আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ ঝুঁকি ঠেকানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সংস্থাটির ক্রমবর্ধমান লোকসান কমাতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম আজ রোববার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হবে।
রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানানো হয়। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের দরের তুলনায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম কম। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপিসির লোকসান কমাতে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের দরে ডিজেল বিক্রি করলে বিপিসির প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। ফলে নতুন মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে একদিকে বিপিসির আর্থিক চাপ কমবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের ব্যবধানও কিছুটা কমবে।
পাঁচ মাসে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে বিপিসির আর্থিক চাপও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিপিসি জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানিতে সংস্থাটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখনো সেই পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও জনস্বার্থে সরকার এত দিন দেশে তেলের দাম বাড়ায়নি। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর প্রায় পাঁচ মাস দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।
পাচারের ঝুঁকি বিবেচনায় মূল্য সমন্বয়
জ্বালানি বিভাগের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেশের বাজারে কম দামে পাওয়া জ্বালানি সীমান্তপথে বাইরে পাচার হলে একদিকে দেশের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে আমদানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বাড়তে পারে।
এ কারণে নতুন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিপিসির লোকসানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের দামের ব্যবধান এবং পাচারের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিপিসির হিসাবে, ডিজেল আন্তর্জাতিক দরে বিক্রি করা হলে প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে এই লোকসানের একটি অংশ কমানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
এলএনজি আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এলএনজি আমদানিতেও পড়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এলএনজি আমদানিতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলে জ্বালানি খাতে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান বাড়ছে। এর সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ২০ টাকা করে এবং পেট্রল ও অকটেনের দাম ২০ টাকা করে বেড়েছে। আজ রোববার রাত ১২টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে।








