মোহাম্মদ আবছার, মোহাম্মদ জয়নাল ও আব্দুল হান্নান। তিনটি নাম, তিনটি স্বপ্ন, তিনটি পরিবারের কষ্টের অবগাহন। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত উপজেলার শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার এই তরুণরা সাগরপারেই বড় হয়েছেন। তবে দুর্ভাগা তারা। দালালের প্রলোভনে পড়ে হারিয়ে গেছেন সাগরতলে। আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবরে তাদের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর দীর্ঘ অপেক্ষা।
শুধু এই তিনজনই নন, সীমান্তবর্তী সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ৩০ জনেরও বেশি যুবক এখনও নিখোঁজ। তারা সবাই দালালের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
গত ১১ এপ্রিল কোস্টগার্ড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় এক নারীসহ ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। এই খবরে আশার আলো জ্বললেও নিখোঁজের স্বজনরা এখনও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রিয়জনের খোঁজে সীমান্তজুড়ে চলছে তালাশ। গতকাল বুধবার দিনভর টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের পাঁচটি গ্রাম ঘুরে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গত ১ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে টেকনাফ উপকূল থেকে অন্তত তিনটি যাত্রীবাহী ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। এর মধ্যে একটি ট্রলার গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ডুবে গেলেও দুটি মঙ্গলবার থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। তবে ডুবে যাওয়া ট্রলারে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কিশোর।
টেকনাফ শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে নাফ নদের তীরে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া। সেখানেই অন্যের জমিতে ঝুপড়ি আর ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কোনোমতে দিন কাটছিল জহুরা খাতুনের। একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম ও পুত্রবধূ জান্নাত আরা ছিলেন ওই সংসারে। হঠাৎ বদলে যায় সবকিছু।
জহুরা খাতুন বলেন, গত ২ এপ্রিল দুপুরে ছেলে বলল ‘মা, ফোনটা রাখ, আমি এখন আসছি।’ সেই যে গেল, আর ফিরে আসেনি। এরপর সাগরে ট্রলারডুবির খবর শুনে দিন-রাত শুধু কেঁদেছি। আল্লাহর কাছে শুধু একটা কথাই বলেছি, আমার ছেলেটার খবর যেন একবার শুনতে পাই। অপেক্ষার সেই দীর্ঘ প্রহর শেষে অবশেষে ১৩ দিন পর থাইল্যান্ড থেকে একটি ফোনকল আসে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার দালালের ফোন থেকে ছেলে কল করে জানায়, সে থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। কিন্তু ফোনে সে খুব কাঁদছিল। শুধু বলছিল ‘টাকার ব্যবস্থা করেন, এখান থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নেন।’ পাশের ঘরগুলো থেকে কান্নার শব্দ শুনে বুক ফেটে যায়। আমার ছেলে অন্তত ফোন দিয়েছে; কিন্তু অনেকের তো সেই ভাগ্যও হয়নি। তারা এখনও জানে না, তাদের সন্তান কোথায় আছে!
শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার ইটের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই শোনা যায় কান্নার আওয়াজ। নিখোঁজ কিশোর আবদুল হান্নানের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে অপেক্ষা করছিলেন মা মাহামুদা বেগম। তিনি বলেন, আমার ছোট ছেলেটার কোনো খোঁজ নেই ১৬ দিন। চারদিকে শুধু শুনি সাগরে ট্রলারডুবির কথা। এই কথা শুনলেই বুকটা ফেটে যায়, চোখের পানি আর থামে না।
তিনি অভিযোগ করেন, ফুটবল খেলার মাঠ থেকে স্থানীয় দালাল মাহামুদুর রহমান মাম্মা আমার ছেলেকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, পাচারকারীদের হাতে তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে একটা ফোনে বলে ছেলেকে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে, এ জন্য লাখ টাকা দিতে হবে। এখন শুনছি, ট্রলারটা নাকি সাগরের মাঝপথে ডুবে গেছে। ছেলে বেঁচে আছে না মারা গেছে, কিছুই জানি না।
শাহপরীর দ্বীপের অনেকেই এখনও নিখোঁজ। তাদের মধ্যে রয়েছে– মো. উসমান, মো. হারুন রশিদ, মো. সাউদ, জিয়াউর রহমান, মো. আবছার, মো. ফরিদ, জয়নাল উদ্দীন, মো. কালাইয়া, মো. হোসেন, মো. হাসান, মো. আনিস, রেদোয়ান করিম, মো. ইউসুফ, নুরুল ইসলাম, শেফায়েত হোসাইন, আবদুল হান্নান জয়নাল।
দ্বীপের উত্তর পাড়ার ছেবন বাহার বলেন, আমার এক ঘরের দুই নাতনির এখনও খোঁজ পাইনি। সাগরে ট্রলারডুবিতে মৃত্যুর খবর পাচ্ছি। জানি না আমার নাতনিদের কী হয়েছে।
সাগরে ভাসমান কোস্টগার্ডের হাতে উদ্ধার হওয়া রাহেলা বলেন, মালয়েশিয়ায় বিয়ের কথা বলে আমার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে সাগরপথে ট্রলারে যাত্রা করি। সেখানে ২০ নারী ছিল। মাঝপথে ট্রলার ডুবে গেলে আমি তেলের ট্যাঙ্কি ধরে দুই দিন এক রাত সাগরে ভাসতে থাকি। পরে একটি জাহাজ আমাকে উদ্ধার করে। আমি অনেক মানুষের মৃত্যু দেখেছি, বাকিদের কী অবস্থা আমি জানি না।
এ ব্যাপারে টেকনাফের ইউএনও ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় যেসব নিখোঁজের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা আমরা যাচাই-বাছাই করছি। প্রতি গ্রাম থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জড়িত পাচারকারীদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে অন্তত ২৫০ নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছে। ট্রলারটি টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। ঘটনার পর জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জরুরি সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাগুলো বলছে, অতিরিক্ত যাত্রী, উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
তাদের মতে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, শিবিরে কঠিন জীবনযাপন এবং পাচারকারীদের প্রলোভন মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। এই সংকট সমাধানে দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এমন ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রায় আরও অনেক প্রাণ অকালে হারিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের এই দুই সংস্থা।
সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ভিন্ন এক অস্ত্র ব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছেন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছেন তাঁরা। আর এ প্রচারে সৌদি নেতৃত্বের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে তাঁদের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছেন কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ফাইল প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় রাশিয়াকে ধরে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে অনাগ্রহের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চোরাচালান প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করে ইরানের সঙ্গে গাবদ-রিমদান ও তাফতান সীমান্তপথে বাণিজ্য স্থগিত করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার একটি স্মারকলিপি জারি করেছে। এতে ৩ অক্টোবর জারি করা আগের একটি আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার শর্তে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে যে নির্বাচন, তার আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটাররা ইতিমধ্যে আগাম ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। এমন সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি রাশিয়ার দিকে কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকলেও তাতে জ্বালানির দাম কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নতুন মোড় তার রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।