বেইজিং থেকে পুত্রজায়া: বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক রূপরেখা
দিল্লি পেরিয়ে বেইজিং

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে যে দূরদর্শী কূটনীতির বীজ বুনেছিলেন, পঁচিশের জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে তাঁরই পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে সেই সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। গত ২১ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর কেবল একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না; বরং তা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতির এক প্রকাশ্য ঘোষণা।
পুত্রজায়া থেকে দালিয়ান, আর দালিয়ান থেকে বেইজিং—এক যাত্রায় বিস্তৃত এই কূটনৈতিক সফরকে জাতীয় সংসদের ধন্যবাদ প্রস্তাবে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ বলে আখ্যায়িত করা হলেও, ঠান্ডা মাথায় প্রাপ্তি ও ঘাটতির খতিয়ান মেলালে দেখা যায় এক মিশ্র বাস্তবতার ছবি।
একদিকে যেমন সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর প্রতীকী গৌরব রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে বড় কোনো নতুন আর্থিক বিনিয়োগ নিশ্চিত না হওয়ার বাস্তবতা এবং কৌশলী ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজার ও হালাল অর্থনীতির হাতছানি
সফরের প্রথম ধাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিবিড় সফরে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জন্য এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল দেশটির দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন আইনি জটিলতায় অনিয়মিত হয়ে পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধতা প্রদান, আটকে থাকা নাগরিকদের সসম্মানে দেশে ফেরত পাঠানো এবং দ্রুততম সময়ে নতুন করে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশীয় সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান।
বৈঠক শেষে ৯টি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৩৩ দফার একটি বিস্তারিত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খাতে যৌথ অংশীদারত্বের অঙ্গীকার করা হয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ইসলামি অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দুই দেশ ‘হালাল শিল্পে’ পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
পাশাপাশি পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ার এশিয়া, পারোডুয়া ও এমএমসি করপোরেশনের মতো মালয়েশিয়ার পাঁচটি শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
দালিয়ানের মঞ্চ: জলবায়ু নেতৃত্ব ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দালিয়ানে, যেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’ সম্মেলনে অংশ নেন। ৯০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১,৭০০ সরকারি প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ডেল্টা রাষ্ট্রগুলোর অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, জলবায়ু ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিল’কে শুধু প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই সম্মেলনের ফাঁকে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়াসহ সাতটি দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপন এবং কাজাখস্তানে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
বহুপক্ষীয় এই ফোরামে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির দৃঢ় উপস্থাপন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বেইজিংয়ের লাল গালিচা: সম্পর্কের উচ্চস্তরে আরোহণ
দালিয়ানের জলবায়ু সম্মেলন শেষে বেইজিংয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতায় স্বাগত জানানো হয়। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সমঝোতা স্মারকসহ মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং চারটি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অর্জন আসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রায় ৫০ মিনিটের দ্বিপক্ষীয় ও একান্ত বৈঠকের পর প্রকাশিত ১৫ দফার যৌথ ঘোষণাপত্রে।
এই ঘোষণায় বাংলাদেশ ও চীন নিজেদের সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ থেকে এক ধাপ উন্নীত করে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ (কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার) গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। চীনের কূটনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসে এটি সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তর। এর আগে দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল পাকিস্তানই এই মর্যাদা পেয়েছিল। এবার বাংলাদেশ দ্বিতীয় দেশ হিসেবে সেই তালিকায় যুক্ত হলো।
আপাতদৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় প্রতীকী অর্জন এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তে দাঁড়িয়ে নিজের কৌশলগত দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার। তবে বেইজিংয়ের এই কূটনৈতিক শব্দচয়ন অত্যন্ত সূক্ষ্ম। চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’-এর কাঠামোর মধ্যেও কম্বোডিয়াকে ‘অল ওয়েদার’ এবং লাওসকে ‘হাই কোয়ালিটি’ বিশেষণে অভিহিত করেছে; কিন্তু বাংলাদেশকে রেখেছে বিশেষণবিহীন ‘নতুন যুগের’ স্তরে। বাস্তবে এই অবস্থান মিশর, সার্বিয়া কিংবা কেনিয়ার মতো বহুমাত্রিক অংশীদার দেশগুলোর সমপর্যায়ের।
প্রাপ্তির ঝুলি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার অলিখিত সমীকরণ
চীনের এই শীর্ষ বৈঠক থেকে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা বার্তা ও প্রতিশ্রুতি পেলেও বাস্তব আর্থিক প্রাপ্তির বিচারে বড় কোনো নতুন ঋণ বা মেগা প্রকল্পের ঘোষণা আসেনি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের নতুন সরকারকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) ঢাকার আরও সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সম্মেলনে প্রায় ১২টি শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলেও, তার সিংহভাগই এখনো আলোচনা ও সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। বিগত শেখ হাসিনা সরকার ভারতের চাপে এই প্রকল্প চীনের পরিবর্তে ভারতের হাতে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাতে বেইজিং অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটি পুনরায় চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং প্রথম ধাপের জন্য ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ চাওয়া হয়।
এবারের সফরের যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতা এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সহায়তা করবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থায়ন বা অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি এবারও হয়নি।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মার্কিন প্রভাব এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাবিষয়ক ‘জিসোমিয়া’ ও ‘আকসা’ চুক্তির দিকে ঢাকার ঝোঁক বেইজিংকে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক করেছে। খোদ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন ক্রিস্টনসনও তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। ফলে বেইজিংয়ের বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল অবকাঠামোগত প্রশ্ন এড়িয়ে স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো তুলনামূলক কম স্পর্শকাতর বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সরাসরি সম্পৃক্ততা চূড়ান্ত না হওয়ায় তারেক রহমান সরকারের জন্য এক ধরনের ভূরাজনৈতিক স্বস্তিও তৈরি হয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরাসরি সংঘাত এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কৌশলগত ফাঁদ: স্বার্থের পরিপন্থী সই?
এই সফরের যৌথ ঘোষণার দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ এমন একটি সংবেদনশীল ভাষার সঙ্গে একমত হয়েছে, যা দেশের কূটনৈতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল সংরক্ষণ এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের বিরোধিতা’। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ নীতিগত অবস্থান মনে হলেও, চীনা কূটনীতির পরিভাষায় ‘সামরিকবাদের পুনরুত্থান’ মূলত জাপানকে লক্ষ্য করেই ব্যবহৃত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্য। একই সঙ্গে যৌথ ঘোষণায় কায়রো ও পটসডাম ঘোষণার যে উল্লেখ রয়েছে, তা তাইওয়ানের ওপর চীনের দাবির ঐতিহাসিক ও আইনি ভিত্তিকে সমর্থন করার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশকে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ একাধিক কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত চীনা কূটনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কেন একমত হলো? এটি কি ঢাকার কূটনৈতিক অসতর্কতা, নাকি বেইজিংয়ের সূক্ষ্ম কৌশলগত চাপের ফল?
অবশ্য জাপান বাস্তববাদী রাষ্ট্র হওয়ায় এমন টেমপ্লেটভিত্তিক যৌথ ঘোষণাকে বড় কোনো বিরোধের কারণ হিসেবে দেখবে না বলেই ধারণা করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন নিরপেক্ষ ভারসাম্য রক্ষাকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠছিল, এমন একপেশে ভাষা সেই অবস্থানকে কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে।
দিল্লির উদ্বেগ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকে এড়িয়ে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে—এমন ধারণা এখন বেশ স্পষ্ট। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিশেষ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু এবং এনডিটিভি, সফরটিকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বিশেষ করে মোংলা বন্দরের পাশে ভারতীয় বরাদ্দ বাতিল করে সেখানে চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২৪টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য পরিকল্পনা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিকটবর্তী তিস্তা অববাহিকায় চীনের সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে সম্ভাব্য চীনা সম্পৃক্ততাকেও তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছে।
তবে ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকেই দ্বিচারিতাপূর্ণ বলে মনে করেন। তাঁদের যুক্তি, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ওয়াশিংটনের নীরব সমর্থনে নয়াদিল্লি বাংলাদেশে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখেছিল। চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান সেই প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষেরও বহিঃপ্রকাশ। এখন যখন একটি নির্বাচিত সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে বহুমুখী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন ভারতের ‘নিরাপত্তা উদ্বেগ’-এর যুক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রকে সীমিত করার প্রচেষ্টা বলেই সমালোচকরা মনে করছেন।
সমালোচকদের মতে, সীমান্তে পুশ-ইন, নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বিএসএফের গুলি এবং তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার বাস্তবতার সঙ্গে ভারতের বর্তমান অবস্থানের একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।
ভারতের কিছু জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক যখন দাবি করেন, ‘ভারত কখনো অন্যের ভূখণ্ড দখল করেনি’, তখন সমালোচকদের প্রশ্ন—তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের উদাহরণ দেখিয়ে বাংলাদেশকে চীনের বিষয়ে সতর্ক করার প্রবণতা কি প্রকৃত অর্থেই একটি সমমর্যাদার প্রতিবেশীসুলভ আচরণ?
অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই অতিরিক্ত উদ্বেগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার ‘জিরো-সাম’ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে।
আগামীর পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কের বার্তা
এই সফরের পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ সম্পর্কে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ঢাকা আর কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির কক্ষপথে আবদ্ধ থাকতে চায় না। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল থেকে কার্যত সেই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের নতুন প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী অর্থনৈতিক কৌশলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের প্রণীত ‘লুক ইস্ট’ নীতিকে যদি এই করিডোরের মাধ্যমে নতুন করে কার্যকর করা যায়, তবে ভারতের ওপর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
অবশ্য এই পথ মোটেও বাধাহীন নয়। রাখাইন রাজ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা এই করিডোর বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তবে চীন এই সংকটের সমাধানে মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর মতো উদীয়মান বহুপাক্ষিক জোটে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে।
এ কথা সত্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর তাৎক্ষণিক কোনো অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটায়নি। তবে এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। বেইজিং স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা সমর্থন করে না।
এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—কোনো পরাশক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, নিজের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রেখে এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এই সমঝোতাগুলোকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়া। সেই কৌশলগত মুনশিয়ানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি।









