কুমিল্লা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও নেতার গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঘটনার দুই দিনের মাথায় কুমিল্লা মহানগরী সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। একই সঙ্গে ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এখন থেকে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমকে।
জরুরি বৈঠকে কমিটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত
জামায়াতের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কুমিল্লা মহানগর কার্যালয়ে ১৪ অক্টোবরের ঘটনা এবং এর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বৈঠকে কুমিল্লার ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা শেষে মহানগরী সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ১৬ নং ধারার ৩ নং উপধারার চ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে ৬৩ নং ধারার ক্ষমতাবলে কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতের সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’
দলটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে মহানগর শাখার কার্যক্রম চলবে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি
গত ১৪ অক্টোবরের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কমিটির সদস্যরা হলেন দলের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান।
কমিটিকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় শুধু সংঘর্ষের তাৎক্ষণিক কারণ নয়, এর পেছনে কারা রয়েছেন এবং অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব পেয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে কেবল দলের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হিসেবে দেখার বিষয়টি যথেষ্ট নয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পেছনে কারা রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
আমির নির্বাচন নিয়ে বিরোধ
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে কুমিল্লা নগরীর মোগলটুলী এলাকার গাংচরে ফারুকী হাউসে অবস্থিত জামায়াতের মহানগর কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। কার্যালয়ের ছাদে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানগর জামায়াতের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে নেতাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। নতুন কমিটিতে আমির ও সেক্রেটারি পদে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বৈঠক চলাকালে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। বর্তমান সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান পরবর্তী আমির হতে পারেন, এমন আলোচনা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
তবে সংঘর্ষে কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
মহানগর আমিরের বক্তব্য
ঘটনার পর কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ এক বার্তায় তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত সভা চলার সময় কিছু যুবক সেখানে ঢুকে হৈচৈ করেন। পরে তাঁরা চলে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, পুলিশ ঘটনাটির কারণ হিসেবে মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচন নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের কথা জানিয়েছে।
ঘটনার কারণ ও দায় কার, তা নিয়ে দলীয় বক্তব্য, স্থানীয় সূত্রের তথ্য এবং তদন্তের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। এ কারণে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এবি পার্টির নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
কুমিল্লার ঘটনার সঙ্গে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) কুমিল্লা মহানগরের আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ সামদানীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে দলীয় পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে এবি পার্টি। তাঁকে কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথাও দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং ঘটনার পেছনে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আপাতত স্থানীয় সংগঠনটির নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে চলে গেল। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে।








