জামায়াতের 'নৈতিকতার বয়ান' এখন নিজেদেরই পথের কাঁটা!
নিজেদের বড় প্রতিপক্ষ এখন নিজেরাই!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো দলই শুধু সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে টিকে থাকে না। প্রতিটি দলই নিজেদের ঘিরে একটি রাজনৈতিক পরিচয় বা ন্যারেটিভ তৈরি করে। কেউ জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি, কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক, কেউ উন্নয়নের প্রতীক, আবার কেউ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির বাহক। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে একটি ভিন্ন ন্যারেটিভ—সততা, নৈতিকতা ও আদর্শের রাজনীতি।
দলটির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, বিশেষ করে একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে তীব্র বিতর্ক থাকলেও, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে তারা অনেকটাই সফল হয়েছিল যে, জামায়াতের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত জীবনে তুলনামূলকভাবে সৎ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দুর্নীতিমুক্ত। বহু বছর ধরে এই ভাবমূর্তি দলটির রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করেছে।
কিন্তু রাজনীতিতে একটি ন্যারেটিভ যেমন শক্তি, তেমনি সেটি বড় দায়ও। কারণ, আপনি যখন নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক বলে উপস্থাপন করেন, তখন সমাজও আপনার কাছে অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের সাংগঠনিক বিস্তার ও জনসম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে দলটি মূলত একটি সীমিত মতাদর্শিক পরিসরে সক্রিয় ছিল। এখন তারা জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এর ফলে দলটির প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নেতার ব্যক্তিগত আচরণ এবং প্রতিটি বিতর্ক জনসমক্ষে চলে আসছে।
এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় সংকট।
জামায়াত বহু বছর ধরে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বাম দল, এমনকি নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অনৈতিকতা ও চরিত্রগত দুর্বলতার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছে। অর্থাৎ তারা কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনা করেনি, বরং নিজেদের নৈতিকতার মানদণ্ডকেই সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আসমান থেকে নেমে আসেন না। তারা এই সমাজেরই মানুষ। একই সামাজিক বাস্তবতা, একই সংস্কৃতি এবং একই মানবিক সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকেই তারা উঠে আসেন। ফলে একটি দলের প্রত্যেক সদস্যকে আদর্শিকভাবে নিখুঁত ধরে নেওয়া কখনোই বাস্তবসম্মত নয়।
আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে জামায়াত।
সাতক্ষীরার সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি আইনগত অপরাধের প্রশ্ন নয়। গোপনে বিয়ে করা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই নৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সবকিছু ফৌজদারি অপরাধ নয়। তবু এই ঘটনাকে ঘিরে যে তীব্র জনসমালোচনা দেখা যাচ্ছে, তার বড় কারণ ঘটনাটি নয়; বরং জামায়াতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ান।
যে দল প্রকাশ্যে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, সামাজিক আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে এবং অন্যদের বিচারের ভাষা তৈরি করে, সেই দলের নেতার ক্ষেত্রেও মানুষ একই মানদণ্ড প্রয়োগ করবে—এটাই স্বাভাবিক।
ইসলামী শরিয়তের আলোচনায়ও বিয়ে গোপন না রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। বিয়ের ঘোষণা দেওয়া, মানুষকে জানানো এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার সুন্নাহর কথা ইসলামি আলেমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। জামায়াতও তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। ফলে দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা যদি সেই নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগে সমালোচিত হন, তাহলে সেটি সাধারণ মানুষের চোখে আরও বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নৈতিক অবস্থান নিয়েছে। কে কী পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে মিশবে, কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়—এসব প্রশ্নে তারা প্রকাশ্য মতামত দিয়েছে। কোথাও কোথাও হোটেলে তথাকথিত 'অশ্লীলতা' বন্ধের দাবিতে প্রচার চালিয়েছে, সামাজিক মেলামেশা নিয়ে অবস্থান নিয়েছে।
অর্থাৎ তারা ব্যক্তিগত পরিসরকে রাজনৈতিক ও নৈতিক আলোচনার অংশ বানিয়েছে।
ফলে যখন একই ধরনের প্রশ্ন তাদের নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ওঠে, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যুক্তি খুব বেশি কার্যকর হয় না। কারণ, অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিকতার মানদণ্ড প্রয়োগ করলে, একসময় সেই একই মানদণ্ড নিজের ওপরও ফিরে আসে।
রাজনীতিতে এটিই ন্যারেটিভের স্বাভাবিক পরিণতি।
এ ধরনের উদাহরণ শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দেখা যায়। যে ব্যক্তি বা দল নিজেকে সর্বোচ্চ নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, তাদের ছোট বিচ্যুতিও বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। কারণ, মানুষের প্রত্যাশার মাত্রাও তখন অনেক উঁচুতে চলে যায়।
জামায়াত এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার অর্থ শুধু ভোট বাড়া নয়; এর অর্থ হলো বেশি মানুষের অংশগ্রহণ, বেশি বৈচিত্র্য এবং বেশি নজরদারি। নতুন মানুষ আসবে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে, নতুন বিতর্কও তৈরি হবে। সেই বাস্তবতায় শতভাগ নৈতিক বিশুদ্ধতার দাবি ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন।
এখানেই দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
যদি একটি দল নিজেদের পরিচয় শুধু 'আমরাই সবচেয়ে সৎ'—এই দাবির ওপর দাঁড় করায়, তাহলে প্রতিটি বিচ্যুতি সেই পরিচয়ের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে। কিন্তু যদি একটি দল স্বীকার করে যে মানুষ ভুল করতে পারে, আইন ও জবাবদিহিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার চূড়ান্ত বিচারক রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক দল নয়, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদে আরও টেকসই রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের অনেক খ্রিস্টান গণতান্ত্রিক দল ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করেও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সর্বাত্মক নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছে। তারা ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক জবাবদিহির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশেও মূলধারার রাজনীতিতে টিকে থাকতে চাইলে জামায়াতকে হয়তো একসময় সেই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।
অন্যথায়, তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আর আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো দল হবে না। সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে তাদের নিজেদের তৈরি করা নৈতিকতার বয়ান। সেই বয়ানের ভারই একসময় তাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় বাধায় পরিণত হতে পারে।
#গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









