২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশের রাজনীতি এক বিচিত্র বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মাঠপর্যায়ে সাংস্কৃতিক ও জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচির আড়ালে রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংস্কারের বিপরীতে পুরনো ও দুর্বল শাসনকাঠামো ফিরিয়ে আনার এক সুপ্ত প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। গত কয়েকদিনের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘জনআকাঙ্ক্ষা’ শব্দটি এখন কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অলংকার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে ছয়টি সংবাদকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা যায়। সংস্কারের অধ্যাদেশ বাতিল ও জামায়াতের অবস্থান সমকালের ‘সংস্কারের অধ্যাদেশগুলো বাদ দিয়ে জনআকাঙ্ক্ষাকে অপমান করা হচ্ছে’ শীর্ষক শিরোনামের প্রতিবেদনে, ফ্যাসিবাদ বিলোপের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংসদে বাতিল বা স্থগিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির এমপি ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেছেন, সরকার ‘যাচাই-বাছাই’-এর নাম করে মূলত সংস্কার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর দাবি, অধ্যাদেশগুলোতে ত্রুটি আছে। একে মিথ্যাচার হিসেবে অভিহিত করেছে জামায়াত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই প্রকাশ্য বিরোধ নির্দেশ করে যে, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার চেয়ে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন সরকারের অগ্রাধিকার। মানবাধিকার কমিশনের সংকট: ‘সুবিধাবাদী’ প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত? বিবিসি বাংলার ‘মানবাধিকার কমিশনে সংকট, কমিশনারদের খোলা চিঠি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের দুর্বল আইনে ফিরে যাওয়াকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। বিদায়ী কমিশনের সদস্যরা এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন, নতুন সরকার মানবাধিকার কমিশনকে পুনরায় শাসন বিভাগের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইছে। গুম ও খুনের তদন্ত করার যে ক্ষমতা অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যাদেশ দিয়েছিল, তা রহিত করার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়ার পুরনো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার। এটি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর আচরণ ও গণমাধ্যমের ‘স্তুতি’ বন্দনা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৭(৩) ধারা অনুযায়ী অধিবেশন চলাকালে পত্রিকা পড়া নিষিদ্ধ হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পত্রিকা পড়ার ছবি নিয়ে গণমাধ্যমে যে ‘প্রশংসার জোয়ার’ বইছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। ‘দ্য ইনসাইটা’-র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যেখানে সাধারণ সদস্যরা বিধি ভাঙলে স্পিকার সতর্ক করছেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আইন ভঙ্গকে ‘দায়িত্বশীলতা’ হিসেবে প্রচার করছে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো। এই ‘আজ্ঞাবহ সাংবাদিকতা’ ও গায়েবি ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’-এর বয়ান তৈরির প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গণমাধ্যম তার বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে পুনরায় তোষণমূলক নীতি গ্রহণ করছে। জামায়াতের বৈশাখী শোভাযাত্রা: রাজনৈতিক মোড়ক বদল একাধিক পত্রিকার প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে জামায়াতের বৈশাখী শোভাযাত্রার সংবাদ। দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ভাবমূর্তি কাটিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবার রাজপথে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে। ‘দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ’-এর ব্যানারে ঢোল, কুলা ও লাঙ্গল নিয়ে তাদের এই অংশগ্রহণ মূলত একটি কৌশলগত পরিবর্তন। জামায়াত এখন আর কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বরং ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও দেশীয় সংস্কৃতির’ মোড়কে নিজেদের রাজনীতিকে সর্বজনীন করার চেষ্টা করছে। যা তাদের ভবিষ্যতে বৃহত্তর ভোটার শ্রেণির কাছে পৌঁছানোর একটি অংশ হিসেবে দেখছেন আনেকে। প্রাথমিকভাবে এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, ভিন্নমত রয়েছে বিরোধী শিবিরের। বিশেষ করে ‘উগ্র অসাম্প্রদায়িক’ শ্রেণি এটিকেও ‘চাতুরতা’ ও ধর্মীয় টার্মে ‘মুনাফিকি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। কৃষি কার্ড ও তৃণমূলের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গতকালের অন্যতম আলোচিত খবর ছিল প্রধানমন্ত্রী কৃষিকার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন। তবে প্রথমদিনেই কার্ড পাওয়া ব্যক্তি ও মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এক বক্তব্যে বির্তকের সৃষ্টি হয়েছে। টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিটি ইতিবাচক মনে হলেও এর নেপথ্যের চিত্রটি প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথম কার্ডটি গ্রহণকারী মোহাম্মদ আলী একজন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। এটি স্পষ্ট করে যে, উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল বিতরণে দলীয় নেটওয়ার্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মাসে মাত্র ২০০ টাকার কিছু বেশি (বছরে আড়াই হাজার) আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা চলছে। নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে এই সামান্য অর্থ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, নাকি এটি কেবলই একটি ভোটার তুষ্টির প্রকল্প? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংস্কারের যে উচ্চাশা নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক কৌশলের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। সংসদের ভেতর আইন লঙ্ঘন করে প্রশংসা কুড়ানো আর সংসদের বাইরে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করা—এই দুটি বিষয় একই সুতোয় গাঁথা। সরকার যদি সত্যিকারে সংস্কারের সদিচ্ছা রাখে, তবে কেবল জনতুষ্টিমূলক ‘কৃষক কার্ড’ নয়, বরং মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।