ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়াকে একসময় নিজের জন্য অসম্মানজনক মনে হলেও এখন সেটিকেই আল্লাহর রহমত হিসেবে দেখছেন দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তাঁর মতে, সংসদ সদস্য হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ায় আল্লাহ তাঁর সম্মান রক্ষা করেছেন।
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং মনোনয়নপ্রক্রিয়া ঘিরে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে এসব কথা বলেন বিএনপির সাবেক এই ছাত্রনেতা।
টকশোতে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা, কারাবাস ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার থেকে দূরে থেকে দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি অসম্মানিত বোধ করেছিলেন। তবে পরে সহকর্মী প্রার্থীর গুরুতর অসুস্থতার পরও নিজের মনোনয়নের জন্য তদবির না করার সিদ্ধান্তকে তিনি নৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
রিপনের ভাষায়, ‘আমার এমপি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা না হয়ে আল্লাহ আমার জন্য ভালো করেছেন, আমার ইজ্জত রক্ষা করেছেন।’
মনোনয়ন নিয়ে আক্ষেপ
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন শিল্পপতি মিজানুর রহমান সিনহা, দলটির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ এবং ড. আসাদুজ্জামান রিপন। প্রথমে মিজানুর রহমান সিনহাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে তাঁর গুরুতর অসুস্থতার পর আব্দুস সালাদ আজাদকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়।
মনোনয়ন না পাওয়ার কারণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে রিপন বলেন, বিষয়টি তাঁর জন্য সম্মানজনক ছিল না। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা যখন মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখে ছিলেন, তখন তিনি দলের হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে, প্রথমে মনোনয়ন পাওয়া মিজানুর রহমান সিনহা প্রায় ছয় বছর দল থেকে দূরে ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রিপন বলেন, ‘আমরা তো চাপ মোকাবিলা করেছি। জেলে গিয়েছি, মামলা খেয়েছি, বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিল না। এসব করেই তো আমরা দল করেছি।’
তবে মিজানুর রহমান সিনহার ব্যক্তিগত গুণাবলির প্রশংসাও করেন রিপন। তাঁর ভাষ্য, সিনহা এলাকার মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করতেন। তাঁর জানা মতে, তিনি চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু দীর্ঘ সময় দলের বাইরে থাকার পরও তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রিপন।
বিএনপির এই নেতা মনে করেন, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের সংগঠিত রেখেছেন, তাঁদের ত্যাগ ও অবদানও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল।
‘মনোনয়নের জন্য কারও কাছে চাইনি’
মিজানুর রহমান সিনহা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও কেন নিজের মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করেননি, সেই ব্যাখ্যাও দেন রিপন। তাঁর মতে, সহকর্মীর সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থাকে নিজের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা অনৈতিক।
রিপন বলেন, ‘উনি যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন, স্ট্রোক করলেন এবং চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গেলেন, তখন আমি কি বলতে পারতাম—উনি তো আর বাঁচবেন না, আমাকে মনোনয়নটা দেন? কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে এমন কথা বলা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ওই পরিস্থিতিতে তাঁর উচিত ছিল সহকর্মীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করা। একজন মুসলমান হিসেবে তিনি সেটিই করেছেন বলে জানান।
রিপনের ভাষ্য, ‘আমি আপনার অনুষ্ঠানের লাইভ প্রোগ্রামে বলছি, দলের কোনো নেতার কাছেই আমি মনোনয়ন চাইনি।’
তাঁর মতে, রাজনৈতিক পদ কিংবা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সাময়িক বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শ, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৫ আগস্টের আগে গ্রেপ্তার-গুমের আশঙ্কা
টকশোতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিনগুলোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন রিপন। তিনি জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ এবং সেখানে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল।
রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তালা খুলে নেতাকর্মীদের নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর সংবাদ সম্মেলন ও আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
তবে ওই সময় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত বলে আশঙ্কা করেছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা সরকার আবার শক্তিশালী হয়ে উঠলে তাঁকে গ্রেপ্তার, গুম কিংবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারত বলে তাঁর ধারণা ছিল।
নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন রিপন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে বিদেশে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। সে সময়ের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
দুঃসময়ে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব
বিএনপির রাজনৈতিক সংকটের সময় দলের হয়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন রিপন। তিনি জানান, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা গ্রেপ্তার হলে তাঁকে প্রায় ১৬ মাস দলীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের জন্য ঝুঁকি নেওয়া, ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দেওয়া এবং কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক পথচলার অংশ।
রিপনের বক্তব্যে মনোনয়ন না পাওয়ার আক্ষেপ স্পষ্ট হলেও সহকর্মীর অসুস্থতার সময় নিজের স্বার্থে তদবির না করার সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁর দৃঢ় অবস্থানও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, রাজনীতিতে সাফল্য শুধু পদ কিংবা জনপ্রতিনিধি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের নীতি, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত সম্মান ধরে রাখার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মীর সার্থকতা রয়েছে।







