বিরোধী দল মানেই কি রাজনৈতিক দমন-পীড়ন?
নির্বাচনে হারা নয়, বরং বিরোধী দল হওয়াটাই এদেশে সবচেয়ে ভয়ের!

বাংলাদেশে নির্বাচনে জেতার লড়াই শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, অনেক ক্ষেত্রেই টিকে থাকার জন্য। একটি পরিণত গণতন্ত্রে নির্বাচনে হার স্বাভাবিক ঘটনা। আজ যে দল সরকারে, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যাবে। আবার আজকের বিরোধী দল পরবর্তী নির্বাচনে সরকার গঠন করবে। ক্ষমতার এই শান্তিপূর্ণ পালাবদলই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। এখানে নির্বাচনে হার মানে শুধু সরকার গঠন করতে না পারা নয়। অনেক সময় এর অর্থ হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক প্রভাব হারানো, প্রশাসনিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যাওয়া, সাংগঠনিক সংকটে পড়া এবং সবচেয়ে বড় কথা, কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। তাই এ দেশে নির্বাচন অনেক সময় গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার চেয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে ওঠে।
এই কথাটি শুনতে কঠিন লাগতে পারে। কিন্তু গত দুই দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে বিষয়টি খুব একটা অযৌক্তিক মনে হবে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়। তারা রাষ্ট্রেরই একটি অপরিহার্য অংশ। সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা, সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের অসন্তোষকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দেশে বিরোধী দলের এই ভূমিকা বাস্তবে কতটা কার্যকর?
সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই, যেখানে বিরোধী দলের রাজনৈতিক চাপ সরকারকে কোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য অধিকাংশ সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হার মেনেছে। আবার রাজপথে দীর্ঘ আন্দোলন, হরতাল কিংবা অবরোধও খুব কম ক্ষেত্রেই সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে পেরেছে।
এর অর্থ এই নয় যে বিরোধী দল সব দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে। তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, কৌশলগত ভুল এবং জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়েছে।
গত দুই দশকে আমরা দেখেছি, বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে, রাজপথে আন্দোলন করেছে, আবার কখনও নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি আছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—এসবের কোনোটিই ক্ষমতার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বিশেষ করে বড় ব্যবধানে সরকার গঠনের প্রবণতা এবং নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক বিরোধী রাজনীতিকে আরও দুর্বল করেছে। সংসদে সংখ্যার বাস্তবতা এমন হয়েছে যে, বিরোধী দলের অনেক বক্তব্য কেবল কার্যবিবরণীতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ক্ষমতার অসম বণ্টন বিরোধী দলগুলোর জন্য আরও কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এর ফলে একটি অস্বস্তিকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সরকারে থাকা মানেই রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি প্রভাব; আর বিরোধী দলে যাওয়া মানেই প্রভাবের পরিধি দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাওয়া।
এটাই মূল সমস্যা। কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতা শুধু সরকার পরিচালনার জন্য নয়; বিরোধী দলকেও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়। রাষ্ট্র যদি সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে নির্বাচন আর সমান সুযোগের প্রতিযোগিতা থাকে না। সেটি ধীরে ধীরে এমন এক লড়াইয়ে পরিণত হয়, যেখানে হারতে কেউ চায় না।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—বিরোধী দল কোথায়? তারা কেন আরও জোরালো আন্দোলন করছে না? কেন সরকারকে চাপে ফেলতে পারছে না?
প্রশ্নগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার—আমাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কি সত্যিই একটি বিরোধী দলকে কার্যকরভাবে রাজনীতি করার সুযোগ দিচ্ছে?
কারণ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল শুধু নিজেদের শক্তিতে তৈরি হয় না। তাদের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, কার্যকর সংসদ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং সমান রাজনৈতিক সুযোগ। এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে গেলে বিরোধী দলও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা সরকার নিয়ে অনেক আলোচনা করি, কিন্তু বিরোধী দলকে কার্যকর রাখার প্রশ্নটি খুব কমই তুলি। অথচ শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী দলও। একটিকে দুর্বল করে অন্যটিকে দীর্ঘদিন শক্তিশালী রাখা যায় না।
প্রথম পর্বের শেষে তাই শুধু একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।
বাংলাদেশে কি আমরা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে নির্বাচনে হারা মানেই কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করার সুযোগ হারানো?
যদি উত্তর 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে বিস্ময়ের কিছু নেই যে এ দেশে কেউ সহজে নির্বাচনে হারতে চায় না।
শুরুতে বলেছি, বাংলাদেশে নির্বাচনে হার অনেক সময় শুধু ক্ষমতা হারানো নয়; কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করার সুযোগ হারানোরও নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন বাস্তবতা তৈরি হলো কীভাবে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের গত দুই দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে হবে।
গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়; সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। সংসদে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা, বিকল্প নীতি তুলে ধরা, জনস্বার্থের ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব।
কিন্তু বাংলাদেশে এই ভূমিকাটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ২০০১ সালের পর থেকে বড় ব্যবধানে সরকার গঠনের প্রবণতা এবং পরবর্তী সময়ে সংসদে একক আধিপত্যের রাজনীতি বিরোধী দলকে কার্যত প্রান্তিক করে দেয়। সংসদে তাদের বক্তব্য শোনা হতো, কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো রাজনৈতিক শক্তি তাদের হাতে ছিল না।
সংসদের বাইরে চিত্রটাও খুব ভিন্ন ছিল না।
বিরোধী দল হরতাল দিয়েছে, অবরোধ করেছে, লংমার্চ করেছে, অনশন করেছে। সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সরকারের বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে এসব কর্মসূচির প্রভাব খুব কমই দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণও খুব বেশি নেই, যেখানে বিরোধী দলের রাজনৈতিক চাপের মুখে সরকার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ইসলামি ব্যাংককে ঘিরে জনমত ও রাজনৈতিক চাপের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা অনেকে উল্লেখ করেন। কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো নিয়মের প্রমাণ নয়।
ফলে ধীরে ধীরে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—বাংলাদেশে বিরোধী দল থাকতে পারে, কিন্তু কার্যকর বিরোধিতা করার রাজনৈতিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে বিরোধী দলের ব্যর্থতা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু বিরোধী দলকে কার্যকরভাবে কাজ করার পরিবেশ আছে কি না, সেই প্রশ্ন খুব কমই ওঠে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করেন, বিরোধী দল কী করছে? কেন তারা সরকারকে চাপে ফেলতে পারছে না?
প্রশ্নটি অবশ্যই যৌক্তিক।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা উচিত—রাষ্ট্রীয় কাঠামো কি বিরোধী দলকে এমন অবস্থায় রেখেছে, যেখানে তারা সত্যিই সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে পারে?
কারণ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল শুধু নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় না। প্রয়োজন কার্যকর সংসদ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, নিরপেক্ষ প্রশাসন, সমান রাজনৈতিক সুযোগ এবং বিরোধী মতের প্রতি ন্যূনতম সহনশীলতা।
এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে গেলে বিরোধী দলও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর তখন নির্বাচনে হার শুধু বিরোধী বেঞ্চে বসার বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর শুরু।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একটি অলিখিত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। অন্যদিকে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধি বা নেতা-কর্মীরা প্রায়ই নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানে আবিষ্কার করেন। ফলে পাঁচ বছর ধরে রাজনৈতিক সংগঠনকে টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন আর শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই।
আর এ কারণেই বাংলাদেশে নির্বাচনে হারার মূল্য এত বেশি।
এটি শুধু একটি দলের সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট।
প্রথম দুই পর্বে বলেছি, বাংলাদেশে নির্বাচনে হার অনেক সময় শুধু ক্ষমতা হারানোর বিষয় নয়; কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করার সুযোগ হারানোরও নাম। প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতা থেকে আমরা কি কোনো শিক্ষা নিয়েছি?
গত দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী রাজনীতি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা হয়েছে, গণগ্রেপ্তার হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, অনেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও সে সময় রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জোরপূর্বক গুম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক আচরণও বদলাবে।
রাষ্ট্র আর কোনো দলের সম্প্রসারিত রূপ হবে না। বিরোধী দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হবে, শত্রু হিসেবে নয়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিরোধী মতকে দমন করার সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে—এমন কথা এখনই বলা কঠিন।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হামলা এবং প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করার অভিযোগও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে।
সরকার অবশ্য এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অনেক অভিযোগকেই তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে।
গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগের সত্যতা আদালত, তদন্ত এবং তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে আরও বড় একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কেন প্রায় প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলের পর বিরোধী দল একই ধরনের অভিযোগ তোলে?
এটা কি কেবল কাকতালীয়?
নাকি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই এমন একটি সমস্যা আছে, যা ক্ষমতায় যেই যাক, তাকে একই পথে হাঁটতে প্রলুব্ধ করে?
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই।
বিরোধী দলে থাকলে প্রায় সব দলই গণতন্ত্র, সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই একই দল অনেক সময় রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। তখন বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
সরকার বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব বেশি বদলায় না।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় গণতন্ত্রের।
কারণ শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সরকারের ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। সংসদ দুর্বল হয়। রাজনৈতিক বিতর্ক রাজপথে চলে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের। কারণ কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে ক্ষমতার জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ কারণেই আজকের সরকারকে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়।
আজ যারা সরকারে আছেন, আগামী নির্বাচনের পর তারাই বিরোধী দলে যেতে পারেন। আবার আজ যারা বিরোধী দলে, তারাই আগামী দিনের সরকার হতে পারেন। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই।
তাই আজ যদি বিরোধী দলের জন্য রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা হয়, আগামীকাল সেই সংকুচিত পরিসরেই অন্য কাউকে রাজনীতি করতে হবে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই।
আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ করেছে। পরে ক্ষমতায় গিয়ে একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থেকে রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশা, তারা ক্ষমতায় এলে অন্তত এই চক্রটি ভাঙার চেষ্টা করবে। একই প্রত্যাশা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসা প্রতিটি দলের প্রতিও থাকবে।
কারণ মানুষ শুধু নতুন সরকার চায় না; তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিও চায়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট নির্বাচন নয়; নির্বাচনে হেরে যাওয়া একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
যে দেশে বিরোধী দলে যাওয়া রাজনৈতিক অকার্যকারিতা, প্রশাসনিক বঞ্চনা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, সে দেশে নির্বাচন আর শুধু ভোটের প্রতিযোগিতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে টিকে থাকার লড়াই।
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতা। বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে। ক্ষমতার পালাবদলকে ভয় নয়, স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
যেদিন আমরা সেটি পারব, সেদিন নির্বাচনে হারও আর রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি থাকবে না।
তার আগে পর্যন্ত একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশে কেউ নির্বাচনে হারতে চায় না। কারণ এ দেশে বিরোধী দল হওয়ার মূল্য এখনও অনেক বেশি।
#চিকিৎসক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









