রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৩ এপ্রিল ২০২৬ একটি ঘটনাবহুল দিন। এদিন ছিল বাংলা ১৪৩২ সালের শেষ দিন, চৈত্র সংক্রান্তি। এ দিনে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সংস্কারের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল, সেটি বাংলা ১৪৩২ সালের শেষের দিকে এসে এক জটিল বাঁক বদলের মুখোমুখি। একদিকে সরকারের উন্নয়নমূলক ও জনবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণের চেষ্টা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সামাজিক অসহিষ্ণুতা, রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারে অনীহা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা মিলিয়ে রাষ্ট্র এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের শেষ দিনের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে ৬টি সংবাদকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা যায়।
“মব সহিংসতা ও উগ্রতা”র চ্যালেঞ্জ
প্রথম আলো, বিডিনিউজসহ একাধিক সংবাদপত্র কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটিকে সবিস্তার তুলে ধরেছে। বিষয়টি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক চরম অবনতিকে নির্দেশ করে। কয়েক বছরের পুরোনো ভিডিওর সূত্র ধরে সুসংগঠিতভাবে চালানো এই হামলায় ১৯ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শনাক্তদের মধ্যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের কর্মীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে “নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের” কথা একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে ঘটনার দায় চাপানোর পুরনো কৌশল কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এ ধরনের ঘটনায় সরাসরি সরকারকে দায়ী করা হলেও বর্তমান রাজনৈতিক সরকারকে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।
মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের ’খোলাচিঠি’ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার প্রশ্নে বর্তমান সময়টি বেশ বিতর্কিত। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল হওয়ার পর কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এক খোলা চিঠিতে বিদায়ী সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, গুমের সাজা কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্তের আওতামুক্ত রাখার মাধ্যমে কমিশনকে পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০০৯ সালের ‘দুর্বল’আইনে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এই ঘটনা বর্তমান সরকারের সংস্কার বিরোধী মনোভাব ও পতিত সরকারের দমননীতির প্রতি প্রীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা জুলাইয়ে রক্ত দেওয়া জনগণের হতাশাকে বাড়াচ্ছে এবং প্রতারিত অনুভব করাচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে বিরোধীদলের দূর্বল প্রতিবাদকেও সমালোচনার চোখে দেখছেন অনেকে।
সংরক্ষিত নারী আসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব
দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি বহুল আলোচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আশার আলো দেখা গেলেও অন্য সব সংস্কারের মতোই এটিও হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। পুরাতন পরিবারতন্ত্রের ছায়া দেখা যাচ্ছে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে। যেখানে সংসদে নারী শুধুই শো-পিস। এ পরিস্থিতিতে সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোতে এখন তীব্র তোড়জোড়। বিএনপি জোটে রেকর্ড পরিমাণ মনোনয়ন ফরম বিক্রি হলেও আলোচনায় এসেছে ‘পরিবারতন্ত্র’বনাম ‘ত্যাগীদের মূল্যায়ন’বিতর্ক। শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়-স্বজন এবং শোবিজ অঙ্গনের তারকাদের অতি-তৎপরতা মাঠপর্যায়ের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেত্রীদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। জামায়াত জোটে প্রার্থী বাছাইয়ে চলছে দর কষাকষি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে দলগুলো যদি সাংগঠনিক যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়, তবে তা সংসদের গুণগত মান ও রাজনৈতিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত: কৃষক কার্ড ও বিতর্ক
অস্থিরতার মাঝেও ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইল থেকে উদ্বোধন হতে যাওয়া ‘কৃষক কার্ড’কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরা সরাসরি সরকারি সুবিধার আওতায় আসছেন। আড়াই হাজার টাকার এই বার্ষিক সহায়তা ও অন্যান্য কৃষি সুবিধা তৃণমূল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আর্থিক পরিমাণ নিয়ে সমালোচনায় মেতেছে নেটিজেনরা। মাসে ২০০ টাকার কিছু বেশি এই অর্থ কৃষকের ঠিক কি কাজে আসবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। যদিও সরকার বলছে, এই কর্মসূচিটি কেবল একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের কৃষিভোক্তা শ্রেণির একটি ডাটাবেজ তৈরির প্রথম ধাপ, যা ভবিষ্যতে স্মার্ট কৃষি নীতি প্রণয়নে সহায়ক হবে। এদিকের প্রধান খবরাখবর বিশ্লেষণে সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, সংস্কারের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। কৃষকদের জন্য আধুনিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজ থেকে ‘মব জাস্টিস’নির্মূল করা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিশ্রুতি যখন মাঠপর্যায়ে প্রতিফলিত হবে এবং সব দলমতের মানুষ যখন রাষ্ট্রের ওপর আস্থাশীল হতে পারবে, তখনই প্রকৃত সংস্কারের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বাংবার বসানো নিয়ে আলোচনা
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে তৈরি করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন বাসভবন। বাড়ির নকশায় থাকছে বহির্বিশ্বের প্রধানমন্ত্রীদের বাড়ির আধুনিক ডিজাইন। সব সেফটি ও সিকিউরিটি মেনে বাসভবনের মাটির নিচে থাকবে অত্যাধুনিক বাংকার এবং সুড়ঙ্গ বা টানেল, যা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে সুরক্ষা দেবে-এমনটাই পরিকল্পনা গণপূর্ত বিভাগের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নিজস্ব বাসভবন গুলশান-২ থেকেই দৈনন্দিন অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যমুনা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সেখানে ওঠার কথা ছিল নতুন প্রধানমন্ত্রীর। তবে এটাকে আপাতত প্রধানমন্ত্রী নিজের বাসভবন হিসেবে দেখছেন না, তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এ বাসভবন ব্যবহার করবেন। নতুন বাসভবনটি করা হবে এমন স্থানে, যেখান থেকে সরকারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, সংসদ ভবন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সুবিধাজনকভাবে করা যায়-এমন স্থানকেই বাসভবন নির্মাণের জন্য বেছে নিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য হেয়ার রোড, মিন্টো রোড অথবা বেইলী রোড-এ এলাকাগুলোতে জায়গা দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ের সঙ্গে নির্বিঘ্নে যোগাযোগে যেন অসুবিধা না হয়, সেটাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বাংকার বসানো নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আবার ভারতীয় ভিসা চালুর ইঙ্গিত
বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা ভিসার সঙ্গে ব্যবসায়িক ভিসাও চালু করতে ভারত সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে ভারতের ভিসা চালু হবে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে রুটিন বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমকে তিনি এসব তথ্য জানান। হুমায়ূন কবির বলেন, ‘মেডিকেল, বিজনেস ভিসা দ্রুত চালু করার কথা বলা হয়েছে ভারতের সঙ্গে। হয়তো আগামী সপ্তাহে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।’এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি হয় বাংলাদেশের। তারই অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা দেওয়া কিছুটা শিথিল করেছিল।
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তির পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব এবং বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক ছিল সোমবারের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সময়ে সরকার সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগের কথা বললেও বিরোধীদল জামায়াত রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।