ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে ছাত্রদলের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তাঁর দাবি, জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে ছাত্রদল ‘পক্ষান্তরে জিন্নাহর পক্ষে’ অবস্থান নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাঁকে দায়মুক্তি দিতে চায়। একই সঙ্গে সংগ্রহশালায় রাখা জিন্নাহর ছবি ভেঙে ফেলা সাবেক শিক্ষার্থীকেও জিন্নাহর পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।

সোমবার বিকেলে ডাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন এস এম ফরহাদ।

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখা প্রসঙ্গে ফরহাদ বলেন, সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে ছবিটিতে জিন্নাহকে সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সংগ্রহশালায় ছবির ক্যাপশনেও জিন্নাহর উর্দুর পক্ষে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ছাত্রদলের বিবৃতির প্রসঙ্গ টেনে ডাকসু জিএস বলেন, ‘সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে সংগ্রহশালার ছবিতে জিন্নাহকে সেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ছাত্রদল তাদের বিবৃতির মাধ্যমে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ছাত্রদল এখানে পক্ষান্তরে জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা চায় জিন্নাহকে দায়মুক্তি দিতে এবং তারা চায় ছবিটা এখান থেকে সরিয়ে নিতে। এমনকি তারা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামও দিয়েছে। এর মধ্যে এটা না সরালে তারা ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে।’

এর আগে সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখা জিন্নাহর ছবিটি ভেঙে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে তিনি ১০ ভোট পেয়েছিলেন।

আবু তৈয়ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছবি ভাঙার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্র জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে এবং বাংলা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আবু তৈয়ব বলেন, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল পালন করা হয়েছিল এবং ওই আন্দোলনে অনেক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানের কারণে জিন্নাহর ছবি ডাকসুতে থাকা উচিত নয়।

ছবি ভাঙার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডাকসু জিএস বলেন, ‘যিনি জিন্নাহর ছবি ভেঙেছেন, শুনলাম তিনি উর্দু বিভাগের। আমি অবাক হলাম। সম্ভবত তিনি উর্দু বিভাগেরই, সে কারণে জিন্নাহর প্রতি আলাদা একটা দরদ আছে। আর এ কারণেই এটা হয়েছে।’

ফরহাদের দাবি, ছবির ক্যাপশনে জিন্নাহর উর্দুর পক্ষে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু ছবির ক্যাপশনে উল্লেখ করেছি, তিনি উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যিনি ছবিটি ভেঙেছেন, তিনি হয়তো চান না উর্দুর ব্যাপারে জিন্নাহর সেই অবস্থান মানুষ জানুক। সে কারণেই তিনি এটা ভেঙেছেন।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে ছবিটি ভাঙার ঘটনাকেও জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন ডাকসু জিএস। তাঁর ভাষায়, ‘অর্থাৎ, তিনিও জিন্নাহর পক্ষ নিয়েছেন।’

এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও আপত্তি রয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

একই বিজ্ঞপ্তিতে ডাকসুর আরও কয়েকটি কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে অনুমোদন ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট চালু করা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডার, ১৯৭৩-এর ২৪(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তির তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। আর ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্স অ্যান্ড রেগুলেশনসের চতুর্দশ অধ্যায়ের ৪ নম্বর ধারার নোট অনুযায়ী, ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে নেবে।

প্রশাসনের দাবি, ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে, সেটি সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমতি কিংবা আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছে। ফলে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনি কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না। ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত। অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে পৃথক কোনো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্পষ্ট করে বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পরিচালিত হতে হবে। প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না জানিয়ে প্রশাসন বলেছে, অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।