জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলার আগে বিএনপিকে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকানোর আহ্বান জানিয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন একসঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন করেছে। বিএনপি জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকারও গঠন করেছে। এখন জামায়াতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে বিএনপির নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করা উচিত।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-নেতা জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু জামায়াতকে এসব নামে অভিহিত করার আগে নিজেদের রাজনৈতিক অতীতের দিকে তাকানো উচিত। জামায়াতকে ‘গুপ্ত’ বলার আগে বিএনপিকে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে হবে।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির অনেক নেতাকে রাজপথে পাওয়া যেত না। অনেকে মোবাইল ফোন পর্যন্ত বন্ধ রাখতেন। অথচ জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবির রাজপথে আন্দোলন করেছে এবং জীবন দিয়েছে। এখন ক্ষমতায় এসে জামায়াত-শিবিরকে ‘গুপ্ত’ বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক জোট ও আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল। খালেদা জিয়া যাদের সঙ্গে জোট করেছিলেন এবং যাদের সমর্থনে সরকার গঠন করেছিলেন, এখন তাঁদেরই ‘গুপ্ত’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলা হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য বিএনপির অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা রাখা শাহ আজিজুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাবা মির্জা রুহুল আমিনও রাজাকার ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁদের বিএনপিই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, এমপি ও মন্ত্রী বানিয়েছে বলে মন্তব্য করে জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী বলার আগে বিএনপিকে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকানোর আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও সরকারের বক্তব্যের মধ্যে এখন অনেক মিল দেখা যাচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের সহযোগী ছিল। ফলে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধেই উঠতে পারে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সখ্যতা নেই। বরং সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘তলে তলে যোগাযোগ ও সখ্যতা’ রয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ রাজপথে মিছিল করার সুযোগ পাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, পলাতক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে সরকার এগিয়ে এলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জামায়াতকে নিয়ে অপরাজনীতি করতে গিয়ে এরশাদের রাজনৈতিক পতন হয়েছে এবং আওয়ামী লীগকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। নতুন করে কেউ জামায়াতকে নিয়ে অপরাজনীতি করার চেষ্টা করলে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, জামায়াতকে নিয়ে অপপ্রচার না করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে মোকাবিলা করা উচিত। দেশের জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ও বর্তমান ভূমিকা বিবেচনা করেই তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ইয়াছিন আরাফাতসহ মহানগরীর নেতারা।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ শেষে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়, প্রেসক্লাব হয়ে মৎস্য ভবন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।