একচোখা সাংবাদিকতা বনাম জামায়াতের দায়িত্বশীল রাজনীতি: একটি বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা

ডেইলি স্টারের ডিজিটাল এডিটর তানিম আহমেদের সাম্প্রতিক কলামটি মূলত জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ‘গৃহযুদ্ধ’ সংক্রান্ত একটি সতর্কবার্তাকে বিকৃত করে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখানোর একটি অপচেষ্টা। সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদ কাঠামো বিলুপ্তির পর একটি ভঙ্গুর ও উত্তরণকালীন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ বুঝতে এই কলামটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
বাস্তবিক অর্থে রাজনীতি কোনো সেমিনার কক্ষের তাত্ত্বিক আলাপের জায়গা নয়। এখানে রাজনৈতিক নেতারা জনমানুষের ক্ষোভ এবং সম্ভাব্য জাতীয় বিপর্যয়ের গভীরতা বোঝাতে কড়া শব্দ ব্যবহার করেন। জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান গৃহযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেননি। বরং দেশের বৃহত্তর স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাঁর দল যে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
অথচ কলামিস্ট অত্যন্ত সুকৌশলে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনটিকে মোটের ওপর ‘শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক’ হিসেবে তকমা দিয়ে আসল সত্য আড়াল করতে চেয়েছেন। অথচ পর্দার আড়ালের সত্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই নির্বাচনের রূপরেখা অনেক আগেই সুনির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে এটি স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি প্রভাবশালী অংশ বা ‘ডিপ স্টেট’ এর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতেই পুরো নির্বাচনী ছক সাজানো হয়েছিল।
বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের লন্ডন সফরকালে দ্য ডরচেস্টার হোটেলে তারেক রহমানের সাথে যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, তা ছিল এই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম ও প্রধান ধাপ। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার তীব্র আকুলতা ও অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সুকৌশলে আইনি ও রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকে রাখা হয়। যার প্রমাণ মেলে তার ফেসবুক স্টেটাসে। পরবর্তী ২ দিনের মধ্যে কি এমন ঘটলো যে, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ প্রটোকলে তিনি দেশে ফিরতে পারলেন? এখানে পর্দার আড়ালে যে সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেটা দেশের সকল সচেতন নাগরিকের অজানা নয়।
একথা অনস্বীকার্য যে দেশের সাধারণ মানুষ এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। কিন্তু আসল নাটক শুরু হয় ভোট শেষ হওয়ার ৪ ঘন্টা পর থেকে। বেশকিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে ফল প্রকাশের আগেই কৃত্রিম ফলাফল প্রকাশ করে তৈরি করা হয়েছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘মিডিয়া কু’। যার প্রমাণ মেলে দেশের কয়েকটি শীর্ষ স্থানীয় টেলিভিশন সাংবাদিকদের নিউজরুমে অভিজ্ঞতা প্রকাশে। প্রতিরোধ করতে না পেরে অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ঐ ঘটনার। ফলশ্রুতিতে চাকরি যায় একটি প্রভাশালী গণমাধ্যমের ৪ সাংবাদিকের।
এছাড়া নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসানের এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টি উঠে আসে। জামায়াত ও ইসলামপন্থী জোটকে উদ্দেশ্য করে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যেসব দল বা গোষ্ঠী নারীর অধিকারে বিশ্বাস করে না এবং সমাজে উগ্রবাদী চিন্তাধারা ছড়ায়, তাদের কোনোভাবেই মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত নয়।
এছাড়া সংসদে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের লন্ডনে গিয়ে ইউনুস তারেককে ট্রফি দিয়ে আসার উক্তি একটি প্রিডিসাইডেড ইলেকশনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে গিয়ে বিএনপির ঋণখেলাপীদের ছাড় দেওয়া, মির্জা আব্বাসকে বাতিল হওয়া ব্যালটের ভোট দেওয়া ইত্যাদি বিষয় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তুলেছিল।
সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনসিপিকে নির্বাচনে ফেভার দেওয়ার বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে যেখানে সাবেক দুই ছাত্র উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছিলেন ঠিক তখনই ঐ উপদেষ্টা পরিষদের খলিলুর রহমান নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেছেন।
যাই হোক, এই পূর্ব নির্ধারিত ও প্রহসনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জামায়াত চাইলে নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে অগ্নিসংযোগ, অবরোধ ও ধ্বংসাত্মক হরতালের চিরচেনা স্ক্রিপ্ট বেছে নিতে পারত। জাতীয়ভাবে ৩১.৭৬% এবং ঢাকা সিটিতে ৪৯% ভোটারের সুনির্দিষ্ট ও প্রশ্নাতীত জনসমর্থন ছিল দলটির। এছাড়া গণভোটের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারী দলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পেইন করা সত্বেও দেশের মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন এই ডানপন্থি দলটিকে ব্যপক সমর্থন যোগায়। এতদ্বা সত্বেও দলটির পক্ষে সেই সংঘাতময় পথে না হাঁটার মূল কারণ ছিল দেশে নতুন কোনো সহিংসতা এড়ানো।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী। যেকোনো সংকটে মাঠের সহিংসতায় সাধারণ মানুষই মাসুল দেয়। আর জামায়াত সেই আত্মঘাতী পথ পরিহার করে সংসদীয় ও সাংবিধানিক কাঠামোকেই বেছে নিয়েছে। অথচ তানিম আহমেদ জামায়াতের মুখের ভাষার ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে মাঠে দৃশ্যমান বিএনপি-র ব্যাপক উপদলীয় কোন্দল, ডজন খানেক মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ২০০টি সহিংসতার ঘটনাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন, যা তাঁর চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বকেই উন্মোচিত করে।
একই সাথে কলামিস্ট দাবি করেছেন যে, জামায়াত গেজেট প্রকাশের আগে ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রতিবাদ করেনি এবং পরে নাটক তৈরি করছে, যা একটি ধোপে টেকা মিথ্যাচার। বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের পরপরই জামায়াত ও তার জোট ভোট গণনা ও কারচুপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল এবং ডজন ডজন আসনে পুনর্গণনার দাবি নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই জনসমক্ষে আনা হয়েছিল। ভোটের পরপরই তোলা এই নির্বাচনী ক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক থিয়েটার বা সুযোগসন্ধানী নাটক নয়, বরং খতিয়ে দেখার মতো একটি ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার।
নিবন্ধটি আরও বেশি সমস্যামূলক ও একপেশে হয়ে ওঠে যখন কলামিস্ট বরাবরের মতোই জামায়াতকে কোণঠাসা করতে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের সেই পুরনো ১৯৭১ সালের বয়ান এবং যুদ্ধাপরাধের তকমা টেনে আনেন। কিন্তু বর্তমান আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এই পুরনো ও একতরফা বয়ানকে সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের সাম্প্রতিক মামলাটি এই পুরো বিতর্কের নৈতিক ও আইনি ভিত্তি ধসিয়ে দিয়েছে।
বছরের পর বছর ফাঁসির সেলে কাটানোর পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট প্রমাণ ও আইনি পর্যালোচনার ভিত্তিতে তাঁকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াগুলোতে ‘বিচারের গুরুতর বিপর্যয়’ ঘটেছিল। এই ঘটনার পর অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যদি অন্যান্য ফাঁসি হওয়া নেতারাও আজ বেঁচে থাকতেন এবং অনুরূপ নিরপেক্ষ ও সর্বোচ্চ আইনি পর্যালোচনার সুযোগ পেতেন। তবে ফলাফল যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো না তা কোনো বিবেকবান মানুষ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।
সুতরাং, পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক রায়কে বেদবাক্য ধরে বারবার চর্বিতচর্বণ করার দিন শেষ হয়ে গেছে। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ আজ একটি নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে। যেখানে জামায়াত বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে নিজস্ব ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও দেশকে অচল না করে একটি দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। বুদ্ধিজীবী ও সংবাদমাধ্যমের উচিত এই রাজনৈতিক সংযমকে মূল্য দেওয়া এবং স্থিতিশীলতার সপক্ষে দাঁড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে মাঠের প্রকৃত সত্যকে সততার সাথে তুলে ধরা।









