‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর: নিরাপত্তা সহযোগিতা নাকি পুরোনো গোয়েন্দা সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস?

ভারতের বহির্মুখী গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর নতুন করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অতীতের নানা বিতর্কিত ঘটনার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
চার সদস্যের একটি প্রতিৃনিধি দল নিয়ে ঢাকায় এসে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দুই দেশের নিয়মিত নিরাপত্তা যোগাযোগের অংশ। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল একটি নিয়মিত গোয়েন্দা যোগাযোগ, নাকি বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সম্পর্কের নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা?
গত দেড় দশকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে গুম, অপহরণ, গোপন আটক, রাজনৈতিক নজরদারি, সীমান্তপারের বন্দি হস্তান্তর, নির্বাচনকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং বিদেশি গোয়েন্দা সম্পৃক্ততার নানা অভিযোগ আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় দুই দেশেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—নিরাপত্তা সহযোগিতার সীমারেখা কোথায়?
কে এই পরাগ জৈন?
পরাগ জৈন কোনো সাধারণ কূটনীতিক নন। তিনি ভারতের বহির্বিশ্বভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর প্রধান। ১৯৮৯ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পাকিস্তান, কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ২০২৫ সালে তিনি RAW-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতার বড় অংশজুড়ে রয়েছে উচ্চঝুঁকির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম।
অর্থাৎ তিনি এমন একটি সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার প্রধান কাজ ভারতের বাইরে কৌশলগত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা স্বার্থে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
সে কারণে তাঁর সফরকে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ বা আনুষ্ঠানিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
আয়নাঘর ও গুমের প্রশ্ন
বাংলাদেশের গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় গুমের ঘটনায় পুলিশ, RAB, DB, CTTC-সহ একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে DGFI, NSI এবং BGB-এর কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
গোপন আটককেন্দ্র, দীর্ঘদিন নিখোঁজ রাখা এবং নির্যাতনের অভিযোগ মিলিয়ে ‘আয়নাঘর’ এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের একটি প্রতীকী নাম।
তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এসব ঘটনায় কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগ এবং সীমান্তপারের বন্দি হস্তান্তরের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকটি ঘটনায় সীমান্তপারের হস্তান্তরের প্রসঙ্গ আলোচনায় এসেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—
* কারা এই যোগাযোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?
* কী ধরনের তথ্য বিনিময় হতো?
* কার নির্দেশে বন্দিদের সীমান্তের ওপারে নেওয়া হয়েছিল?
* ভারতীয় কোনো গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা সংস্থা এসব বিষয়ে অবগত ছিল কি না?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের কোনো নিরাপত্তা সংস্থা কি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের নাগরিককে গোপনে আটক, অপহরণ বা হস্তান্তর করেছিল?
অপহরণ ও সীমান্তপারের অভিযোগ
গত দেড় দশকে রাজনৈতিক কর্মী, বিরোধী মতের ব্যক্তি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এবং সরকারের সমালোচকদের গুম ও অপহরণের বহু অভিযোগ সামনে এসেছে।
কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ আর ফেরেননি। আবার কেউ দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখা হয়েছিল।
কিছু ঘটনায় সীমান্তপারের হস্তান্তরের অভিযোগও এসেছে। যদি কোনো ব্যক্তিকে এক দেশের ভূখণ্ড থেকে অন্য দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর কাছে গোপনে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও বটে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড: অমীমাংসিত প্রশ্ন
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত হন ৭৪ জন, যার মধ্যে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার নেপথ্য পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের সংশ্লিষ্টতা এবং একটি বিদেশি শক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
এখন নতুন করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
* ঘটনার আগে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল কি?
* কোনো বিদেশি সংস্থা আগাম তথ্য জানত কি?
* বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোর কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল কি?
* ঘটনার পর নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থার পরিবর্তন কার স্বার্থে গিয়েছিল?
পিলখানা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। তাই এ সংক্রান্ত অভিযোগ ও তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
নির্বাচন, রাজনীতি ও প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন এবং গণআন্দোলনের সময় বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
২০১৩ সালের হেফাজত আন্দোলন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
মূল প্রশ্নগুলো হলো—
* কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা কি রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ বা প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে?
* কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিতে গোপন যোগাযোগ হয়েছিল কি?
* বিদেশি গোয়েন্দা মূল্যায়ন কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে?
* রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তথ্যযুদ্ধ ও গণমাধ্যম
আধুনিক গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড কেবল মাঠপর্যায়ের অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়; তথ্য ও জনমতও এখন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান।
বাংলাদেশের নির্বাচন, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু ইস্যু এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বর্ণনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—
* কোনো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কি সমন্বিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচার, প্রচারণা বা প্রভাব বিস্তারমূলক কার্যক্রমে জড়িত ছিল?
* বাংলাদেশের রাজনৈতিক বয়ান প্রভাবিত করার কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ ছিল কি?
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারাভিযান পরিচালিত হয়েছিল কি?
নতুন সম্পর্কের নতুন সীমারেখা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। তবে সেই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।
গুম নয়, গোপন আটক নয়, রাজনৈতিক অপহরণ নয়, সীমান্তপারের বেআইনি হস্তান্তর নয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গোপন হস্তক্ষেপ নয়—এমন প্রত্যাশা থেকেই নতুন নিরাপত্তা সম্পর্কের কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
RAW প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর তাই কেবল একটি কূটনৈতিক বা নিরাপত্তা বৈঠকের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য অতীতের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কারণ গুম, অপহরণ, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ—এসব প্রশ্নের জবাব শুধু অতীতের বিচার নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।









