প্রার্থিতা বাতিলের পর কোন পথে যাবে চট্টগ্রাম-৪?

চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন আইনি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা আপিল বিভাগ বাতিল করে দেওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই আসনের ভবিষ্যৎ কী? নতুন করে কি উপনির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, বাংলাদেশে এর আগে ঠিক এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। অতীতে আদালতের রায়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে, আবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার নজিরও আছে। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনের ঘটনাটি দুটি নজির থেকেই আলাদা। ফলে এবার আদালত কোন পথ অনুসরণ করবেন, সেটি জানতে অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট।
তবে এই আসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্বাচনের সময় থেকেই আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন ছিল। সেই প্রশ্ন নিষ্পত্তি না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন এই আসনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। অর্থাৎ ভোট গণনা শেষ হলেও কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। ফলে কেউ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথও নেননি।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, অতীতে যেসব মামলায় আদালত নির্বাচিত প্রার্থীর মনোনয়ন বা প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ইতোমধ্যে বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনে সেই পর্যায়েই যাওয়া হয়নি। তার আগেই আপিল বিভাগ প্রার্থিতা বাতিল করে দিয়েছেন।

তবে অতীতের দুটি মামলা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি ভোলা-২ আসনের মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনের মামলা, অন্যটি টাঙ্গাইল-৫ আসনের আবুল কাসেমের মামলা। দুটি মামলার রায় দুটি ভিন্ন পথ দেখিয়েছে।
ভোলা-২ আসনের নজির: উপনির্বাচনের পথ
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন কার্যকর হয়। ওই আইনে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর কোনো সদস্য বাধ্যতামূলক অবসরের পর পাঁচ বছর অতিক্রম না করলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বর্তমানে এই সময়সীমা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনকে ২০০৪ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। সে হিসেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তাঁর পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ তাঁকে ভোলা-২ আসনে দলীয় প্রার্থী করে।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বর্তমান জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যান। মামলা চলাকালেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং জসিম উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি শপথও নেন।
এরপর ২০০৯ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন, জসিম উদ্দিন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য ছিলেন না। আদালত বলেন, তাঁর প্রার্থিতা শুরু থেকেই অবৈধ ছিল। সেই রায়ের পর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোলা-২ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
এরপর ওই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। সে নির্বাচন নানা অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ব্যাপক কারচুপি, সহিংসতা ও ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন বিজয়ী হন। অর্থাৎ এই মামলায় আদালতের রায়ের পর সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল উপনির্বাচনের পথ।
এই নজিরের কারণে অনেকের ধারণা, চট্টগ্রাম-৪ আসনেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে এখানেই রয়েছে একটি বড় পার্থক্য। ভোলা-২ আসনে নির্বাচিত প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম-৪ আসনে সেই সুযোগই তৈরি হয়নি। কারণ, ফলাফল প্রকাশের আগেই আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির পর্যায়ে চলে যায়।

টাঙ্গাইল-৫: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীই এমপি
অন্যদিকে টাঙ্গাইল-৫ আসনের ঘটনাটি ভিন্ন একটি আইনি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সেখানে আদালত উপনির্বাচনের নির্দেশ না দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবুল কাসেম বিজয়ী হন। তিনি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ১৫২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহমুদুল হাসান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ৮০৫ ভোট।
নির্বাচনের আগে থেকেই আবুল কাসেমের বিরুদ্ধে ঋণ ও বিল খেলাপির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, তিনি খেলাপি হওয়ায় নির্বাচন করার আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছিলেন। এ অভিযোগে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আদালতে আবেদন করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাহমুদুল হাসান।
মামলাটি দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকার পর প্রায় তিন বছর পর আপিল বিভাগ রায় দেন। আদালত বলেন, আবুল কাসেম প্রকৃতপক্ষেই ঋণ ও বিল খেলাপি ছিলেন এবং সেই কারণে তাঁর প্রার্থিতা বৈধ ছিল না।
তবে এই মামলায় আদালত ভিন্ন পথ অনুসরণ করেন। আসনটি শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের নির্দেশ না দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া মাহমুদুল হাসানকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ আদালত মনে করেন, অবৈধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া একজন প্রার্থীর কারণে আবার পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনার প্রয়োজন নেই; বরং বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন, তিনিই নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক নজির। কারণ, এতে আদালত নতুন নির্বাচন নয়, বিদ্যমান ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতেই বিরোধের নিষ্পত্তি করেছিলেন।
চট্টগ্রাম-৪ কেন ভিন্ন?
চট্টগ্রাম-৪ আসনের বর্তমান পরিস্থিতি ভোলা-২ কিংবা টাঙ্গাইল-৫—কোনো ঘটনার সঙ্গেই পুরোপুরি মেলে না। বরং এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিস্থিতি।
প্রথমত, এখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোট গণনাও শেষ হয়েছে। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করেনি।
দ্বিতীয়ত, কোনো প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্নও এখানে ভোলা-২ আসনের মতো নয়।
তৃতীয়ত, আপিল বিভাগের রায় এসেছে ফলাফল প্রকাশের আগেই। অর্থাৎ আদালতের সামনে এমন একটি পরিস্থিতি এসেছে, যেখানে নির্বাচন হয়েছে, ভোট পড়েছে, কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
এই বাস্তবতায় আদালতের সামনে অন্তত দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। একটি হলো, ভোলা-২ আসনের নজির অনুসরণ করে এই আসনে নতুন নির্বাচন বা উপনির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া। সে ক্ষেত্রে ভোটাররা আবারও তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।
অন্যটি হলো, টাঙ্গাইল-৫ আসনের নজির অনুসরণ করে বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা। সে ক্ষেত্রে নতুন করে ভোটের প্রয়োজন হবে না এবং বিদ্যমান ভোটের ভিত্তিতেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ই দেবে উত্তর
তবে এখনই নিশ্চিত করে কোনো কিছু বলা কঠিন। কারণ, আপিল বিভাগ শুধু মৌখিক রায় দিয়েছেন। এখনও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত কোন আইনি যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) কোন ধারার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, প্রার্থিতার বৈধতা ও ভোটের বৈধতার সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—এসব বিষয়ই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এটিও বিবেচনার বিষয় যে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য প্রার্থীদের অধিকার, ভোটারদের দেওয়া ভোটের মূল্য এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে আদালত কীভাবে ভারসাম্য স্থাপন করেন।
শুধু একটি আসনের প্রশ্ন নয়
চট্টগ্রাম-৪ আসনের এই মামলা কেবল একটি সংসদীয় আসনের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন, বিচারিক ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
যদি আদালত উপনির্বাচনের নির্দেশ দেন, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলায় সেটিই প্রধান নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার যদি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, তবে সেটিও নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নতুন করে গুরুত্ব পাবে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—চট্টগ্রাম-৪ আসনের ঘটনাকে অতীতের কোনো একক নজির দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ, এখানে ভোট হয়েছে, কিন্তু ফলাফল ঘোষণা হয়নি; নির্বাচিত প্রতিনিধি শপথ নেননি; আবার প্রার্থিতার বৈধতাও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই।
ফলে এখন পুরো বিষয়টির নিষ্পত্তি নির্ভর করছে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর। সেই রায়ই বলে দেবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে আবার ভোট হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীই সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষিত হবেন। একই সঙ্গে সেই রায় বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন ও বিচারিক নজিরের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করবে বলেই মনে হচ্ছে।
রাজিব আহাম্মদ: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









