একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রয়োজনে পুরোনো জামায়াতে ইসলামী বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হয়েছিল। ক্ষমা চাওয়ার খসড়াও তৈরি হয়েছিল, দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। এমনকি ২০১৯ সালে নির্বাহী কমিটির বৈঠকে দল বিলুপ্ত করে নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই দলের ভেতরের মতবিরোধ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ কিংবা নেতৃত্বের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে উদ্যোগগুলো আর বাস্তবায়িত হয়নি।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তাঁর সদ্য প্রকাশিত 'বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস' বইয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন। বইটির ‘রিফর্ম অ্যাজেন্ডা উইদইন জামায়াত’ অধ্যায়ে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান, ক্ষমা চাওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে দল থেকে তাঁর পদত্যাগের কারণের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বইটি গত মাসে প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিলেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি দলীয় নেতাদের সামনে বিষয়টি তোলেন। একাধিকবার ক্ষমা চাওয়ার খসড়াও তৈরি হয়। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
গোলাম আযমের ‘দায়সারা’ ক্ষমা
বইয়ে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁকে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এর আগেই, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি লিখে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন রাজ্জাক।
১৯৯৪ সালের ২৪ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমের বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর বক্তব্য প্রস্তুতের জন্য একটি কমিটিও করা হয়েছিল। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই কমিটির সদস্য ছিলেন। সেখানে গোলাম আযমকে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
রাজ্জাক মনে করতেন, গোলাম আযম সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে ক্ষমা চাইলে সেটি আন্তরিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত এবং একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে চলমান সমালোচনার অবসান ঘটাতে ভূমিকা রাখতে পারত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গোলাম আযম নীতিগতভাবে প্রস্তাবেও সম্মত হয়েছিলেন।
কিন্তু সমাবেশে গোলাম আযম বলেন, ‘অতীতে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।’
রাজ্জাকের মূল্যায়ন, গণমাধ্যম মূলত বক্তব্যটি গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। তিনি এটিকে বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি প্রকৃত অর্থে ক্ষমা চাওয়া ছিল না; বরং গুরুতর একটি বিষয় মোকাবিলার অসংলগ্ন চেষ্টা ছিল।
খসড়া তৈরি, বৈঠকও হয়েছে
২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোটের নির্বাচনী বিজয়ের পর আবারও একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলার সুযোগ দেখেছিলেন রাজ্জাক। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দলের ভেতরে তৎপরতা শুরু করেন তিনি।
রাজ্জাক লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক আফতাব আহমেদ, এম মাহবুবউল্লাহ ও আবদুর রবের সহায়তায় একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করা হয়। কয়েক সপ্তাহের চেষ্টায় তৈরি ওই খসড়ায় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের ব্যাখ্যা এবং একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা ছিল। তবে একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন বর্বরতায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।
খসড়াটি নিয়ে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী। উপস্থিত ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এ টি এম আজহারুল ইসলাম। পরে মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, উপকমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করে। বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলন করে বিবৃতিটি প্রকাশের প্রাথমিক সিদ্ধান্তও হয়েছিল। মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টি নিষ্পত্তিতে আগ্রহী ছিলেন। আজহারুল ইসলামের আপত্তি থাকলেও এক বৈঠকে মুজাহিদ তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করলে তিনি আপত্তি থেকে সরে আসেন।
বিবৃতির প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করা হয়েছিল বলে লিখেছেন রাজ্জাক। তাঁর স্মরণে, সাতটির বেশি খসড়া তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একটি বিবৃতি নিয়ে ঐকমত্যও হয়। কিন্তু সেখানেই আবার উদ্যোগ আটকে যায়।
রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর মুজাহিদ তাঁকে জানান, তাঁর ধারণা হয়েছে দলের প্রবীণদের একজনের পরামর্শে নিজামী হয়তো ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে মত পরিবর্তন করেছেন। ওই প্রবীণ ব্যক্তির নাম মুজাহিদ তাঁকে বলেননি। রাজ্জাকও বিস্তারিত জানতে চাননি।
১৬ ডিসেম্বর চলে গেলেও বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়নি। পরে রাজ্জাক আশা করেছিলেন, ২০০২ সালের ২৬ মার্চের আগে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হবে। সেটিও হয়নি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, নিজামী মত পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করেননি। বরং বিষয়টি দলের ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলার কথা বলেন।
খসড়া তৈরির প্রায় চার বছর পর ২০০৫ সালের অক্টোবরে বিষয়টি ওয়ার্কিং কমিটিতে ওঠে। সেখানে রাজ্জাক যুক্তি দেন, কোনো দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির নেই। বাংলাদেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
কিন্তু তাঁর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রত্যাখ্যাত হয়। রাজ্জাক লিখেছেন, বিরোধিতা এতটাই প্রবল ছিল যে প্রস্তাবের সমর্থকেরাও ভীত হয়ে নীরব হয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করেন।
বিরোধিতাকারীদের কেউ বলেন, জামায়াত মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল, তাই তাদের অবস্থানে ভুল ছিল না। কারও যুক্তি ছিল, ভারতের আধিপত্যের আশঙ্কা থেকেই ওই অবস্থান নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী ইতিহাস তাঁদের অবস্থানের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। আবার কেউ বলেন, ক্ষমা চাইলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা তা গ্রহণ করবে না।
রাজ্জাকের বর্ণনায়, দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যের বক্তব্য তাঁকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল। সাবেক এক সংসদ সদস্য বলেন, জামায়াত ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হবে। দলের শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন প্রধান বলেন, বিষয়টি প্রতিবছর মার্চ ও ডিসেম্বরে আলোচনায় আসে এবং পরে আবার মিলিয়ে যায়। তাঁর মতে, এ নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।
পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হওয়ার আশঙ্কার বিষয়ে রাজ্জাক লিখেছেন, পরবর্তী ঘটনাবলি তাঁকে নিশ্চিত করেছে যে ওই মূল্যায়ন সঠিক ছিল না।
বারবার প্রশ্ন তুলেও সিদ্ধান্ত হয়নি
২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১০ সালের জুনে নিজামীসহ জামায়াতের নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার আগপর্যন্ত ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটিতে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বইয়ে উল্লেখ করেছেন রাজ্জাক।
এসব বৈঠকে তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না। তাঁর বক্তব্য ছিল, যদি ওই অবস্থানকে সঠিক মনে করা হয়, তাহলে দলকে তা প্রকাশ্যে বলতে হবে। আর যদি ভুল মনে করা হয়, তাহলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
রাজ্জাকের মতে, একাত্তরের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। আওয়ামী লীগের বড় বিজয়ের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাদের বিচারের বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর যুক্তি
বইয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে জামায়াতের মজলিশে শুরার সর্বশেষ উন্মুক্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালের জুলাইয়ে, মগবাজারের আল-ফালাহ ভবনে। সেখানেও রাজ্জাক একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে তরুণ সদস্যদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অধিবেশনে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম যুক্তি দেন, ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়েও যদি জামায়াতের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে এ নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
রাজ্জাক মনে করেন, গুরুতর একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয় মোকাবিলার জন্য এ ধরনের অবস্থান যথাযথ ছিল না।
নতুন নেতৃত্বেও থামেনি উদ্যোগ
২০১৬ সালে জামায়াতের কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। নতুন আমির নির্বাচিত হওয়ার পর একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য একটি কমিটিও করা হয়। দলের সেক্রেটারি জেনারেল রাজ্জাককে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে বলেন।
রাজ্জাক লিখেছেন, কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং জামায়াতের তৎকালীন বিদেশি আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের সহায়তায় তিনি সংক্ষিপ্ত একটি খসড়া তৈরি করেন। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্র ও দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়িত হয়নি, এমন বক্তব্য রাখা হয়। দল বা এর নেতা-কর্মীদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছিল।
২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর আমিরকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে উদ্যোগটির প্রশংসা করেন রাজ্জাক। কমিটির সদস্যদেরও চিঠির অনুলিপি দেন। কিন্তু সেবারও উদ্যোগটি আর সামনে এগোয়নি।
রাজ্জাকের মূল্যায়ন, যতবারই ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ততবারই জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করে উদ্যোগটি থামিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নতুন আমিরও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেননি। ফলে অতীতের মতো উদ্যোগটি আবারও থেমে যায়।
ভেঙে নতুন দল করার সিদ্ধান্ত
২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে রাজ্জাকের পরামর্শ চান। রাজ্জাক লিখেছেন, সে সময় তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে জামায়াতকে পরামর্শ দেওয়া আইনজীবীরা দলটিকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সুপারিশ করেছেন। একই সময়ে সরকার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছে বলেও খবর আসে।
২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে, এমন গুঞ্জনের মধ্যে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি জরুরি বৈঠকে বসে।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই বৈঠকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত হয়, জামায়াত একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করবে, নিজেদের বিলুপ্ত করবে এবং পরে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবে।
এরপর সেক্রেটারি জেনারেল তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার খসড়া এবং দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেন। ক্ষমা চাওয়ার খসড়া আগে থেকেই থাকায় আইনজীবী দলের সহায়তায় দ্রুত দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরি করেন রাজ্জাক।
এরপর শুরা সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ৩০০ সদস্যের নিয়মিত অধিবেশন করা সম্ভব হয়নি। তাই ছোট ছোট দলে বৈঠক করে প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্যের মতামত সংগ্রহ করা হয়।
রাজ্জাক লিখেছেন, পরে তাঁকে জানানো হয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দল বিলুপ্তির পক্ষে মত দিয়েছেন। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে মত দেন।
কিন্তু ২১ জানুয়ারি জামায়াত নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবিত বিল মন্ত্রিসভায় ওঠেনি। এরপর নির্বাহী কমিটি আবার বৈঠকে বসে। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার আগের সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়, জামায়াত ক্ষমা চাইবে না এবং দলও বিলুপ্ত করা হবে না।
এই সিদ্ধান্তের পরই রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠান।
‘একাত্তরের ভূমিকা এখনো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা’
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার নিয়েও বইয়ে মূল্যায়ন করেছেন রাজ্জাক। তাঁর মতে, শফিকুর রহমান শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তবে অর্ধশতাব্দীর বেশি আগে জামায়াতের পূর্বসূরি নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে বর্তমান নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নীতি না থাকায় তাঁর উত্তরগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি বলে লিখেছেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাকের ভাষায়, ‘জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা এখনো তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।’
তিনি লিখেছেন, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই দশকে একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের জন্য অর্ধডজনের বেশি বিবৃতি তৈরিতে সহায়তা করেছেন। কিন্তু সেগুলোর একটিও প্রকাশ করা হয়নি।
বইয়ের এসব বর্ণনায় জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্ক, ক্ষমা চাওয়ার একাধিক উদ্যোগ এবং দলীয় অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টার একটি ধারাবাহিক চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দেখা যায়, উদ্যোগগুলো কোনো পর্যায়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে দল সরে এসেছে।








