাৎকারী হওয়াটাই মূল যোগ্যতা।
রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা
জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তার বাসার সামনে বিএনপির বিক্ষোভ এবং তার পিএসকে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্বস্তি কাজ করছে।
যে বিএনপি একসময় ‘বাক-স্বাধীনতা’র জন্য লড়াই করত, ক্ষমতায় আসার পর বা ক্ষমতার ছায়ায় এসে তারা সামান্য সমালোচনাকেও রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখার পুরনো চর্চায় ফিরে গেছে। পুলিশের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে, প্রশাসন এখন কেবল একটি দলের ইচ্ছাপূরণ করার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
গণমাধ্যমের সংবাদগুলোতে অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং প্রশাসনিক নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার বিষয়টি মোট দাড়ে উঠে এসেছে। আইএমএফের ঋণ স্থগিত হওয়া সত্ত্বেও সরকার বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার না করে বরং পুলিশের বড় নিয়োগ এবং ডিসি নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কবজায় নিতে ব্যস্ত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিজের ভর্তুকিহীন ভাবমূর্তি দাতা সংস্থার কাছে প্রমাণ করতে চায়, অথচ ব্যাংকিং খাতের লুটেরাদের সুবিধা দিতে ১৮ক ধারার মতো কালো আইন পাস করছে।
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তির পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব এবং বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক ছিল সোমবারের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সময়ে সরকার সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগের কথা বললেও বিরোধীদল জামায়াত রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।