কর্নেল অলির বক্তব্য, বিএনপির উদ্বেগ এবং বাস্তব রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবস্থান বদল নতুন কিছু নয়। প্রতিপক্ষ মিত্র হয়, মিত্র প্রতিপক্ষ হয়। যে নেতা একসময় কোনো দলের সবচেয়ে কঠোর সমালোচক ছিলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনিই আবার সেই দলের পাশে দাঁড়ান। কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনও ঠিক এমনই নানা বাঁক ও বৈপরীত্যে ভরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে বিএনপির একাংশের এত অস্বস্তি ও প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?
ইতিহাসে একটু ফিরে তাকানো যাক।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত প্রায় সারা দেশে আসন সমঝোতায় গেলেও চট্টগ্রাম-১৪ আসনে সমঝোতা হয়নি। সেখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই প্রার্থী দেয়। কর্নেল অলি একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-১৩ ও চট্টগ্রাম-১৪ আসনে নির্বাচন করেন। তিনি চট্টগ্রাম-১৩ থেকে বিজয়ী হলেও চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
সেই সময় এই আসনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করায় এবং জামায়াতের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কারণে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। বিএনপি সরকার গঠন করলে জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং সাবেক মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়নি। একই সময়ে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তারেক রহমানের উত্থান শুরু হয়। মন্ত্রী হতে না পারার ক্ষোভ, নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব এবং নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের উত্থান—সব মিলিয়ে কর্নেল অলির সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
চারদলীয় জোট সরকারের পুরো সময়জুড়েই তিনি প্রকাশ্যে জামায়াতের সমালোচনা করেন। অথচ রাজনৈতিক পরিণতি দেখুন, আজ সেই জামায়াতের সঙ্গেই তাঁর রাজনৈতিক মিত্রতা।
২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর, বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র সাত দিন আগে কর্নেল অলি বিএনপি ত্যাগ করেন। তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে যান বিএনপির তিনজন মন্ত্রী এবং প্রায় ২৯ জন সংসদ সদস্য। বিএনপির ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম বড় সাংগঠনিক ভাঙন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গঠন করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে এলডিপি প্রায় ৩২টি আসনে সমঝোতা পায়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই ভাঙন তৎকালীন রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে এবং পরবর্তী ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের আগেই আওয়ামী লীগ ও এলডিপির সেই জোট ভেঙে যায়। বদরুদ্দোজা চৌধুরীও পৃথক হয়ে বিকল্পধারাকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে এলডিপি এককভাবে অংশ নেয়। দল থেকে একমাত্র কর্নেল অলি বিজয়ী হন। এরপর ২০১২ সালে এলডিপি আবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ফিরে আসে। ২০১৩ সালে শেখ হাসিনা তাঁকে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিয়েছেন—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকলেও তিনি বিএনপি জোটেই থেকে যান। দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর তিনি বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন।
কিন্তু রাজনীতি আবারও মোড় নেয়। এলডিপির তৎকালীন মহাসচিব রেদোয়ান আহমদ বিএনপিতে যোগ দেন। পরে আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে কর্নেল অলি বিএনপি জোট ছাড়েন এবং সেই জামায়াতের সঙ্গেই রাজনৈতিক মিত্রতা গড়ে তোলেন, যে জামায়াতের সঙ্গে সংঘাত থেকেই একসময় তাঁর বিএনপি ছাড়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এলডিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সমন্বয়ে রয়েছে। এখন কর্নেল অলি প্রকাশ্যে বিএনপির সমালোচনা করছেন। এমনকি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির নাহিদ ইসলাম এবং হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক এক হলে সরকার পতন হতে পারে—এমন মন্তব্যও করছেন।
এর জবাবে বিএনপির বহু নেতা, টকশো বক্তা এবং সমর্থককে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হতে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা অলির বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিচ্ছেন, সমালোচনা করছেন, এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণও করছেন।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন। একজন বিরোধী রাজনীতিক সরকার পতনের কথা বলবেন—এতে অবাক হওয়ার কী আছে?
বিরোধী দলের জনসভায় সরকারকে "আর মাত্র কয়েক দিন" সময় দেওয়ার ভাষণ তো বাংলাদেশের রাজনীতির বহু পুরোনো সংস্কৃতি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রায় প্রতিদিনই বলতেন, কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে খুব শিগগির সরকারের পতন ঘটানো হবে। তখন আওয়ামী লীগ এসব বক্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখত।
বাস্তবতা হলো, বিরোধী দল সরকার পতনের ডাক দেবে—এটাই স্বাভাবিক রাজনীতি। এতে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আরও বড় বাস্তবতা হলো, সরকার কেবল বিরোধীদের বক্তৃতায় পড়ে না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের শেষ দিকে বিএনপি ও জামায়াত বছরের পর বছর আন্দোলন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অবনতি এবং জনঅসন্তোষ। রাজনৈতিক আন্দোলন তখন সেই অসন্তোষের ওপর ভর করার সুযোগ পায়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ২০২২ সাল থেকেই লিখে আসছিলাম, আওয়ামী লীগের পতন যদি ঘটে, তা শুধু বিএনপি বা জামায়াতের আন্দোলনের কারণে হবে না; বরং অর্থনৈতিক সংকট মানুষের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করলে সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই বাস্তবতা আজও বদলায়নি।
আজ যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়, তাহলে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত, এনসিপি কিংবা কর্নেল অলি নন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং আইনশৃঙ্খলা।
রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বেড়েছে। ব্যাংক খাতের অনিয়ম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে এবং ডলারের বাজারও স্থিতিশীল হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক দিক।
কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা অন্য কথা বলে। মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে। নতুন কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারে তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ চাকরির অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এই দুই সমস্যাই যেকোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।
জনগণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নিজের পকেটের হিসাব দেখে। বাজারে গেলে কী দামে চাল, ডাল, তেল কিনতে হচ্ছে, সন্তান চাকরি পাচ্ছে কি না, ব্যবসা টিকছে কি না—এসব প্রশ্নই ভোটের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
সুতরাং কর্নেল অলি কী বললেন, সেটি নিয়ে বিএনপির এত অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর বক্তব্যের জবাব দিতে সারাদিন ব্যয় করলেও রাজনৈতিক লাভ খুব বেশি হবে না।
বরং যদি সরকার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং আইনশৃঙ্খলার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে কর্নেল অলির বক্তব্য রাজনৈতিক শোরগোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
আর যদি তা না পারে, তাহলে কর্নেল অলিকে জবাব দিয়ে নয়, বাস্তবতার কাছেই জবাবদিহি করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত সরকার টিকে থাকে বিরোধীদের ভাষণে নয়, জনগণের জীবনযাত্রার মানের ওপর।









