একাত্তর এবং নব্বইয়ের মতো ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানও একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল—তবে সেই বিজয় এখন হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। তিনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে জনগণ আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
শুক্রবার রাজধানীর তোপখানা রোডে সংগঠনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সংস্কারের সাংবিধানিক বৈধতা: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কুপ্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো সাংবিধানিক প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প—যার লক্ষ্য বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে বদলে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কারের পথ রুদ্ধ করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এভাবে সংস্কার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে—এটা অস্বাভাবিক কিছু হবে না।”
জাতীয় সংসদের সরকারি দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অতীতে যেমন সংবিধানের অজুহাতে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল, এখনো একই ধরনের যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই রাজপথে নেমেছিল।
তিনি আরও বলেন, “এই গণ–অভ্যুত্থান সংবিধান সংশোধনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার আন্দোলন।” কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, কিছু রাজনৈতিক শক্তি ও গোষ্ঠী সেই চেতনা পাশ কাটিয়ে পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুনভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
হাসনাত কাইয়ূমের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের মালিকানা দাবি করলেও বাস্তবে তারা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগী। এতে করে জনগণের প্রত্যাশিত কাঠামোগত পরিবর্তন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, “’৭১, ’৯০–এর মতো ’২৪–এর বিজয়ও হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংসদ এখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে আইনি জটিলতার অজুহাতে পুরোনো ব্যবস্থাকে রক্ষার পাহারাদারে পরিণত হচ্ছে।” এসময় সংসদে উত্থাপিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, এসব প্রস্তাবকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো ‘হাসিঠাট্টা’ করা হচ্ছে, যা একটি গভীর রাজনৈতিক সংকেত বহন করে।
আলোচনা সভায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন বলেন, গণভোটে বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও সংশ্লিষ্ট মহল সংবিধান সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম। বক্তারা আরও বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের মূল চেতনা পুনরুদ্ধার এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করতে এখনই ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব। এরা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে।’
‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় স্বৈরাচারী কায়দায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, এ ধরনের গ্রেপ্তার মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুরগির দোকান, সবজির দোকান, চায়ের দোকান এমনকি মোড়ের রিকশাচালকদের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।