কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে কিশোর অপরাধ চক্রের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে। অপরাধের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। তাই শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের শিকড় খুঁজে বের করে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি সমাজে কিশোর অপরাধের বিস্তার, মাদক ও জুয়ার প্রভাব এবং তরুণদের সঠিক পথে রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কুমিল্লার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। দেশের মানুষ এতে মর্মাহত। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, সর্বশেষ হিসাবে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রথমে তিনজন এবং পরে আরও একজন গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানান তিনি। এ ঘটনায় আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলছে।
কিশোর অপরাধ চক্র নিয়ে উদ্বেগ
অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বয়স ও নিহত কিশোরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো। তাঁরা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। তাঁদের সঙ্গে নিহত অপ্রতিমের সম্পর্ক, ওঠাবসা ও বন্ধুত্ব ছিল। তাঁদের বয়স অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছর বেশি।
অপ্রতিমের হাতে থাকা মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় আরও কিছু আলামতও পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্তও দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে অপ্রতিমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
মাদক-জুয়ার সঙ্গে অপরাধের যোগসূত্র
অপরাধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাদক ও জুয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো অপরাধ কেন সংঘটিত হচ্ছে, তার পেছনে তাকালে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়।
এই সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয় বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মোটিভেশনাল কার্যক্রম বাড়াতে হবে। স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জোর দিতে হবে। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
‘সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে’
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা সমাজের বৃহত্তর সংকটেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে। এর বিভিন্ন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমাজের সব সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের আচরণ, বন্ধুত্ব, মাদক ও অপরাধপ্রবণতার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, খুঁজতে হবে অপরাধের কারণ
অপরাধ সংঘটনের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কেন অপরাধ ঘটছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলে সেটার বিচার হচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ঘটনার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। যেসব ঘটনা সময়সাপেক্ষ, সেগুলোর কার্যক্রম চলছে।
অপ্রতিম হত্যার তদন্ত প্রতিবেদনও দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার তদন্তের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন যাতে দ্রুত দেওয়া যায়, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২৪ ঘণ্টায় লাশ, ১২ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে গত শুক্রবার দুপুরে মায়ের আইফোন নিয়ে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে খুঁজতে শুরু করে।
নিখোঁজের প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পুলিশের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাঁকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু হলে ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তিনজন।
এ ঘটনায় দুই কিশোরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। পরে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও মোবাইল অ্যাকসেসরিজ ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে ছিল সে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে অপরাধের সামাজিক কারণ নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা। বিশেষ করে মাদক, জুয়া ও কিশোর অপরাধের যোগসূত্র চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।







