চলতি আমন মৌসুমে খুলনার কয়রা উপজেলায় সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় অধিকাংশ ডিলারের কাছে ইউরিয়া সার মিলছে না। সার কিনতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটছেন কৃষকেরা। অনেকে আশপাশের উপজেলা থেকে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের চাপে কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ রাখছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে আমনের ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।

চলতি আমন মৌসুমে উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক তৌহিদুল সানা ১০ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেছেন। প্রথম দফায় জমিতে প্রয়োগের জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল ১০০ কেজি ইউরিয়া সার। স্থানীয় ডিলারের কাছ থেকে ৪০ কেজি সার কেনার পর আর সার পাননি তিনি। গত শুক্রবার সার কিনতে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক ডিলারের কাছে গেলেও সেখান থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও সার না পেয়ে তৌহিদুল যোগাযোগ করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে। সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয়, চলতি মাসের জন্য উপজেলার সারের বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত সংকট কাটার সম্ভাবনা কম। শুধু তৌহিদুল নন, একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন উপজেলার অনেক কৃষক।

গতকাল শনিবার উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সারের সংকটের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষকেরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারছেন না বিক্রেতারা। কৃষকদের চাপ সামলাতে না পেরে অনেক খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে রাখছেন। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলারের কাছ থেকেই চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না তাঁরা।

হাতিয়ারডাঙ্গা বাজারের খুচরা বিক্রেতা আশিষ রায় বলেন, স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন তাঁর প্রায় ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। অথচ তিনি পাচ্ছেন মাত্র ২০ থেকে ২৫ বস্তা। ফলে সার না পেয়ে কৃষকেরা তাঁর দোকানে ভিড় করছেন এবং চাপ তৈরি হচ্ছে। এ কারণে মাঝেমধ্যে বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে তাঁকে।

ওই এলাকার কৃষক শাহ আলম বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে এলাকার দোকানে দোকানে ঘুরতেছি। কিন্তু কারও কাছে সার পাচ্ছি না। পরে পাশের উপজেলার একটি দোকান থেকে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতি হয়েছে।’

একই ধরনের সমস্যার কথা জানান মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়ানি এলাকার কৃষক নিরোদ মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘২০ বিঘা জমির সার জোগাড় করতি চোখে অন্ধকার দেখতি হচ্ছে। এলাকার কোনো দোকানে চাহিদামতো সার মিলছে না। উপায় না দেখে কয়েকজন মিলে একটি ট্রলার ভাড়া করে অন্য উপজেলা থেকে চড়া দামে সার আনতি হয়েছে। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতিছে না।’

দ্রুত সময়ের মধ্যে সারের সংকট নিরসনের দাবি জানান এই কৃষক।

বাগালি ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, এলাকায় সংকট থাকলেও আশপাশের কয়েকটি উপজেলা থেকে সার কেনা যাচ্ছে। তবে সেখানে দাম বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের কাছ থেকেও বেশি দাম নিতে হচ্ছে। তাঁর মতে, সংকট কাটাতে কয়রায় সারের বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে কয়রায় প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। সেপ্টেম্বরে উপজেলার সাতজন সার ডিলারের অনুকূলে ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৩০ টন। এ ছাড়া ডিএপি ৩৫০ টন, এমওপি ১১৫ টন এবং টিএসপি ৬ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দুই কিস্তিতে বরাদ্দ করা সার তুলে নিয়েছেন ডিলারেরা। তবে চাষের জমির পরিমাণ ও কৃষকদের চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ কম বলে স্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার তথ্যমতে, কয়রার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে আমাদি, বাগালি ও মহেশ্বরীপুরে সারের সংকট সবচেয়ে বেশি। এসব ইউনিয়নের ডিলারদের কাছে বর্তমানে সার মজুত নেই বললেই চলে। ফলে কৃষকেরা সার পাওয়ার আশায় ডিলারদের কাছে এসে ধরনা দিচ্ছেন। বাকি চার ইউনিয়নেও কমবেশি সারের সংকট রয়েছে।

উপজেলা সার পরিবেশক সমিতির সভাপতি আবুল হাসান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার আমন মৌসুমে সার বরাদ্দ বেশি হলেও সংকট তৈরি হয়েছে। গত বছর চাহিদা মেটাতে অন্য এলাকা থেকে সার কিনে ঘাটতি পূরণ করা হয়েছিল। এবার সে সুযোগ নেই। সরকারের কঠোর নজরদারির কারণে কালোবাজারি বন্ধ হওয়ায় ঘাটতি পূরণের বিকল্প পথও সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলোক কুমার ঘোষ বলেন, আমনের ভরা মৌসুমে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া গেলেও কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষকদের চাহিদা মেটাতে সারের বরাদ্দ বাড়ানো এবং বর্তমান ঘাটতি পূরণে উপবরাদ্দ দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।