প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, বাংলাদেশ-চীন ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং সংসদে বাজেট নিয়ে সরকার-বিরোধী দলের তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল বেশ সরব। সরকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়েছে। বিএনপি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা, বাজেট এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। জামায়াতে ইসলামী বাজেট, ১১ দলীয় ঐক্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগে তৎপরতা দেখিয়েছে। এনসিপি অর্থনীতি, দুর্নীতি ও সীমান্ত ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নিজ নিজ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিল। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দেশের মূলধারার গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। চীন সফর ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ব্যস্ত সরকার দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর। সফরের অংশ হিসেবে তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং, পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। তিস্তা নদীসহ বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুতই চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় চালুর ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ ও মেগা রিচ ইন্ডাস্ট্রিয়ালের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন জানান, বিএনপি সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এদিকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্প, অবৈধ নদীদখল উচ্ছেদ, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ইতিবাচক বার্তা এবং এইচএসসি পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। চীনের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক, বাজেট ও দলীয় কর্মকাণ্ডে বিএনপি বিএনপির জন্য দিনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। এটি দুই দলের রাজনৈতিক যোগাযোগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে দলীয় নেতারা মনে করছেন। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাজেটে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতায় আনার বিরোধিতা করে বলেন, জনগণের ক্ষতি হয় এমন নীতি বিএনপি গ্রহণ করবে না। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানান। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন এবং বিভিন্ন এলাকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনাও আলোচনায় আসে। ফরিদপুরে বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে দুই যুবকের মাথা ন্যাড়া করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গাইবান্ধায় ছাত্রশিবির নেতা হত্যার ঘটনায় বিচার না পাওয়ার ক্ষোভে এক বিএনপি সমর্থক রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন। নারায়ণগঞ্জে স্থানীয় বিএনপি নেতা রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন। বাজেট, কূটনীতি ও ১১ দলীয় ঐক্যে সক্রিয় জামায়াত জামায়াতে ইসলামী দিনভর সংসদীয় বিতর্ক, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কূটনৈতিক যোগাযোগে সক্রিয় ছিল। ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বিগত সরকারের সময়কার ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে ৩৬ দিনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়। সংসদে জামায়াতের সদস্যরা ঋণনির্ভর বাজেট, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করেন। দলটির নেতারা বাজেটকে বাস্তবতা-বিবর্জিত বলেও মন্তব্য করেন। আমির ডা. শফিকুর রহমান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজখবর নেন এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একই সঙ্গে চারজনকে হত্যার ঘটনায়, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে প্রাণহানি এবং একটি সংবাদ প্রতিবেদনে জামায়াতের নাম জড়ানোর ঘটনায় পৃথক বিবৃতি দেয় দলটি। গাজীপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক সহায়তা দেয় জামায়াত। সংসদে অর্থনীতি ও দুর্নীতি ইস্যুতে সরব এনসিপি এনসিপি সংসদ ও জনপরিসরে সরকারবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো করেছে। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আর্থিক সংস্কারগুলো বহাল থাকলে বিদেশি ঋণের জন্য সরকারকে এতটা নির্ভর করতে হতো না। সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ দিতে পারলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসেন। তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, কারিগরি শিক্ষকদের বেতন এবং দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়েও বক্তব্য দেয় এনসিপি। পাশাপাশি ঢাকা উত্তরে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী গণশুনানির আয়োজন করা হয়। মামলা প্রত্যাহারে কর্মসূচি স্থগিত ইসলামী আন্দোলন কুমিল্লায় দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার হওয়ায় পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ছাত্র রাজনীতিতে শিক্ষা, প্রতিবাদ ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ছাত্রদল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং হাজীগঞ্জে কমিটি বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধও ছিল আলোচনায়। অন্যদিকে ছাত্রশিবির দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দোয়া অনুষ্ঠান, মাদকবিরোধী সাইক্লিং র্যালি, নবীনবরণ, ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারের সমালোচনা করেছে সংগঠনটি। রাজনৈতিক বার্তা কী? দিনটির সামগ্রিক চিত্রে স্পষ্ট হয়েছে, চীন সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। একই সময়ে বিএনপি-চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সমঝোতা রাজনৈতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় সংসদে বাজেট, ঋণনীতি, ভ্যাট ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। জামায়াত একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ, অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এনসিপি সংসদে নিজেদের প্রধান সমালোচনামূলক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষা, পরিবেশ, মাদকবিরোধী আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃশ্যমান করেছে।