সেনাবাহিনীর নতুন ব্যাটালিয়ন: নাম নয়, স্বাধীন চেতনাকেই ভয় ভারতের!
ভারত শিবিরে পুরোনো আতঙ্ক!

ভাটিয়ারীর পাহাড়ে তখন গোধূলির আলো। বাতাসে নোনা জলের গন্ধ আর বুটের খটখট শব্দ। তরুণ অফিসারদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। এই দীপ্তি শুধু নতুন জীবনের নয়, এ যেন এক নতুন বাংলাদেশের ইঙ্গিত। গত ১৮ জুন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে যখন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’-এর শুভ উদ্বোধন করেন, তখন অনেকেই হয়তো ভাবেননি, এই খবরটি সীমান্ত পেরিয়ে দিল্লির সাউথ ব্লকে কতটা বড় কম্পন তৈরি করবে। কম্পনটি অবশ্য ব্যাটালিয়ন গঠন নিয়ে নয়; বরং এই ব্যাটালিয়নের অধীনে থাকা চারটি কোম্পানির নামকরণকে ঘিরে।
ইসলামের ইতিহাসের চার মহান খলিফা—হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)—এর নামে নামকরণ করা হয়েছে এই কোম্পানিগুলোর। আর তাতেই যেন ঘুম হারাম হয়ে গেছে ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও তাদের অনুগত গণমাধ্যমগুলোর।
ভারতীয় গণমাধ্যম নবভারত টাইমস অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশ আর্মি: জেনারেল জামান কি বাংলাদেশের জন্য একটি ইসলামি আর্মি গঠন করছেন?” অন্যদিকে নর্থইস্ট নিউজ একে সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘ইসলামিকরণ’-এর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে। আজতক বাংলা বিষয়টিকে ‘সংবেদনশীল’ ও ‘নেতিবাচক’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের মূল আপত্তি হলো, যেখানে প্রথম ব্যাটালিয়নের কোম্পানিগুলোর নাম ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের নামে, সেখানে কেন এই পরিবর্তন?
ভারতীয় মিডিয়ার এই গাত্রদাহ ও গ্যোবেলসীয় প্রচারণার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর স্ববিরোধিতা, এক কদর্য দ্বিমুখী নীতি। যে দেশ নিজের সামরিক বাহিনীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্মীয়-পৌরাণিক চরিত্র আর দেব-দেবীর নাম জুড়ে রেখেছে, তাদের মুখে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের এই সমালোচনা শুধু হাস্যকরই নয়, চরম ঔদ্ধত্যেরও শামিল।
একটু পেছনে তাকালেই ভারতের এই কদর্য স্ববিরোধিতার আসল রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দিল্লির বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সরকার উগ্রবাদীদের লেলিয়ে দিয়ে একের পর এক মুসলিম স্থাপত্য দখলের চেষ্টা করছে। জ্ঞানবাপী থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক বিভিন্ন মসজিদের নিচে কথিত মন্দিরের খোঁজে উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে। মুসলিম স্মৃতিবিজড়িত এলাহাবাদ, ফৈজাবাদ কিংবা মুঘলসরাইয়ের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোর নাম পরিবর্তন করে হিন্দু পরিচয়ে রূপ দেওয়া হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, তাদের নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর দিকে তাকালেও দেখা যাবে, সেটি হিন্দু পুরাণ আর দেব-দেবীর নামেই পরিপূর্ণ। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি এলিট ব্যাটালিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘ভৈরব ব্যাটালিয়ন’, যা হিন্দু দেবতা শিবের এক উগ্র রূপের নাম।
ভারতের সামরিক কাঠামোর দিকে চোখ ফেরালেও এমন অসংখ্য উদাহরণ মিলবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৭ কোর পরিচিত ‘ব্রহ্মাস্ত্র কোর’ নামে, ২১ কোর ‘সুদর্শন চক্র কোর’, ৩৩ কোর ‘ত্রিশক্তি কোর’, ১১ কোর ‘বজ্র কোর’ এবং ১০ কোর ‘চেতক কোর’ নামে পরিচিত। ব্রহ্মাস্ত্র, সুদর্শন চক্র কিংবা বজ্র—সবই হিন্দু পুরাণে দেব-দেবীদের অজেয় ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের নাম। ‘চেতক’ নামটি এসেছে মহারানা প্রতাপের বিখ্যাত ঘোড়ার নাম থেকে।
শুধু কোরের নামেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; ভারতীয় রেজিমেন্টগুলোর রণধ্বনি বা ওয়ার ক্রাইও সরাসরি ধর্মীয় স্লোগান। রাজপুত ও বিহার রেজিমেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে নামে ‘বজরং বলী কি জয়’ ধ্বনি দিয়ে, কুমায়ুন রেজিমেন্ট উচ্চারণ করে ‘কালিকা মাতা কি জয়’, গাড়োয়াল রাইফেলস বলে ‘বদ্রী বিশাল লাল কি জয়’, আর মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি হুংকার তোলে ‘হর হর মহাদেব’ বলে।
আন্তর্জাতিক মহলে কিন্তু এই কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ‘হিন্দুত্ববাদী আর্মি’ বলে খাটো করা হয় না। কারণ, একটি পেশাদার সামরিক বাহিনীর পরিচয় নির্ধারিত হয় তার পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও সক্ষমতার মাধ্যমে; কেবল নামকরণের মাধ্যমে নয়। তাহলে বাংলাদেশের একটি প্রশিক্ষণ ব্যাটালিয়নের কোম্পানিগুলোর নাম ইসলামের ইতিহাসের চারজন সুপরিচিত বিশ্বনেতার নামে রাখা হলে সেটিকে ‘আদর্শিক পরিবর্তন’ কিংবা ‘উগ্রপন্থা’র চশমায় দেখা হবে কেন? ভারত যদি নিজ দেশের সামরিক ঐতিহ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীককে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের এত আপত্তি কেন?
সমস্যাটি আসলে নামকরণের ধর্মীয় পরিচয়ে নয়; মূল সমস্যা অন্যত্র। বিগত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার জেঁকে বসেছিল, তাকে ভারত যেভাবে খুশি ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে দিল্লি ঢাকাকে নিজের একটি আজ্ঞাবহ প্রদেশের মতো ব্যবহার করেছে বলেও সমালোচকেরা অভিযোগ করে থাকেন। এই দাসত্বের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছিল আমাদের গৌরবময় সেনাবাহিনী।
সমালোচকদের দাবি, ভারতের সুদূরপ্রসারী কৌশলগত প্রভাবের কারণে আমাদের সেনাবাহিনীকে কার্যত অকার্যকর ও মেরুদণ্ডহীন করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের প্রতিরক্ষা নীতি কেমন হবে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে দিল্লির সাউথ ব্লকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।
সবশেষ ২০০৯ সালের পিলখানায় ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর যোগসাজশ ছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হয়ে আসছে, যদিও তা বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পিলখানা ট্র্যাজেডির মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক বলয় ভেঙে ফেলা এবং ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম নেতৃত্বকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার একটি প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়েছিল।
বিগত দেড় দশক ধরে চলা সেই পরাধীনতা ও দাসত্বের অন্ধকার শিকল ভেঙে সেনাবাহিনী আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আর এই মাথা তুলে দাঁড়ানোকেই এখন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না দিল্লি। কারণ, একটি স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী মাথা তুলে দাঁড়ালে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে কতটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে, তার ঐতিহাসিক উদাহরণ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেখিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে মূলত ভারতের কৌশলগত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বকীয় বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৫–১৯৮১) সেনাবাহিনী ভারতের ওপর সামরিক ও কৌশলগত নির্ভরতা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠে এবং একটি শক্তিশালী, পেশাদার ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকারের তৈরি করা সমান্তরাল ও বিতর্কিত ‘রক্ষীবাহিনী’ বিলুপ্ত করে এর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে, কোনো প্রতিবেশী বা বিদেশি প্রভুর দয়ার ওপর নয়। ভারতের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য একটি বহুমাত্রিক বৈদেশিক ও সামরিক নীতি প্রবর্তন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা চীনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা দ্রুতই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী সম্পর্কে পরিণত হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং লজিস্টিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও কৌশলগত সমর্থন নিশ্চিত করা হয়।
ভারতের সম্ভাব্য যেকোনো কৌশলগত চাপ বা সীমান্ত আগ্রাসন মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর জনবল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেন। নতুন পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। চট্টগ্রামে ২৪তম পদাতিক ডিভিশন এবং সাভারে ৯ম পদাতিক ডিভিশন গঠন করা হয়, যা আজও কৌশলগতভাবে ঢাকার নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (ডিএসসিএসসি) এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে (বিএমএ) পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার মাধ্যমে নিজস্ব প্রশিক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, ফলে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
শুধু তা-ই নয়, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে জিয়াউর রহমান সেখানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর বিশেষ দল পাঠিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌম অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যেকোনো উসকানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) ও সেনাবাহিনীকে কঠোর জবাব দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আবার সেই হারানো গৌরব, সেই স্বাধীনচেতা শক্তিতে ফিরে যাক—এটি ভারত কোনো দিনই চায় না বলে লেখকের বিশ্বাস। তাদের এই নতুন উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে, তা দিল্লির জন্য বড় অশনি সংকেত বলেই তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের (সিইটিসি) মধ্যে জি-টু-জি (G2G) ভিত্তিতে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনের জন্য একটি যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশেই আধুনিক মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) উৎপাদনের পথ তৈরি হবে, যা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সামরিক স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কও দিন দিন জোরদার হচ্ছে।
দিল্লি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, জুলাই-পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশ আর কোনো পরাশক্তির আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে চায় না। তারা এটিও উপলব্ধি করছে যে, ফ্যাসিবাদের পতনের পর এই সেনাবাহিনী আর অতীতের মতো বাইরের খবরদারি সহজভাবে মেনে নেবে না। লেখকের দৃষ্টিতে, যে সৈনিকের অনুপ্রেরণা হবেন খলিফা উমর (রা.) বা খলিফা আলী (রা.), যিনি ইতিহাস থেকে ন্যায়, সাহস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করবেন, তাঁকে কেবল ভয়ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই নামকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মূলত তার অফিসারদের মধ্যে একটি দৃঢ় নৈতিক ও মানসিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চেয়েছে, যা যেকোনো আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
ইসলামের প্রথম চার খলিফা কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসন, সুশাসন, অদম্য নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত সততা এবং কঠোর জবাবদিহির বিশ্বজনীন প্রতীক। সামরিক প্রশিক্ষণের স্তরে ক্যাডেটদের মধ্যে এই গুণাবলির সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে তাঁদের নামকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা একটি ইতিবাচক ও দূরদর্শী উদ্যোগ। অথচ একেই ‘ইসলামি আর্মি’ বা ‘উগ্রপন্থা’ বলে প্রচার করছে ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি অংশ। লেখকের মতে, তাদের এই প্রতিক্রিয়া মূলত দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কারই বহিঃপ্রকাশ।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতার নতুন অধ্যায় রচনা করেছে, তার মূল সুরই আত্মমর্যাদা। বাংলাদেশ আজ সামরিক প্রশিক্ষণে শুধু নিজেদের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। বিএমএর কুচকাওয়াজে ‘বিএমএ ট্রফি অব এক্সিলেন্স’ অর্জন করেছেন তানজানিয়ার ক্যাডেট সার্জেন্ট আবু বকর। ফিলিস্তিন, মালদ্বীপ ও জাম্বিয়ার মতো দেশের ক্যাডেটরাও এখানে এসে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এই আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বনির্ভরতাই, লেখকের মতে, ভারতের অস্বস্তির অন্যতম কারণ।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে তার নিজস্ব ইতিহাস, মহান সংস্কৃতির ধারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের আলোকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা নির্ধারণ করার। পারস্পরিক সম্মান ও সমতাই যদি প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি হয়, তবে ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো। কিন্তু তারা যদি স্ববিরোধিতা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে এই পথ রুদ্ধ করতে চায়, তবে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে না।
ভাটিয়ারীর সবুজ পাহাড়ে নবীন অফিসারদের ব্যারাকে আজ এক নতুন উদ্দীপনা। তাঁরা আবু বকর, উমর, উসমান ও আলীর নামে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর সদস্য হিসেবে দেশরক্ষার শপথ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। আর হাজার কিলোমিটার দূরে দিল্লির সাউথ ব্লকে বসে থাকা নীতিনির্ধারকেরাও হয়তো উপলব্ধি করছেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজের শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয় পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।









