৭ দিনে ধর্ষণ-নির্যাতনসহ ১১ ‘নারীকাণ্ডে’ জড়ালো ছাত্রদল-যুবদল

ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, নারী নির্যাতন, যৌতুকের জন্য হয়রানি, প্রতারণা, গর্ভপাতের অভিযোগ ও নারীর ওপর সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগে গত এক সপ্তাহে আলোচনায় এসেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রকাশিত সংবাদে ১১টি ঘটনায় এসব সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলা, গ্রেপ্তার ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—শিশু ও শিক্ষার্থী ধর্ষণ, গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টা, নারীকে মারধর, প্রেমের সম্পর্কের পর প্রতারণা, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে গর্ভপাত করানোর অভিযোগ এবং পারিবারিক নির্যাতন।
এসব ঘটনায় কোথাও পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে, কোথাও চলছে তদন্ত, আবার কয়েকটি ঘটনায় দলীয়ভাবে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের অনেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দাবি করেছেন।
শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হয়নি স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহন তালুকদারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটি বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা। গত ২ মে মামলা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
পরিবারের অভিযোগ, শিশুটি দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন রাখে। পরে শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি প্রকাশ পায়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চাঁদপুরের মতলব উত্তরেও অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে অন্তঃসত্ত্বা করার অভিযোগে কলাকান্দা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক কাইয়ুম মালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ধর্ষণচেষ্টা ও দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে এক গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে সাবেক ছাত্রদল নেতা মিলন মৃধাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, রাতে ওই নারীকে জোরপূর্বক নিজের কক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
পাবনার সাঁথিয়ায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে যুবদল নেতা আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাকে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগে যুবদল নেতা শহীদুল ইসলাম শহীদসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ি ফিরতে ভয় পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ
ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা খালিদ পারভেজের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে গর্ভপাত করানোর অভিযোগ উঠেছে। ওই তরুণীর অভিযোগ, সম্পর্কের একপর্যায়ে বিয়ের কথা বলে তাকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয় এবং এ সময় তাকে মারধর করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে খালিদ পারভেজ দাবি করেছেন, তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সামনে এসেছে।
এদিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মাইদুল ইসলাম বাপ্পির বিরুদ্ধে স্ত্রীকে যৌতুক ও নেশার টাকার জন্য নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। অভিযুক্ত নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নারীকে মারধর ও হয়রানির অভিযোগ
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে এক কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও ধর্ষণের হুমকির অভিযোগে ছাত্রদল কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে যুবদলের সাবেক নেতা মো. সফিকের বিরুদ্ধে এক নারীকে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লালমনিরহাটে কুলাঘাট ইউনিয়নের এক ওয়ার্ড যুবদল সভাপতির বিরুদ্ধে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা
নওগাঁর মহাদেবপুরে মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার জেরে এক গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন মণ্ডলসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মানববন্ধনের জেরে ওই নারীকে মারধর করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় বিয়ে করতে গিয়ে ধরা ছাত্রদল নেতা
নেত্রকোনার মদনে প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে গিয়ে আলোচনায় আসেন উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতা সাব্বির আহমেদ সাদান। অভিযোগ প্রকাশ হওয়ার পর বিয়ে ভেঙে যায়। পরে দুই পক্ষের আলোচনায় ক্ষতিপূরণ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এরপর প্রথম স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগও করা হয়।
সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার অভিযোগে দলীয় নেতাকর্মীদের নাম আসায় সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যদিও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় সংগঠন নেবে না এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, নারী নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
গত এক সপ্তাহে প্রকাশিত এসব ঘটনায় কোথাও মামলা হয়েছে, কোথাও গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ভর করছে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর।









