রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ৭০ অনুচ্ছেদ: জুলাইয়ের পরও কি দলই শেষ কথা?
সংসদে দলের কথাই কি শেষ কথা?

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল প্রায় নির্ধারিত। কিন্তু নির্বাচনের ফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন—দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলে তাঁর আসন কি শূন্য হয়ে যাবে?
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ইতোমধ্যে বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট। কিন্তু সাংবিধানিক প্রশ্ন হলো—৭০ অনুচ্ছেদ কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য? এ প্রশ্নের উত্তর যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়।
কারণ এখানে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বতন্ত্র সাংবিধানিক কাঠামো, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। সবচেয়ে বড় কথা, এ বিষয়ে এখনো এমন কোনো সরাসরি ও বাধ্যতামূলক বিচারিক নজির নেই, যার ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে বলা যায়—রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলেই সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যাবে।
৭০ অনুচ্ছেদে আসলে কী বলা হয়েছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যের দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে তাঁর সদস্যপদের সম্পর্ক নির্ধারণ করে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা “সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান” করলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করা দরকার। ৭০ অনুচ্ছেদে ‘বিলের বিরুদ্ধে ভোট’ বা ‘সংসদে আনা কোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট’—এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো বিল বা প্রস্তাব নয়—শুধু এই যুক্তিতে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়, এমনটি বলা যায় না।
আসল প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের দেওয়া ভোট কি ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’ হিসেবে গণ্য হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক চরিত্রটি বুঝতে হবে।
সংসদ কক্ষে ভোট, কিন্তু সংসদের কার্যধারা?
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে এবং নির্বাচন সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সংসদ কক্ষ ব্যবহার করা এবং সংসদের সাধারণ কার্যধারার অংশ হওয়া—দুটি বিষয় এক নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন কার্যক্রম নয়। সংসদের অধিবেশন না থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও সংসদের নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈঠকে স্পিকার সাধারণ সংসদীয় কার্যক্রমের মতো সভাপতিত্ব করেন না। নির্বাচন পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচনী কর্তা হিসেবে।
২০ আগস্টের নির্বাচনও সংসদের দুই অধিবেশনের মধ্যবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সংসদ সদস্যরা যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন, তাঁরা কি সংসদের আইনপ্রণেতা হিসেবে ভোট দেন, নাকি সংবিধান নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ভোট দেন?
৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংসদ ভবনে ভোট দেওয়া এবং সংসদের সাধারণ কার্যধারার অংশ হিসেবে ভোট দেওয়া—দুটিকে একই সাংবিধানিক অর্থে দেখা হবে কি না, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন।
১৯৭২ সালের সংবিধান এবং গোপন ব্যালটের প্রশ্ন
এই বিতর্কে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানেই ৭০ অনুচ্ছেদ ছিল। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এই বিধান সংবিধানের অংশ।
কিন্তু একই সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গোপন ব্যালটের ব্যবস্থাও ছিল। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়। যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের প্রতিটি ভোটই দলীয় আনুগত্যের বাধ্যবাধকতার অধীন হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের প্রয়োজন কেন ছিল?
অবশ্য এটিকে একা ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়—এর চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না। কিন্তু এটি অন্তত দেখায় যে সংবিধানপ্রণেতারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সংসদের সাধারণ কার্যধারা থেকে আলাদা একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন—এমন ব্যাখ্যার ভিত্তি রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে গোপন ব্যালটের পরিবর্তে প্রকাশ্য ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। ব্যালটে সদস্যের পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ রাখা হয় এবং ভোটদানের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু ভোট প্রকাশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়ে যায়—এমন কোনো সাংবিধানিক সূত্র নেই। ব্যালট কেবল বলে দেয়, কে কাকে ভোট দিয়েছেন। সেই ভোটের সাংবিধানিক পরিণতি কী হবে, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
চিফ হুইপ কি আসন শূন্য করতে পারেন?
এখানেও একটি ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। ধরা যাক, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলেন। চিফ হুইপ ঘোষণা করলেন, তাঁর আসন শূন্য। তাতেই কি আসন শূন্য হয়ে যাবে?
সংবিধানের কাঠামো তা বলে না। সংসদ সদস্যের সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে যায়। অর্থাৎ কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়েছেন কি না, তা নিয়ে বিরোধ হলে সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং চিফ হুইপের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর ঘোষণাই চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নয়।
বরং প্রশ্ন হবে—দলীয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল কি না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’ হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দলীয় সিদ্ধান্ত, নির্দেশ বা নথির মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি অনেক বেশি জটিল। এটি মূলত সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন।
দুই পক্ষের যুক্তিই আছে
যারা মনে করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য, তাঁদের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাঁরা বলতে পারেন, ৭০ অনুচ্ছেদে ‘সংসদের অধিবেশনে’ বা ‘বিলের ওপর’ ভোটের মতো কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সেখানে বলা হয়েছে শুধু ‘সংসদে’।
রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন সংসদ সদস্যরাই এবং ভোট হয় সংসদ ভবনে। উপরন্তু, বর্তমান ব্যবস্থায় ভোট প্রকাশ্য। এই যুক্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিপরীত যুক্তিও যথেষ্ট শক্তিশালী। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন বা সাধারণ কার্যধারা নয়। এটি সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের অধীনে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন।
সংসদের অধিবেশন না থাকলেও এটি অনুষ্ঠিত হতে পারে। স্পিকার নন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন পরিচালনা করেন। তাই ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট’ এবং ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’—এই দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখা হবে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। সদস্যপদ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রেও সংবিধান কমিশনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছে।
তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নির্বাচন কমিশনের একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু রাজনৈতিক দল বা চিফ হুইপের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত কি না—সেটিও গণতান্ত্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ একজন সংসদ সদস্যের আসন হারানো শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষতি নয়; তাঁর নির্বাচিত এলাকার প্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।
জুলাই জাতীয় সনদ: এমপির স্বাধীন ভোটের পরীক্ষাও কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন?
এই জায়গাতেই ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর শুধু সরকার পরিবর্তনের কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সংসদীয় ব্যবস্থার সংস্কারের কথা। সেই আলোচনায় ৭০ অনুচ্ছেদ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারের মূল দর্শন ছিল—সংসদ সদস্য যেন প্রতিটি বিষয়ে দলীয় নির্দেশের কাছে বাধ্য না থাকেন। দলীয় বাধ্যবাধকতা সীমিত থাকবে মূলত আস্থাভোট ও অর্থবিলের মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে; অন্য অনেক বিষয়ে একজন এমপি নিজের বিবেক, জনগণের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন বিবেচনা করে ভোট দিতে পারবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঠিক এমনই একটি ক্ষেত্র। এটি অর্থবিল নয়। এটি আস্থাভোটও নয়। তাই জুলাই জাতীয় সনদের সেই সংস্কার যদি কার্যকর থাকত, তাহলে একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের নির্দেশ বা কারও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী নয়, নিজের বিবেচনায় প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতেন।
আর এর অর্থ শুধু একজন এমপির স্বাধীনতা নয়। এর অর্থ হতে পারত—দেশের সংসদ সদস্যরা মিলে এমন একজন যোগ্য, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে পারতেন, যিনি শুধু কোনো দলের পছন্দের ব্যক্তি নন, বরং পুরো রাষ্ট্রের জন্য অধিকতর উপযুক্ত।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটের হিসাবটা তখন শুধু ‘আমার দল কাকে চায়?’ এমন হতো না। প্রশ্নটা হতে পারত—‘রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে যোগ্য রাষ্ট্রপতি কে?’
এটাই জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কারের বড় সম্ভাবনা।
যদি জুলাই জাতীয় সনদের দর্শন হয় একজন এমপিকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর ভোটও কি দলীয় নির্দেশের বাইরে থাকা উচিত নয়?
কারণ রাষ্ট্রপতি কোনো দলের নন। তিনি পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তাহলে তাঁর নির্বাচনে কেন একজন সংসদ সদস্যের বিবেচনার সীমা শুধু দলীয় নির্দেশে আটকে থাকবে?
জুলাইয়ের পর আসল পরীক্ষা এখানেই—আমরা কি এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে এমপি শুধু দলের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন? নাকি এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রয়োজনে নিজের বিবেক, জনগণের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে ভোট দিতে পারবেন?
আর সেই স্বাধীনতার সুযোগ থাকলে, ২০ আগস্ট বাংলাদেশ হয়তো শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন রাষ্ট্রপতি পেত না—পেতে পারত যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতি।
দলীয় আনুগত্য বনাম জনগণের ম্যান্ডেট
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দলীয় সরকার যেন সংসদে নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে, সংসদ সদস্যরা যেন বারবার দল বদল করে সরকার পতনের কারণ না হন—এই প্রয়োজন থেকেই ৭০ অনুচ্ছেদের শক্ত অবস্থান।
কিন্তু এর বিপরীত সমস্যাও রয়েছে। যদি সংসদ সদস্য প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নে দলের নির্দেশের বাইরে যেতে না পারেন, তাহলে সংসদে ব্যক্তিগত বিবেক, জনগণের স্থানীয় স্বার্থ এবং স্বাধীন মতামতের জায়গা কতটা থাকে?
একজন এমপি নির্বাচিত হন জনগণের ভোটে। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন ছাড়া তাঁর নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। ফলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়—তিনি কার প্রতিনিধি—দলের, নাকি জনগণের?
জুলাই জাতীয় সনদের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের বিতর্ক আসলে এই প্রশ্নেরই একটি সাংবিধানিক উত্তর খুঁজছে।
২০ আগস্টের ভোট তাই একটি পরীক্ষাও
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল হয়তো আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে। কিন্তু এই নির্বাচন একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য? এ মুহূর্তে এর উত্তর নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাঁর আসন কি সঙ্গে সঙ্গে শূন্য হয়ে যাবে? না—চিফ হুইপের ঘোষণামাত্র নয়; এ বিষয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
চূড়ান্তভাবে কে বিষয়টি নির্ধারণ করবেন? সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ হলে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—জুলাইয়ের পর যে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক সংসদের কথা বলা হয়েছে, সেই সংসদে একজন সদস্যের বিবেকের ভোটের জায়গা কতটা থাকবে?
২০ আগস্ট তাই শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন নয়। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি পুরোনো দ্বন্দ্বকে আবার সামনে নিয়ে আসছে—দলীয় আনুগত্য বনাম নির্বাচিত প্রতিনিধির স্বাধীনতা।
রাষ্ট্রপতি পুরো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতীক। তাঁর নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোট তাই কেবল একটি দলীয় সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন প্রতিনিধি কাকে সমর্থন করছেন, সেই সিদ্ধান্তও।
সেই সিদ্ধান্তে দলীয় নির্দেশ থাকবে, নাকি থাকবে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির স্বাধীন বিবেক—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ২০ আগস্টের ব্যালট বাক্সে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংসদীয় সংস্কৃতিতেও খুঁজতে হবে।
জুলাই যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে এখন দেখার বিষয়—সেই পরিবর্তন কি সংসদের ভেতরেও পৌঁছেছে?
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু একজন এমপির আসন নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো—বাংলাদেশের সংসদ কি দলের কাছে জবাবদিহি করবে, নাকি জনগণের কাছে?









