৪ আগস্ট: ‘মৃত্যুপুরী’ থেকে এক সংবাদকর্মীর ফিরে আসার গল্প
'বেঁচে আছি, এটাই মিরাকল'

কখনও কখনও মনে হয়, আমার বেঁচে থাকাটাই যেন এক অলৌকিক ঘটনা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের কথা মনে পড়লে এখনো শরীর কেঁপে ওঠে। মাথার সেলাইয়ের দাগ, ভাঙা হাতের যন্ত্রণা কিংবা রক্তাক্ত শরীরের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে কিছুটা ফিকে হয়েছে, কিন্তু সেদিনের দৃশ্যগুলো এক মুহূর্তের জন্যও মুছে যায়নি।
জুলাই আন্দোলনের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর একটি ছিল সাংবাদিকতা। কারণ, মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরাই ছিল আমাদের কাজ। আর সেই বাস্তবতাই ছিল ক্ষমতাসীনদের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
সত্যি বলতে, সে সময় সাংবাদিক সমাজের ভেতরেও বিভাজন ছিল। কেউ ক্ষমতার ভাষ্য প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন, আবার কেউ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথের বাস্তবতা দেশ-বিদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরছিলেন। রিপোর্টার, ফটোসাংবাদিক, ভিডিও জার্নালিস্ট, মোবাইল সাংবাদিক—অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুভয়কে পাশে নিয়েই কাজ করেছেন। সেই কারণেই সাংবাদিকরা অনেক ক্ষেত্রেই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
এই মূল্য খুব কম ছিল না। আন্দোলনের সময় অন্তত ছয়জন সাংবাদিক প্রাণ হারান। পুলিশের গুলি, হামলা ও সংঘর্ষে আহত হন কয়েকশ সংবাদকর্মী। আমি নিজেও ১৮ জুলাই মিরপুরে অস্ত্রধারী এক যুবলীগ নেতার ছবি তুলতে গিয়ে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলাম। কিন্তু তখনও বুঝিনি, আরও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
৪ আগস্ট, রবিবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির দিন। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের খবর আসছিল। অফিস থেকে আমাকে ধানমন্ডি এলাকায় পরিস্থিতি কাভার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শ্যামলী হয়ে ধানমন্ডির দিকে এগোতে গিয়ে দেখি গণভবনমুখী এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা। পথ পরিবর্তন করে মোহাম্মদপুর হয়ে ধানমন্ডি–২৭ নম্বর এলাকায় পৌঁছাই। প্রথমে পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নীরবতা খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।
কিছুক্ষণ পর দেখি সোবহানবাগের দিক থেকে আওয়ামী লীগের একটি বড় মিছিল এগিয়ে আসছে। আমার পর্যবেক্ষণে, মিছিলের অনেকের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র ছিল। তারা এলাকায় প্রবেশের পর মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ বদলে যায়। গুলির শব্দ, আতঙ্ক আর দৌড়ঝাঁপে এলাকা পরিণত হয় এক ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে।
রাস্তার যাকেই সন্দেহ হয়েছে, তাকেই থামিয়ে মারধর করা হচ্ছিল। আশপাশের গলিতে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ার দৃশ্য আমি দেখেছি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে তখন আমার একমাত্র দায়িত্ব ছিল এই দৃশ্যগুলো নথিবদ্ধ করা।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি নিজেই সংবাদ থেকে সংবাদের বিষয়বস্তু হয়ে গেলাম।
দেখলাম, কয়েকজন অস্ত্রধারী একজন সাইকেল আরোহীকে ধাওয়া করে এনে মারধর করছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম, তিনি আমার সহকর্মী মিরাজ। আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করি তাঁকে ছেড়ে দিতে। হামলাকারীরা বারবার তাঁর মোবাইল ফোন পরীক্ষা করতে চাইছিল। আমি প্রতিবাদ করি। কারণ জানতাম, ফোনের ভেতরের কিছু বিষয় তাঁদের আরও ক্ষুব্ধ করতে পারে।
কোনোভাবে ভিড়ের ভেতর থেকে মিরাজকে বের করে দিতে সক্ষম হই। তিনি সাইকেল নিয়ে দ্রুত সরে যান।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি হয়ে উঠি তাদের নতুন লক্ষ্য।
আমি প্রেস কার্ড দেখিয়েছি। বলেছি, আমি সাংবাদিক। কিন্তু পরিচয় নয়, বরং প্রশ্ন এসেছে—'এখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছ কেন?'
এরপর শুরু হয় নির্মম প্রহার।
হকিস্টিক, লোহার রড, লাঠি—যা হাতে পেয়েছে, তাই দিয়ে আঘাত করতে থাকে। প্রথম দফার হামলা থেকে কোনোভাবে বেরিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার কাছে আশ্রয় চাই। ভেবেছিলাম, অন্তত সাংবাদিক পরিচয়ের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো হবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আমাকে বলা হলো, দৌড়ে পালিয়ে যেতে।
আজও ভাবি, যদি সেদিন সেই পরামর্শ শুনে দৌড় দিতাম, তাহলে হয়তো এই লেখাটি আর লেখা হতো না।
সেদিন আমি দৌড়ে পালাইনি। কারণ তখন আমার মনে হয়েছিল, পেছন ফিরে দৌড় দেওয়া মানেই হয়তো পিঠে গুলি খাওয়া। তাই মূল সড়ক পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরেকটি দল আমাকে ঘিরে ফেলে।
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় দফার হামলা।
হকিস্টিক, লাঠি, রড, ধারালো অস্ত্র—যা ছিল, তা দিয়েই আঘাত করা হচ্ছিল। আমি তখনও বলছিলাম, আমি সাংবাদিক। আমার গলায় ঝুলছিল প্রেস কার্ড। কিন্তু সেই পরিচয়ের কোনো মূল্য ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, সাংবাদিক পরিচয়টাই যেন তাদের আরও ক্ষিপ্ত করে তুলছিল।
একসময় ডিবিসি নিউজের সহকর্মী বিকাশ দাদা আমাকে আগলে ধরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর সেই সাহসী উদ্যোগ না থাকলে হয়তো আমি সেদিন আর বেঁচে ফিরতাম না। আমি কোনোভাবে রাস্তার পাশের রেলিংয়ের ভেতরে আশ্রয় নিই। কিন্তু সেখানেও হামলাকারীরা থামেনি। তারা রামদা দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করছিল। রেলিংটি না থাকলে হয়তো সেই আঘাত সরাসরি আমার শরীরেই পড়ত।
ভাবছিলাম, এবার হয়তো রক্ষা পেলাম।
কিন্তু সেটিও ছিল ভুল ধারণা।
রাস্তাটি পার হওয়ার সময় আবার ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল আমাকে ঘিরে ধরে। শুরু হয় তৃতীয় দফার হামলা। তখন আমার শরীরে আর শক্তি ছিল না। একের পর এক আঘাতে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তারা আমার মাথা, পিঠ, হাত—যেখানে পারছে সেখানেই আঘাত করছিল। কয়েকজন আমার পকেট থেকে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আবার কয়েকজন বলছিল, ‘সবার কাছে মেশিন (পিস্তল) আছে, দ্রুত পালা, নয়তো এখানেই শেষ করে দেব।’
এই কথাগুলো আজও কানে বাজে।
একপর্যায়ে আমার মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে। মুহূর্তের জন্য সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি জীবনের শেষ দৃশ্য।
সেই মুহূর্তে আবারও এগিয়ে আসেন বিকাশ দাদা। তিনি মাথা কাপড় দিয়ে বেঁধে আমাকে একটি রিকশায় তুলে দেন। আমি এক হাতে রিকশা ধরে, আরেক হাতে মাথার ক্ষত চেপে কোনোভাবে মগবাজারের ইনসাফ বারাকা হাসপাতালে পৌঁছাই।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা শুরু হয়। মাথায় পাঁচটি সেলাই দিতে হয়। ডান হাতে ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল, হাত ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
শারীরিকভাবে আমি হাসপাতালে ছিলাম, কিন্তু মন পড়ে ছিল রাজপথে।
বারবার মনে হচ্ছিল, যদি আমাকে এভাবে আহত করা না হতো, তাহলে হয়তো সেদিনের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে পারতাম। আরও কিছু সত্য হয়তো মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারতাম।
বাসায় ফিরে বিশ্রামে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি সারা দিন ও রাত বিভিন্ন এলাকা থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, উত্তরা, সায়েন্স ল্যাব, রামপুরা—প্রতিটি এলাকা থেকে আসছিল উদ্বেগজনক খবর। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছিল অসংখ্য গুজব ও অপতথ্য। তখন বুঝেছি, একটি গণআন্দোলনে শুধু রাজপথে নয়, তথ্যের জগতেও সমান তীব্র লড়াই চলে।
সেই রাতেই ঘোষণা আসে—‘লং মার্চ টু গণভবন’।
তারপরের ইতিহাস সবার জানা।
আজ দুই বছর পর যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়, ৪ আগস্ট শুধু আমার জীবনের একটি ভয়াবহ দিন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ সেদিন শুধু একজন সাংবাদিককে মারধর করা হয়নি; আঘাত করা হয়েছিল তথ্য সংগ্রহের অধিকারকে, স্বাধীন সাংবাদিকতার চেতনাকে এবং জনগণের সত্য জানার অধিকারকে।
একজন সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা থাকে, কলম থাকে, নোটবুক থাকে। এগুলো কোনো অস্ত্র নয়। কিন্তু যারা সত্যকে ভয় পায়, তাদের কাছে এগুলোই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আমি জানি, আমার অভিজ্ঞতা একা নয়। সেই আন্দোলনের দিনগুলোতে অসংখ্য সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ এখনো সেই মানসিক ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প ইতিহাসের অংশ হওয়া উচিত।
ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের গল্প লিখলে পূর্ণ হয় না। ইতিহাস পূর্ণ হয় তখনই, যখন সত্য বলার জন্য যারা মূল্য দিয়েছেন, তাঁদের কথাও সমান গুরুত্ব পায়।
আমি বেঁচে আছি।
এটাই হয়তো অলৌকিক।
কিন্তু এই বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় দায় হলো—যা দেখেছি, তা লিখে যাওয়া। কারণ স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে ইতিহাস বিকৃত হয়। আর ইতিহাস বিকৃত হলে ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকে না।









