জনাব প্রতিমন্ত্রী, জ্বালাটা আসলে গণমাধ্যমের

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুসজ্জিত কক্ষটির পরিবেশ অন্য আট-দশটি কর্মদিবসের মতোই স্বাভাবিক থাকতে পারত। নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সাংবাদিকরা রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির কাছে একটি অতি সাধারণ, কিন্তু সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে গিয়েছিলেন। প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল না, রাজনৈতিক কটাক্ষও ছিল না। প্রশ্নটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি ও সাংবিধানিক নৈতিকতা সম্পর্কিত। প্রশ্নটি ছিল—নতুন নিয়োগ পাওয়া টেকনোক্র্যাট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন?
উত্তরটি অত্যন্ত সহজ ও সরল হতে পারত। উত্তর হতে পারত মাত্র একটি শব্দে—হ্যাঁ অথবা না। অথবা তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। চাইলে সংশ্লিষ্ট নথি দেখিয়ে এক মুহূর্তেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারতেন। কিন্তু সেখানে যা ঘটল, তা শুধু একটি সংবাদ সম্মেলনের শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি; বরং নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি, স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রতিমন্ত্রীর মুখ থেকে ঝরে পড়ল তীব্র বিদ্রূপ, তাচ্ছিল্য ও উষ্মা। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে? কার এত জ্বালা?
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া কঠিন ছিল না; কিন্তু উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নকারীকে পাল্টা আক্রমণ করা হলো। এখানেই মূল সমস্যাটি। সাংবাদিকের প্রশ্ন পছন্দ না-ও হতে পারে। প্রশ্নটি অন্যায্য মনে হতে পারে। প্রশ্নের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মন্ত্রীর হাতে এর জবাব দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো তথ্য, যুক্তি ও নথি। বিদ্রূপ নয়, তাচ্ছিল্য নয়, প্রশ্নকারীকে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া নয়। বিশেষ করে একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে তো আরও বেশি সংযম ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার প্রত্যাশিত।
প্রতিমন্ত্রী পরে নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্নটি ছিল তিনি বাংলাদেশি কি না, তা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি ছিল তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নিয়ে। ‘আমি বাংলাদেশি’—এটি একজন মানুষের জাতীয় পরিচয় বা আত্মপরিচয়ের বক্তব্য হতে পারে; কিন্তু ‘আমি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি’—এটি একটি আইনি অবস্থান, যার প্রমাণ নথিতে থাকতে হয়। এই দুই বিষয়কে এক করে ফেলা যায় না। কেউ বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেন, নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন এবং দেশের জন্য কাজও করতে পারেন; কিন্তু রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক পদে বসার ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা নির্ধারিত হবে সংবিধান ও আইনের বিধান অনুযায়ী। সেখানে আবেগের চেয়ে নথিই বড়।
কারও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তাঁর সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক বিষয় নয়। সাংবাদিকরা যদি একজন মন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করছেন। বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির আইনি যোগ্যতা সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতেই এই প্রশ্ন। এই পার্থক্যটি একজন মন্ত্রীর বোঝার কথা, বিশেষ করে তিনি যখন দীর্ঘদিন একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনীতি ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির মুখ থেকে ‘কার এত জ্বালা’—এ ধরনের শব্দচয়ন তাই কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য নয়। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকরা একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে বিনয়, পেশাদারত্ব, সংযম এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করেন। সাংবাদিকের প্রশ্নকে অপছন্দ হলে তিনি বলতে পারতেন, ‘বিষয়টি আইনগতভাবে পরিষ্কার, প্রয়োজনীয় নথি সরকারের কাছে রয়েছে।’ অথবা বলতে পারতেন, ‘আমি এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেব।’ কিন্তু প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সাংবাদিকের উদ্দেশ্য নিয়ে কটাক্ষ করা কোনোভাবেই একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির কাঙ্ক্ষিত আচরণ হতে পারে না।
শুধু তা-ই নয়, তিনি ২০০৮ সালের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদ ও মইনউদ্দীন আহমদের সরকারের সময়ের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০০৮ সাল কিংবা ওয়ান-ইলেভেনের সেই বিষাদময় ইতিহাসের সঙ্গে ২০২৬ সালের একজন টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের সাংবিধানিক প্রশ্নের সম্পর্ক কোথায়? কোনো সাংবাদিক যদি নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করেন, তার উত্তর ২০০৮ সালের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুঁজতে হবে কেন? প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে বরং সরাসরি বলা যেত—‘আমি এ বিষয়ে নথিপত্র পরে দেব।’ তাহলেই আলোচনা সেখানেই শেষ হয়ে যেত।
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার তোষামোদ নয়। সাংবাদিকতা হলো প্রশ্ন করার শিল্প এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ক্ষমতা সব সময় নিজেকে কোনো না কোনো আড়ালে ঢেকে রাখতে চায়। সাংবাদিকের কাজ সেই আড়াল সরিয়ে তথ্য ও সত্যকে জনগণের সামনে হাজির করা। রাষ্ট্র বা ক্ষমতার উচ্চাসনে যিনিই বসুন না কেন, জনগণের কাছে জবাবদিহি করা তাঁর সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক যখন কোনো মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, তখন সেই প্রশ্ন শুধু ওই নির্দিষ্ট সাংবাদিকের ব্যক্তিগত প্রশ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে দেশের কোটি কোটি নাগরিকের পক্ষ থেকে তোলা জানার অধিকারের প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নকে যখন কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি ‘কার এত জ্বালা’ বলে তাচ্ছিল্য করেন, তখন হয়তো তিনি একজন সাংবাদিককে উদ্দেশ করে কথা বলছেন; কিন্তু তাঁর কথার অভিঘাত গিয়ে পড়ে পুরো গণমাধ্যমের ওপর। আর গণমাধ্যমের ওপর আঘাত মানে শেষ পর্যন্ত জনগণের জানার অধিকারের ওপর আঘাত। কারণ সাংবাদিকের প্রশ্ন করার অধিকার আসলে জনগণের জানার অধিকারেরই একটি কার্যকর রূপ।
হুমায়ুন কবির একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হবসপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবে মাত্র আড়াই বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক করেছেন তিনি। এরপর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিডস ল স্কুল থেকে তিনটি পৃথক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
পেশাগত জীবনেও যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার ও রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ক্রয়ডন কাউন্সিলের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের প্রশ্নের সংস্কৃতি তাঁর কাছে একেবারে অপরিচিত হওয়ার কথা নয়। বরং তাঁর এই আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি সংযত, তথ্যনির্ভর এবং কূটনৈতিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল।
ব্রিটেনের মতো দেশে একজন মন্ত্রীকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সাংবাদিকরা নীতি, সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত, সরকারি ব্যয় কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করেন। কোনো মন্ত্রী প্রশ্নটি পছন্দ না করলেও উত্তর দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্নকারীকে অপমান করা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের অংশ নয়। সুতরাং বাংলাদেশে এসে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই হতাশার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় হুমায়ুন কবির দেশে ফিরে আসেন। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। এই পদে আসার পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট জমা দিয়ে কূটনৈতিক লাল পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর তিনি বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও ফিলিপাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র রয়েছে।
এরপর গত শুক্রবার তিনি নতুন মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। শপথ নেওয়ার পর থেকেই সামনে আসে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের প্রশ্ন। প্রশ্নটি কিন্তু হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস, সেখানে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের কথা জানিয়েছে; কিন্তু তিনি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সেই বিষয়ে পরিষ্কার ও সর্বজনগ্রাহ্য তথ্য এখনো সামনে আসেনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।
তাহলে সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন না? অবশ্যই করবেন। বরং সাংবাদিক প্রশ্ন না করলেই প্রশ্ন উঠত—কেন করলেন না?
বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করেছে। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের বিধান রয়েছে। সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নিয়োগের পাশাপাশি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট অনুপাতে মন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ভিত্তিতেই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ টেকনোক্র্যাট হওয়া মানে সংবিধানের বাইরে চলে যাওয়া নয়; বরং টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকেও সংসদ সদস্য হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতার কাঠামোর মধ্যে থাকতে হয়।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে। সেখানে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি অযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি এমন একটি বিষয়, যার উত্তর সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেই পরিষ্কারভাবে আসা উচিত।
এখানে আইনগত প্রশ্নটি খুব সরল—হুমায়ুন কবিরের বর্তমান নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান কী? তিনি যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে কবে করেছেন? সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া কি চূড়ান্ত হয়েছে? তার প্রমাণ কোথায়? যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করে থাকেন, তাহলে সেই আবেদন কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করেছে? আর যদি এখনো প্রক্রিয়া শেষ না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কোন সাংবিধানিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন? এগুলো কোনো ব্যক্তিগত কৌতূহলের প্রশ্ন নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের আছে। এটি কোনো ব্যক্তির দেশপ্রেম যাচাইয়ের প্রশ্ন নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য যাচাইয়ের প্রশ্ন নয়, কোনো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ‘জ্বালা’ও নয়। এটি একটি সাংবিধানিক যোগ্যতার প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো নথি।
যদি তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা হোক। যদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণ দেওয়া হোক। যদি আবেদন করা হয়ে থাকে কিন্তু প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত না হয়ে থাকে, সেটিও পরিষ্কার করে বলা হোক। আর যদি তিনি এখনো ব্রিটিশ নাগরিক হন, তাহলে তাঁর সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার আইনি ব্যাখ্যা সরকার দিক। উত্তর যত দ্রুত দেওয়া হবে, বিতর্ক তত দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে আক্রমণ করা হলে বিতর্ক শেষ হয় না; বরং আরও বড় হয়।
আমাদের দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রার্থীদের নথি যাচাই হয়েছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ চাওয়া হয়েছে এবং কোথাও কোথাও মনোনয়ন বাতিলও হয়েছে। অর্থাৎ এটি এমন কোনো নতুন বিষয় নয় যে, একজন ব্যক্তি শুধু নিজেকে বাংলাদেশি বললেই তাঁর নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের অবসান ঘটবে। নাগরিকত্ব একটি আইনি বিষয়, আর আইনি বিষয়ের নিষ্পত্তি হয় নথি ও বিধানের আলোকে।
অতীতেও বিদেশি নাগরিকত্ব গোপন রাখা, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে—রাষ্ট্রীয় পদে ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জনপ্রিয়তার চেয়ে আইনি যোগ্যতা বড়। নতুন বাংলাদেশে সেই শিক্ষাটি ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কারণ গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে ধীরে ধীরে জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে পারে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করলেই সাংবাদিকদের রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়েছে। সরকারের সমালোচনাকে কখনো রাষ্ট্রবিরোধিতা, কখনো ষড়যন্ত্র, কখনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রশ্ন করতে করতে একসময় সাংবাদিকরাও নিজেদের প্রশ্ন নিয়ে সংশয়ে ভুগেছেন। কোন প্রশ্ন করলে সমস্যা হবে, কোন প্রশ্ন করলে মামলা হতে পারে, কোন প্রশ্ন করলে অফিসে চাপ আসতে পারে—এসব হিসাব সাংবাদিকতার স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিই তো ছিল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। তাহলে সেই পুরোনো ভাষা কেন ফিরে আসবে? ‘কার এত জ্বালা?’ ‘কে নিউজ করেছে?’ ‘কার স্বার্থে প্রশ্ন?’ ‘এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না?’—এ ধরনের ভাষা শুধু কয়েকটি শব্দ নয়; এগুলো একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক। সেই সংস্কৃতিতে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় না, প্রশ্নকারীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে দেওয়া হয় না, প্রশ্নকারীর রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়। অভিযোগের জবাব নথি দিয়ে দেওয়া হয় না, অভিযোগকারীকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়।
এভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। প্রথমে সাংবাদিককে বলা হয়, প্রশ্নটি রাজনৈতিক। তারপর বলা হয়, সাংবাদিকের উদ্দেশ্য খারাপ। এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। একসময় ব্যক্তিগত আক্রমণ আসে। তারপর আসে ভয়। আর ভয় থেকে জন্ম নেয় আত্মসংযমের এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে সাংবাদিক নিজেই নিজের প্রশ্ন কেটে দেন। সেটিই স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর আর কী হতে পারে?
আজ একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন। কাল আরেকজন প্রশ্ন করার আগে নিজের প্রশ্ন বদলে ফেলবেন। পরশু কোনো সম্পাদক বলবেন—এটা না করাই ভালো। তারপর একদিন পুরো সংবাদমাধ্যমই এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলবে, যেসব প্রশ্ন ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলে। সেখানেই গণতন্ত্রের বিপদ। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তাকে আর কেউ প্রশ্ন করে না।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন বিজেআইএমের প্রতিবাদকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সংগঠনটি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে অপেশাদার, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও আক্রমণাত্মক হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা বলেছে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে করা সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বিদ্রূপ করা এবং প্রশ্নকারীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা উদ্বেগজনক। সংগঠনটি মনে করে, এ ধরনের আক্রমণাত্মক ভাষা সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে পারে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তাঁদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
এই প্রতিবাদ শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থের বিষয় নয়। এটি গণতন্ত্রেরও বিষয়। কারণ গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; গণমাধ্যম জনগণের পক্ষের প্রশ্নকারী। সরকার ভুল করলে গণমাধ্যম তা তুলে ধরবে, সরকার ভালো করলে সেটিও তুলে ধরবে। কোনো সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক বন্ধুত্ব বা শত্রুতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। সম্পর্কটি হওয়া উচিত জবাবদিহির। সরকার তার কাজ করবে, গণমাধ্যম তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং জনগণকে জানাবে। এটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কাঠামো।
প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা এত কঠিন কেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করলেই বিতর্কের অবসান ঘটে। কিন্তু তা না করে সাংবাদিকের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া এবং তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করা প্রশ্নটিকে আরও বড় করেছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ প্রতিমন্ত্রীর কূটনৈতিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কূটনীতিকদের অন্যতম প্রধান গুণ হলো বিনয়, ধৈর্য ও পেশাদারত্ব। কোনো স্পর্শকাতর প্রশ্ন সরাসরি এড়িয়ে যেতে হলেও কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে উত্তর দিতে হয়। কিন্তু নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী কূটনৈতিক সংযমের পরিবর্তে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সংবিধান ও দেশের আইন সবার জন্য সমান। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা যদি একই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে ক্ষমতাসীন দলের একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই আইন শিথিল হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—আইন কি ব্যক্তি দেখে বদলাবে? ক্ষমতা দেখে বদলাবে? দল দেখে বদলাবে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রেও একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। আর যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে আমরা যে নতুন বাংলাদেশ, আইনের শাসন ও সমতার কথা বলছি, সেগুলো নিছক স্লোগান ছাড়া আর কী?
আমরা অতীতে দেখেছি, ক্ষমতাসীনদের জন্য এক ধরনের আইন এবং সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাবানদের ভুলকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলা হয়েছে, আর সাধারণ মানুষের একই ধরনের ভুলকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে এই দ্বৈত মানদণ্ডের অবসান ঘটানো জরুরি। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ দেখতে পায়—আইনের সামনে সবাই সমান।
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের প্রশ্ন তাই শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্ন নয়। এটি নতুন সরকারের জন্যও একটি পরীক্ষা। সরকার কি স্বচ্ছতার পক্ষে দাঁড়াবে? সরকার কি বলবে, ‘যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, আমরা তথ্য দেব’? নাকি সরকারও প্রশ্নকারীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে চিহ্নিত করবে? এই সিদ্ধান্তই অনেক কিছু বলে দেবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি দেশের ভাবমূর্তির অন্যতম প্রধান মুখ। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে এই মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের দক্ষতা, আচরণ ও পেশাদারত্বের ওপর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, কূটনীতি পরিচালনা এবং দেশের মর্যাদা রক্ষার গুরুদায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত। একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিটি বক্তব্য তাই শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ নয়; আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও তা লক্ষ্য করেন।
একজন কূটনীতিকের বড় শক্তি শুধু জ্ঞান নয়, সংযমও। শুধু তথ্য নয়, ভাষার নিয়ন্ত্রণও। শুধু বক্তব্য নয়, সঠিক সময়ে সঠিক শব্দ নির্বাচনও। কূটনীতি অনেক সময় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি করে, যার উত্তর দেওয়া কঠিন। কিন্তু কূটনৈতিক দক্ষতার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই—কঠিন প্রশ্নের মধ্যেও কীভাবে শান্ত থাকা যায়, কীভাবে তথ্য দিয়ে উত্তর দেওয়া যায় এবং কীভাবে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্নের মুখে একজন কূটনীতিক যদি উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর আচরণ কেমন হবে—এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে যখন তিনি দেশের পররাষ্ট্রনীতি, কৌশলগত অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বক্তব্য দেবেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত ও সাংবিধানিক অবস্থান পরিষ্কার থাকা আরও জরুরি।
সম্প্রতি তিনি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ ও অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। এ ধরনের কৌশলগত বিষয়ে একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে তাঁর নিজের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে এবং তিনি সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর অন্যান্য বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান পরিষ্কার থাকা যেমন তাঁর নিজের জন্য প্রয়োজন, তেমনি সরকারের জন্যও প্রয়োজন। কারণ কোনো রাষ্ট্রীয় পদে বসা ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলে সেটি শেষ পর্যন্ত পুরো সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে। আর এই বিতর্কের ধোঁয়াশা দূর করার সবচেয়ে সহজ পথ হলো—তথ্য প্রকাশ করা।
সরকার চাইলে এক দিনের মধ্যেই এই বিতর্ক শেষ করতে পারে। নাগরিকত্বের নথি প্রকাশ করুন। আইনি ব্যাখ্যা দিন। প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতামত দিন। যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে, সেটি স্পষ্ট করুন। যদি কোনো ব্যতিক্রমী সাংবিধানিক বিধান প্রযোজ্য হয়, সেটিও ব্যাখ্যা করুন। এরপর জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। স্বচ্ছতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সত্যকে ভয় না পাওয়া।
যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে প্রশ্নকে ভয় পাওয়ার কী আছে? যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকে, তাহলে নথি দেখাতে ভয় পাওয়ার কী আছে? যদি সাংবিধানিক বাধা না থাকে, তাহলে আইনি ব্যাখ্যা দিতে সমস্যা কোথায়? বরং প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে সন্দেহ বাড়ে। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার আচরণ। মূল প্রশ্নের সঙ্গে তখন যুক্ত হয় আরও একটি প্রশ্ন—উত্তরটি দেওয়া হলো না কেন?
জনাব প্রতিমন্ত্রী, আপনার উচ্চশিক্ষা আছে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে, ব্রিটিশ রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা আছে এবং এখন আপনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তাই আপনার কাছ থেকে আমরা আরও বেশি সংযম, সৌজন্য ও পেশাদারত্ব প্রত্যাশা করতেই পারি। আপনার কাছে কঠিন প্রশ্ন আসবে। এমন প্রশ্নও আসবে, যা আপনার ভালো লাগবে না। কিন্তু সাংবাদিকের কাজ আপনাকে ভালো লাগানো নয়; সাংবাদিকের কাজ জনগণকে তথ্য জানানো। আপনি চাইলে কোনো প্রশ্নকে ভুল প্রমাণ করতে পারেন, চাইলে তথ্য ও নথি দিয়ে সংবাদকে খণ্ডন করতে পারেন, চাইলে আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রশ্নকারীকে বিদ্রূপ করলে প্রশ্নটি শেষ হয় না; বরং আরও বড় হয়ে ফিরে আসে। তখন মূল প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি প্রশ্ন—কেন উত্তর দেওয়া হলো না?
ক্ষমতা সাময়িক, পদ সাময়িক, মন্ত্রীত্বও সাময়িক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী। আজ আপনি প্রতিমন্ত্রী, আগামীকাল অন্য কেউ এই দায়িত্বে থাকবেন। আজ যে সাংবাদিক আপনাকে প্রশ্ন করেছেন, আগামীকাল তিনিই অন্য কোনো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করবেন। কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকারটি যদি আজ দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল সেই অধিকার ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। তাই গণমাধ্যমের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখা উচিত নয়, সাংবাদিকের অনুসন্ধিৎসাকে ‘জ্বালা’ হিসেবে চিহ্নিত করাও উচিত নয়। এই জ্বালাটাই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি—অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করার অস্থিরতা, অসঙ্গতি দেখলে সত্য খোঁজার তাগিদ এবং ক্ষমতাবানকে মনে করিয়ে দেওয়ার সাহস যে রাষ্ট্রের মালিক ক্ষমতাবানরা নন; রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।
বাংলাদেশের মানুষ বৈষম্য, অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছে। সেই নতুন বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা আইন, আলাদা আচরণ বা আলাদা জবাবদিহির সুযোগ থাকতে পারে না। নতুন সরকার যদি সত্যিই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে প্রশ্নকে ভয় পায় না, সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে না এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সরকারের জন্য হুমকি নয়, বরং গণতন্ত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখে।
গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়। গণমাধ্যম হলো আয়না। আয়নায় নিজের চেহারার কোনো দাগ বা খুঁত দেখা গেলে আয়না ভেঙে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং চেহারার ময়লা পরিষ্কার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো সরকারই সব সময় ঠিক হতে পারে না। কোনো মন্ত্রীই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। কোনো আমলাই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। এমনকি কোনো জনপ্রিয় নেতাও জনগণের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রের সৌন্দর্য এখানেই—ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড়; ক্ষমতা নয়, আইন বড়; সরকার নয়, সংবিধান বড়।
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটি তাই দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা দরকার। তিনি যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট বৈধ নথিপত্র প্রকাশ করে বিতর্কের অবসান ঘটানো হোক। যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। আর যদি কোনো সাংবিধানিক জটিলতা থেকে থাকে, তাহলে সরকারকে সংবিধান ও আইনের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে কারও ব্যক্তিগত সম্মানহানি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রশ্ন নেই; প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় পদে একজন ব্যক্তির সাংবিধানিক যোগ্যতা এবং সরকারের স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন আইনটি নিজের দলের, নিজের সরকারের কিংবা নিজের পছন্দের মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হয়। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া সহজ; নিজের লোকের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড বজায় রাখাই প্রকৃত ন্যায়বিচার। নতুন বাংলাদেশ যদি সত্যিই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আর এখানেই ফিরে আসতে হয় সেই একটি বাক্যে—‘কার এত জ্বালা?’
জনাব প্রতিমন্ত্রী, এই জ্বালা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক হিংসা নয়। এই জ্বালা আসলে গণমাধ্যমের। এই জ্বালা সত্য প্রকাশ করার অন্তর্দাহ, সংবিধান ও আইনকে সমুন্নত রাখার পেশাগত তাগিদ এবং জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা। ক্ষমতাবানদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও এই প্রশ্ন করার অধিকারই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শক্তি। সাংবাদিক যখন কোনো মন্ত্রীর নাগরিকত্ব, সম্পদ, সিদ্ধান্ত, নিয়োগ কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করেন না; তিনি জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। সেই প্রশ্নকে ‘জ্বালা’ বলে তাচ্ছিল্য করা মানে শুধু একজন সাংবাদিককে ছোট করা নয়, বরং জনগণের জানার অধিকারকেই খাটো করা।
গণমাধ্যমের এই ‘জ্বালা’ না থাকলে ক্ষমতার অন্ধকার অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়। এই জ্বালা না থাকলে অনিয়মের খবর প্রকাশ্যে আসে না, দুর্নীতির তথ্য সামনে আসে না, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয় না এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির প্রয়োজনও অনুভূত হয় না। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, গণমাধ্যম যখন প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রথমে সাংবাদিককে বলা হয়, প্রশ্নটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; এরপর প্রশ্নকারীকে কোনো দলের লোক বলে চিহ্নিত করা হয়; তারপর তাঁকে ভয় দেখানো হয়; একসময় সাংবাদিক নিজেই প্রশ্ন করার আগে ভাবতে শুরু করেন—এই প্রশ্ন করলে কী হবে? সেখান থেকেই জন্ম নেয় স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ। আর গণমাধ্যমের এই নীরবতাই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাকবচ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা যাবে, সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে এবং আইন সবার জন্য সমান থাকবে। সেই রাষ্ট্রে সাংবাদিককে প্রশ্ন করার জন্য ‘কার এত জ্বালা’ শুনতে হবে না; বরং সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্র মানে প্রশ্ন করার অধিকার, উত্তর পাওয়ার অধিকার, ক্ষমতাবানকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার অধিকার এবং সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা। গণমাধ্যম সেই কাজটিরই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
তাই জনাব প্রতিমন্ত্রী, আপনার প্রশ্নের উত্তরটি খুব সহজ—জ্বালাটা আসলে গণমাধ্যমের। তবে সেই জ্বালা কারও বিরুদ্ধে নয়; সেই জ্বালা সত্যের পক্ষে, সংবিধানের পক্ষে, আইনের শাসনের পক্ষে এবং জনগণের জানার অধিকারের পক্ষে। এই জ্বালা থাকলেই ক্ষমতার অন্ধকারে আলো জ্বলে, এই জ্বালা থাকলেই অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে, এই জ্বালা থাকলেই ক্ষমতাবানরা মনে রাখেন যে তাঁরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাই গণমাধ্যমের এই জ্বালাকে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নয়, বরং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাজে এই জ্বালাকে সহ্য করা এবং সম্মান করাই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। কারণ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় সাংবাদিকের প্রশ্ন নয়; সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো এমন এক পরিবেশ তৈরি হওয়া, যেখানে সাংবাদিক প্রশ্ন করার আগে ভয় পান।
এই জ্বালা থাকুক। প্রশ্ন থাকুক। জবাবদিহি থাকুক। ক্ষমতাবানরা প্রশ্নের মুখোমুখি হোন এবং জনগণ উত্তর পাওয়ার অধিকার ভোগ করুক। কারণ একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় অপরাধ প্রশ্ন করা নয়; বরং তার সবচেয়ে বড় পরাজয় হলো প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলা। আর বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র নতুন করে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহির স্বপ্ন দেখছে, তার জন্য সেই পরাজয়ের কোনো সুযোগ নেই।









