জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার ছোট ছেলে সাব্বির জামান। তার অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তার বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১৭ বছর ধরে যে ধরনের পরিস্থিতি চলে এসেছে, এখনো সেই একই কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয়ে এসে সাব্বির জামান বলেন, অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিপক্ষে আওয়াজ তোলায় সরকার আমাদের এভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করছে। এটা আমরা আগেও দেখেছি। গত ১৭ বছর একই প্রোগ্রামে চলেছে। এখনো আবার সেই একই প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘উনার ফেসবুকে গেলে উনার স্টেটমেন্টগুলো দেখতে পাবেন। আমাদের ফেসবুকে উনার স্টেটমেন্টগুলো দেখতে পাবেন। আমাদের ফেসবুকে উনার গতকালের লাইভগুলো আছে। আপনারা সেগুলো দেখে জাজ করেন। এখানে উনি কি অন্যায় করেছেন নাকি এটা কাম্য ছিল?’
এদিকে গ্রেপ্তারের আগে নিজের ফেসবুকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, তাকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম প্রিয় দেশবাসী। সবাই ভালো থাকবেন, সুখে থাকবেন। আমাকে এই মুহূর্তে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু আপনাদের সবাইকে জানিয়ে গেলাম। দোয়া করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যেন জনগণের জন্য দেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শহীদ হতে পারি। আল্লাহ যেন আমার এই দাবি কবুল করেন। আহ্বান কবুল করেন। জনগণের অধিকারের সংগ্রামে আমি আছি থাকবো আজীবন থাকবো। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন জনগণের পাশে থাকবো, জনগণের জন্য সংগ্রাম করব জনগণের জন্য এই জীবন ত্যাগ করব। সবাই ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম।’
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসা ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব হয়। ওই ফ্লাইটে ছিলেন আখতারুজ্জামান। ঢাকায় বিমানবন্দরে নেমে তিনি ওই ঘটনা নিয়ে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘বাজে’ আচরণ শুরু করেন। তিনি বিমানমন্ত্রীর নাম ধরেও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তার উচ্চবাচ্যের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব, ঘাড় ধরে বের করে দিব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মার খাইতে চান?’ তবে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিমানবন্দরের মতো এলাকায় দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন অশোভন আচরণ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এর পরই গতকাল শুক্রবার বিমানবন্দর থানায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজীব মামলা করেন। মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, হুমকি প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলির সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি করেন।
মামলার বিবরণ ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি দেখতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে আখতারুজ্জামান তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় ভিডিও ধারণে নিষেধ করায় নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতলের ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও মামলায় রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে তদন্তের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ, এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর বাসিন্দা। তিনি বিএনপির মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একসময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বিএনপি থেকে পঞ্চমবারের মতো বহিষ্কার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যুতে টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।