গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: অজুহাতের ছয় মাস, সমাধান কোথায়?
৩৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা, তবু হাহাকার!

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা মেটাতেই এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোথাও লোডশেডিং, কোথাও গ্যাসের চাপ নেই, কোথাও কারখানার উৎপাদন বন্ধ। সার কারখানা বসে আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে, কিন্তু তাতেও সংকট কাটছে না। বরং বাড়ছে ব্যয়, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সক্ষমতা আছে, উৎপাদন নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, জ্বালানি নেই। আমদানির ব্যবস্থা আছে, কিন্তু আমদানির মতো অর্থ নেই। আর যে কেন্দ্রগুলো চালানো যাচ্ছে না, সেগুলোর জন্যও জনগণের অর্থে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
সরকারের ছয় মাস হয়ে গেছে। আর কতদিন এই সংকটকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা বলে ব্যাখ্যা করা যাবে?
আগের সরকারের রেখে যাওয়া সংকট যে বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে, এতে সন্দেহ নেই। বরং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান দুরবস্থার বড় অংশই গত দেড় দশকের নীতি ও সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু একটি সরকার যখন ছয় মাস দায়িত্বে থাকে, তখন জনগণ শুধু আগের সরকারের ভুলের তালিকা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়, সামনে যাওয়ার পথ কী।
জ্বালানি বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ নই। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করার আগে কয়েক দিন ধরে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। এ খাতের বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ মিলিয়ে যে চিত্রটি সামনে এসেছে, তা বেশ অস্বস্তিকর।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কোনো একটি সরকারের একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সামঞ্জস্য না থাকা, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল আর্থিক দায়।
সমস্যার শুরুটা বোঝা দরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে।
২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছরে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উদ্যোগে দেশে ১১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর যুক্তিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির সঙ্গে যে প্রশ্নটির সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, সেটি হলো—এসব কেন্দ্র চালানোর জন্য গ্যাস, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি আসবে কোথা থেকে?
সেই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খোঁজা হয়নি।
ফলে এখন আমাদের এমন এক বিদ্যুৎব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে, যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো জ্বালানি নেই।
১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। অথচ দেশের চাহিদা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কাগজে-কলমে তাহলে সংকট থাকার কথা নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের আসল হিসাব কাগজে নয়, জ্বালানিতে।
গ্যাস না থাকলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ। কয়লা না থাকলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ। আর তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলেও খরচ এত বেশি যে, দীর্ঘ সময় সেটি করা অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।
অর্থাৎ আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো সাশ্রয়ী জ্বালানি নেই।
এখানেই শেষ নয়। কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকলেও অর্থ দিতে হচ্ছে। গত বছরই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও নির্দিষ্ট সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
এটি এমন এক দায়, যেটি বর্তমান সরকার চাইলেই একদিনে বন্ধ করতে পারবে না।
কারণ আগের শেখ হাসিনা সরকার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়ে চুক্তি করেছে। এখন চুক্তি অনুযায়ী অর্থ দেওয়া বন্ধ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে বা আন্তর্জাতিক সালিসে যেতে পারে। তখন ক্ষতিপূরণের দায় আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ পুরোনো সিদ্ধান্তের খরচ এখনো চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিল দিতে হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি আমদানির বিলও বাড়ছে।
২০২১-২২ অর্থবছর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশকে বড় ধরনের চাপের মধ্যে ফেলেছে। কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা সরবরাহ সংকট তৈরি হলেই তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বাড়ে। আর দাম বাড়লেই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
গত অর্থবছরে তেল আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর এ ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬৭ হাজার কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। আগের বছর এ খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ৪০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। কয়লা আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ শুধু এক বছরের ব্যবধানে তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানির অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ৯০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রশ্নটা তাই খুব সরল: এভাবে আমদানি করে বাংলাদেশ আর কত দিন চলবে?
আন্তর্জাতিক বাজার স্বাভাবিক হবে, যুদ্ধ শেষ হবে, জ্বালানির দাম কমবে—এই আশায় বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যুৎ সংকট কোনো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ক্যালেন্ডার দেখে আসে না। কলকারখানা বন্ধ হলে উৎপাদন বন্ধ হয় এখনই। সার কারখানা বন্ধ হলে কৃষিতে তার প্রভাব পড়ে পরে। আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দীর্ঘায়িত হলে পুরো অর্থনীতিই তার খেসারত দেয়।
আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম, বেশি করে গ্যাস আমদানি করলেই হয়তো সমস্যার বড় অংশের সমাধান হবে। পরে বুঝলাম, সমস্যাটি এত সরল নয়।
টাকা থাকলেও চাইলেই ইচ্ছেমতো গ্যাস আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে ঢোকানো যাবে না। দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সীমিত। দিনে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
এখানেও আছে আরেকটি সীমাবদ্ধতা।
টার্মিনাল বাড়ালেই হবে না। সাগর থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার পাইপলাইনের সক্ষমতাও সীমিত। ফলে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলে তার সঙ্গে নতুন পাইপলাইনও করতে হবে। অর্থ থাকলেও এসব অবকাঠামো নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লাগে।
অর্থাৎ গ্যাস আমদানিও রাতারাতি বাড়ানোর সুযোগ নেই।
তার ওপর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আলাদা ঝুঁকি তৈরি করেছে। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানির চুক্তি রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কাতারের গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের দায় নেই। যুদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। কিন্তু যুদ্ধের অভিঘাত থেকে বাংলাদেশকে কেউ রক্ষা করবে না।
এটাই বাস্তবতা।
ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে। লোডশেডিং বাড়ে। গ্যাসের চাপ কমে কলকারখানায়। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা জ্বলে না। সার কারখানা বন্ধ হয়।
একটি জ্বালানি সংকট কীভাবে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়, বাংলাদেশ এখন সেটিই দেখছে।
ভোলার গ্যাস নিয়েও একই ধরনের সরলীকরণ দেখা যায়। টকশোতে আলোচনা শুনলে মনে হয়, চাইলেই ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব। বাস্তবে তা নয়।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। ২০০৯ সালে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও এখনো প্রয়োজনীয় পাইপলাইন অবকাঠামো নেই।
আবার গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে জাহাজে করে আনার পথও সহজ নয়। গ্যাস তরল করার অবকাঠামো, পরিবহন এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে পাইপলাইনের তুলনায় ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
তাহলে সমস্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে, কিন্তু আমদানির অর্থ জোগাড় করা কঠিন। টাকা থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে। আর একই সময়ে নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন কমছে।
এটি আসলে একটি জ্বালানি ফাঁদ।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দিনে প্রায় ২৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতো। এখন সেই উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। প্রায় এক দশকে দৈনিক উৎপাদন কমেছে ১১০ কোটি ঘনফুট।
অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে।
২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। অথচ নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে একই মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
একসময় যে বাংলাদেশ গ্যাস রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করত, সেই বাংলাদেশ এখন গ্যাস আমদানি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
এখানে অতীতের নীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: নিজের সম্পদ অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বদলে আমরা কেন আমদানির ওপর এত বেশি নির্ভর করলাম?
বর্তমানে বৈধ সংযোগগুলোর হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরকার নিজস্ব ও আমদানি করা গ্যাস মিলিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করতে পারে। ২০১৮ সালের কাছাকাছি উৎপাদন ধরে রাখা গেলেও বর্তমান ঘাটতির বড় অংশ এড়ানো সম্ভব হতো।
আর প্রকৃত চাহিদা আরও বেশি হতে পারে। নতুন সংযোগের জন্য জমা থাকা হাজার হাজার আবেদন বিবেচনায় নিলে দৈনিক চাহিদা ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত হতে পারে।
তাহলে কি বাংলাদেশের সামনে কোনো পথ নেই?
আছে। তবে সহজ পথ নেই।
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়াতে হবে। পুরোনো কূপ সংস্কার করতে হবে। যেসব কূপে উৎপাদন কমে গেছে, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উত্তোলন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকায় দ্রুত নতুন কূপ খনন করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ছাড়া বিকল্প নেই।
বিশেষ করে সমুদ্রে।
সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিয়ে গত দুই দশকে অনেক রাজনীতি হয়েছে। যখনই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখনই একে দেশ বিক্রির অভিযোগে রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রচার হয়েছে।
বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। চুক্তির শর্ত হতে হবে স্বচ্ছ। রাষ্ট্রের অংশ, রাজস্ব ভাগাভাগি, পরিবেশগত ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—সবকিছুই বিবেচনায় রাখতে হবে।
কিন্তু ভয় বা রাজনৈতিক স্লোগানের কারণে যদি অনুসন্ধানই না হয়, তার মূল্যও কম নয়।
বর্তমান সংকট তারই মূল্য আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নিজস্ব গ্যাস না খুঁজে আমরা আমদানির ওপর নির্ভর করেছি। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য ঝাঁকুনি লাগলেই বাংলাদেশে তার অভিঘাত পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ হলে গ্যাসের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়।
একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যদি এতটাই আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর হয়, তাহলে সেই নিরাপত্তাকে নিরাপত্তা বলা কঠিন।
তাই সরকারের এখন চার-পাঁচ বছরের একটি স্পষ্ট জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কবে শুরু হবে, নতুন কূপ কোথায় খনন হবে, পুরোনো কূপ কীভাবে সংস্কার করা হবে, কয়লা নিয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে, এলএনজি অবকাঠামো কতটা বাড়ানো হবে—এসবের সময়সীমা জনগণের সামনে থাকা উচিত।
কয়লা নিয়েও আবেগের বদলে বাস্তববাদ দরকার।
উন্মুক্ত পদ্ধতিতে হবে, নাকি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে—এ নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলছে। পরিবেশের ক্ষতি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশগত ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে যে পদ্ধতি কার্যকর, সেটিই বিবেচনা করা উচিত।
আর বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
৩৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে যদি ১৭-১৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা মেটাতেই জ্বালানি না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আর শুধু সক্ষমতা বাড়ানোর নীতি চলতে পারে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
নইলে আবারও কেন্দ্র হবে, ঋণ হবে, চুক্তি হবে, সার্বভৌম গ্যারান্টি হবে, তারপর জ্বালানি না থাকায় কেন্দ্র বসে থাকবে। আর জনগণকে দিতে হবে ক্যাপাসিটি চার্জ।
এই চক্র ভাঙতেই হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি স্বচ্ছতার।
সরকারকে জনগণের সামনে প্রকৃত সমস্যার হিসাব দিতে হবে। কত গ্যাস আছে, কত উৎপাদন হচ্ছে, কত আমদানি করা সম্ভব, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কতটা বাস্তবে চালানো যায়, কত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, আগামী এক বছরে কী করা হবে এবং পাঁচ বছরে জ্বালানি খাত কোথায় নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার আছে।
আগের সরকার কী করেছে, কোথায় ভুল করেছে, কোন চুক্তিতে কী দায় তৈরি হয়েছে—এসবের জবাবদিহি প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অতীতের দায় দেখিয়ে বর্তমানের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
সরকারের ছয় মাস হয়ে গেছে।
এখন আর শুধু বলা যাবে না, ‘এটা আগের সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যা।’
কারণ উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া সংকটের সঙ্গে মোকাবিলা করাই তো নতুন সরকারের কাজ।
ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে, মধ্যপ্রাচ্য কবে শান্ত হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কবে কমবে—এসব বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু নিজেদের গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো কূপ সংস্কার, কয়লা নিয়ে সিদ্ধান্ত, এলএনজি অবকাঠামো, পাইপলাইন সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাংলাদেশের হাতেই আছে।
তাই এখন আর ‘দিন গোনা ছাড়া কিছু করার নেই’—এমন অবস্থান যথেষ্ট নয়।
সরকারকে বলতে হবে, কী করবে। কখন করবে। কত খরচ হবে। আর সেই পরিকল্পনার ফল কবে থেকে পাওয়া যাবে।
কারণ লোডশেডিং যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করে না। কারখানা আন্তর্জাতিক বাজার স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকে না। সার উৎপাদন সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে না।
আর জনগণও অজুহাত শোনার জন্য ছয় মাস অপেক্ষা করেনি।
৩৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকার পরও যদি ১৭-১৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা মেটাতে হাহাকার করতে হয়, তাহলে সমস্যাটা শুধু গ্যাস বা বিদ্যুতের নয়। সমস্যাটা পরিকল্পনার।
এখন সেই পরিকল্পনাই চাই।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকটের ব্যাখ্যা নয়, জনগণ দেখতে চায় সংকট থেকে বের হওয়ার পথ।









