ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন ডাকসু নির্বাচনের আলোচিত ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে ছবিটির ফ্রেম ভেঙে তা ছিঁড়ে ফেলেন তিনি। একই দিনে ডাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আপত্তির কথা জানিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামো লঙ্ঘন করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবু তৈয়ব হাবিলদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে তিনি আলোচিত ও বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। নির্বাচনে সহসভাপতি পদে তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০ ভোট।

জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার আগে তৈয়ব হাবিলদার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্র জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে এবং বাংলা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তৈয়ব বলেন, ‘আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, জিন্নাহ সাহেব, আপনার এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না।’

ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মূল নায়ক হিসেবে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে হরতাল পালন করা হয়েছিল। ওই আন্দোলনে অনেক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তৈয়ব হাবিলদারের ভাষ্য, ‘সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।’

এদিকে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন এবং ডাকসুর সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে। সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডাকসু-সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণ ও সংরক্ষণে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ওই ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়।

তবে ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ ডাকসু স্থাপন করেছে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কিংবা উপাচার্যের অনুমতি বা আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রশাসন।

বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডার, ১৯৭৩-এর ২৪(এ) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তির তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্স অ্যান্ড রেগুলেশনসের চতুর্দশ অধ্যায়ের ৪ নম্বর ধারার নোট অনুযায়ী, ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এসব বিধান অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে করা হয়েছে বলে প্রশাসন মনে করছে।

জিন্নাহ ও মালেকের ছবি নিয়েও আপত্তি

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।

তবে প্রশাসনের এই অবস্থানের মধ্যেই সোমবার ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবি ভেঙে ও ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। ফলে সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তির পাশাপাশি ডাকসুর ভেতরে এ নিয়ে সরাসরি বিরোধও প্রকাশ্যে এলো।

অনুমোদনহীন শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়েও আপত্তি

ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালু করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না।

প্রশাসনের অভিযোগ, ওই ওয়েবসাইট চালু করার মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্যও বাইরে আনা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। বর্তমানে সেটি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। ফলে অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে ডাকসুর পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ।

প্রশাসনের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার শামিল। ডাকসুর এমন কর্মকাণ্ডকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বৈত প্রশাসনের সুযোগ নেই

ডাকসুর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবচেয়ে জোরালোভাবে যে বিষয়টি তুলে ধরেছে, তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের ‘দ্বৈত প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় তারা কোনো ধরনের আপস করবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফলে একদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তি এবং অন্যদিকে সেই ছবি নিজ হাতে ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর মতো ডাকসুর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে ছাত্র সংসদের ক্ষমতার সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ার নিয়ে বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।